default-image

গত ১৪ সেপ্টেম্বর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের তিন পার্বত্য জেলা ও কক্সবাজারের সড়ক উন্নয়নবিষয়ক এক ভিডিও কনফারেন্সে বলেছেন, পাহাড়ে উন্নয়নের ‘স্বর্ণদুয়ার’ খুলে গেছে। তাঁর দাবি, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের মাধ্যমে শান্তির যে সুবাতাস প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছড়িয়ে দিয়েছেন, তার পথ ধরেই এগিয়ে যাচ্ছে সম্ভাবনাময় পার্বত্য এলাকা।
প্রণিধানযোগ্য যে পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা হচ্ছে রাজনৈতিক সমস্যা। তাই বিষয়টি মুখ্যত রাজনৈতিক আলোকে দেখতে হবে। দ্বিতীয়ত, উন্নয়ন কার্যক্রমকে মানবাধিকারের আলোকে বিচার-বিশ্লেষণ করতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যা সমাধানে আনুষ্ঠানিক সংলাপের গোড়ায় ১৯৮৫ সালে এরশাদ সরকারও স্বীকার করেছিল যে পার্বত্য সমস্যাটি একটি রাজনৈতিক ও জাতীয় সমস্যা। আওয়ামী লীগ সরকারও পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যাকে রাজনৈতিক সমস্যা হিসেবেই স্বীকার করে নিয়েছে। তাই পার্বত্য সমস্যার রাজনৈতিক ও শান্তিপূর্ণ সমাধানের লক্ষ্যে ১৯৯৭ সালে জনসংহতি সমিতির সঙ্গে সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষরের পর বিগত ২৩ বছরে পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার রাজনৈতিক সমাধান কতটুকু এগিয়েছে? সামগ্রিকভাবে বিচার করলে বিগত প্রায় সিকি শতাব্দীতেও সেই কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক ও শান্তিপূর্ণ সমাধানে আশানুরূপ অগ্রগতি সাধিত হয়েছে, তা বলা যাবে না।

বিজ্ঞাপন

পার্বত্য চুক্তিতে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ ও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ-সংবলিত যে বিশেষ শাসনব্যবস্থা প্রবর্তনের বিধান করা হয়েছিল, তা আজ মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। সাধারণ প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা, পুলিশ, ভূমি ও ভূমি ব্যবস্থাপনা, বন ও পরিবেশ, যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, এনজিও কার্যক্রম ইত্যাদি এখনো আঞ্চলিক পরিষদ ও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের আওতাধীন করা হয়নি। আর স্থায়ী বাসিন্দাদের নিয়ে ভোটার তালিকা প্রণয়নপূর্বক এসব প্রতিষ্ঠানের নির্বাচনের কথা তো দূরঅস্ত। আঞ্চলিক পরিষদ ও পার্বত্য জেলা পরিষদকে পাশ কাটিয়ে এখনো আগের মতো ডেপুটি কমিশনার ও পুলিশ সুপাররা এসব প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রয়োগ করে চলেছেন। পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড পূর্বের মতো আঞ্চলিক পরিষদের সার্বিক তত্ত্বাবধানের এখতিয়ারকে উপেক্ষা করে উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করে চলেছে। তাহলে পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার রাজনৈতিক সমাধান হবে কীভাবে?
পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্যতম প্রধান দিক, ভূমি সমস্যার কোনো মৌলিক অগ্রগতি নেই। ভূমি কমিশন আইন প্রণয়ন করতেই চুক্তির পর ১৯ বছর কালক্ষেপণ হয়েছে। এরপর সরকার ভূমি কমিশনের বিধি প্রণয়নের কাজ চার বছর ধরে ঝুলিয়ে রেখেছে। বিগত ২৩ বছরেও পার্বত্য অঞ্চলের ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি হয়নি। পাহাড়িরা ফেরত পায়নি তাদের জায়গাজমি। ভারত-প্রত্যাগত পাহাড়ি শরণার্থীদের দুই-তৃতীয়াংশ পরিবারও ভূমি ফেরত পায়নি এবং তাদের ৪০টি গ্রাম সেটেলারদের দখলে রয়েছে। প্রায় এক লাখ অভ্যন্তরীণ পাহাড়ি উদ্বাস্তু তাদের জায়গাজমিতে তারা যেতে পারেনি।

ভূমি সমস্যার সমাধান তো দূরঅস্ত, অধিকন্তু রিজার্ভ ফরেস্ট, পর্যটন, ইজারা ও নিরাপত্তা ছাউনির দোহাই দিয়ে প্রতিনিয়ত পাহাড়িদের উচ্ছেদ করা হচ্ছে এবং তাদের জায়গাজমি দখল করা হচ্ছে। আর সেটেলারদের জোরপূর্বক ভূমি দখল করেই চলেছে। পায়ের তলায় ভূমি যদি না-ই থাকে, তাহলে এসব জনগোষ্ঠীর ভাগ্যে কীভাবে উন্নয়নের স্বর্ণদুয়ার খুলবে?
উন্নয়ন অবশ্যই প্রয়োজন আছে। উন্নয়ন ছাড়া কোনো জনগোষ্ঠীর আর্থসামাজিক অগ্রগতি হতে পারে না। পাহাড়ি জনগণও উন্নয়ন পেতে চায়। প্রশ্ন হচ্ছে, সেই উন্নয়ন কার্যক্রমে সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর যথাযথ অংশীদারত্ব ও সিদ্ধান্ত নির্ধারণী ভূমিকা রয়েছে কি না, সেই উন্নয়ন কার্যক্রমে সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি ও অধিকার এবং এ অঞ্চলের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের প্রতি সংবেদনশীল কি না?

পাহাড়ি জনগণও উন্নয়ন পেতে চায়। প্রশ্ন হচ্ছে, সেই উন্নয়ন কার্যক্রমে সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর যথাযথ অংশীদারত্ব ও সিদ্ধান্ত নির্ধারণী ভূমিকা রয়েছে কি না, সেই উন্নয়ন কার্যক্রমে সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি ও অধিকার এবং এ অঞ্চলের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের প্রতি সংবেদনশীল কি না?


চুক্তি অনুযায়ী যেখানে বিশেষ শাসনব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি গড়ে ওঠেনি, সেখানে উন্নয়নের ওপর জনপ্রতিনিধিত্বশীল প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ ও সিদ্ধান্ত নির্ধারণী ভূমিকার কথা ভাবা যায় না। অধিকাংশ উন্নয়ন কার্যক্রম আমলানির্ভর পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড ও প্রশাসনযন্ত্রের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হচ্ছে।
শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশনব্যবস্থা, রাস্তাঘাট, আর্থসামাজিক উন্নয়ন ইত্যাদির ক্ষেত্রে কিছুটা অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। তবে জাতীয় পর্যায় থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম এখনো অনেক পিছিয়ে রয়েছে। অধিকাংশ অবকাঠামো উন্নয়ন কার্যক্রমে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যকে যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।

বিজ্ঞাপন

পাহাড়িদের জুমভূমি ও মৌজা ভূমিকে পাইকারিভাবে রিজার্ভ ফরেস্ট ঘোষণা, অস্থানীয় ব্যক্তিদের কাছে হাজার হাজার একর জায়গাজমি ইজারা প্রদান, পর্যটনের নামে জবরদখল, ভূমি অধিগ্রহণ, ব্যাপকভাবে পাহাড় কেটে ও বনাঞ্চল ধ্বংস করে রাস্তাঘাট নির্মাণ, প্রাকৃতিক বনাঞ্চল ধ্বংস করে বনবাগানের মাধ্যমে বনায়ন, স্থলবন্দর স্থাপন ও সেই উদ্দেশ্যে সংযোগ সড়ক নির্মাণ ইত্যাদি উন্নয়ন কার্যক্রম কখনোই সামগ্রিকভাবে জন সংস্কৃতিবান্ধব, গণমুখী ও পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন হতে পারে না। এটা স্পষ্ট হয় যে এসব উন্নয়নের ফলে পাহাড়ি জনগণের সংস্কৃতি ও অস্তিত্বকে দ্রুত ধ্বংসের কিনারে নিয়ে যাচ্ছে এবং এ অঞ্চলের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ভারসাম্য দ্রুতগতিতে নষ্ট করে ফেলছে।
যে জনগোষ্ঠীর জন্য উন্নয়ন, সেই জনগোষ্ঠীর স্বশাসন যেখানে সুদূরপরাহত, তাদের জানমালের নিরাপত্তা যেখানে অনিশ্চিত, বাক্‌স্বাধীনতা ও সভা-সমিতির স্বাধীনতা যেখানে রুদ্ধ, মানবাধিকার যেখানে ভূলুণ্ঠিত, তাদের সংস্কৃতি ও জাতীয় অস্তিত্ব যেখানে বিপন্ন ও বিলুপ্তপ্রায়, সেখানে ‘শান্তির সুবাতাস’ কখনোই বইতে পারে না।
বস্তুত পার্বত্য চট্টগ্রামের মতো কোনো রাজনৈতিক সমস্যাকে রাজনৈতিকভাবে সমাধানের পথ পরিহার করে কেবল উন্নয়নের প্রলেপ দিয়ে কখনো প্রকৃত সমাধান হতে পারে না। এতে সমস্যা আরও জটিল হয়ে ওঠে। পার্বত্য চট্টগ্রামের যথাযথ উন্নয়ন ও প্রকৃত শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার যথাযথ রাজনৈতিক ও শান্তিপূর্ণ সমাধানেই এগিয়ে নিতে হবে। তবেই পার্বত্য চট্টগ্রামের ‘স্বর্ণদুয়ার’ খুলতে পারে।

মঙ্গল কুমার চাকমা জনসংহতি সমিতির তথ্য ও প্রচার সম্পাদক

মন্তব্য পড়ুন 0