খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ন্যায্য দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ন্যায্য দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ছবি প্রথম আলো

আমরা আশা করেছিলাম, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মো. ফায়েক উজ্জামান একটা পর্যায়ে এসে থামবেন। সহকর্মী শিক্ষক ও সন্তানতুল্য ছাত্রদের বিরুদ্ধে এমন কিছু করবেন না, যাতে তাঁদের শিক্ষা ও শিক্ষকতা জীবন ধ্বংস হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য একজন শিক্ষকও বটে। শিক্ষকের কাছে শিক্ষার্থী ও সহকর্মীরা নিশ্চয়ই এতটুকু সহমর্মিতা পেতে পারেন।

দেখা যাক সেখানে শিক্ষার্থীরা যে ৫ দফা দাবিতে আন্দোলন করেছিলেন, তার যৌক্তিকতা আছে কি না। তাঁদের ৫ দফা দাবির মধ্যে আছে বিশ্ববিদ্যালয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী অধ্যাদেশ বাতিল, নির্মাণকাজের অনিয়ম ও দুর্নীতি বন্ধ, শিক্ষার্থীদের আবাসন-সংকট নিরসন ও বেতন-ফি কমানো।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিজেই প্রথম আলোয় এক প্রতিক্রিয়ায় শিক্ষার্থীদের দাবির যৌক্তিকতা স্বীকার করে নিয়েছেন। তিনি বলেছেন, কিছুসংখ্যক শিক্ষার্থীর দাবির যৌক্তিকতা বিবেচনায় নিয়ে ২০১৯ সালের নভেম্বরেই অধিকাংশ দাবি পূরণ করা হয়। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪ বছরের তুলনামূলক চিত্র দিয়ে স্পষ্ট করা হয় যে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে বেতন-ফি অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বেশি নয়। আবাসিক-সংকট সমাধানের মতো দাবি পর্যায়ক্রমে পূরণেরও আশ্বাস দেওয়া হয়।

নির্মাণকাজে দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে তাঁর ব্যাখ্যা ছিল এরূপ: বিভিন্ন ভবনের নির্মাণ-দুর্নীতির বিষয়ে বলা হয়েছে, জীবনানন্দ দাশ ভবনে ৫ ইঞ্চির জায়গায় ৩ ইঞ্চি ছাদ দেওয়া হয়েছে। ওই ভবনের মোট ৭টি কক্ষের বিভিন্ন জায়গায় এই সমস্যা ধরা পড়ে। ছাদ ঢালাইয়ের সময় কোনো উপাচার্য দাঁড়িয়ে থাকেন কি না, তা জানা নেই। তবে এ ধরনের কাজ প্রশ্রয় দিয়ে উপাচার্য যদি ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হন, তাহলে অবশ্যই তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। বর্তমান উপাচার্য কাউকে প্রশ্রয় কিংবা ছাড় দেননি।

বিজ্ঞাপন

এ বিষয়ে দোষী ব্যক্তিরা শাস্তি পেয়েছেন।...বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলের টেন্ডারে অনিয়মের কথা উল্লেখ করে জি কে শামীমকে (জিকেএস) কাজ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। দুবার এই ভবনের টেন্ডার হয় এবং দুবারই সর্বনিম্ন দরদাতা হয় ডিসিএল (ঢালি কনস্ট্রাকশন লিমিটেড, ডিসিএল) দ্বিতীয়বার জিকেএসকে সঙ্গে নিয়ে ডিসিএল টেন্ডারে অংশ নেয় এবং সর্বনিম্ন দরদাতা হয়। এখানে কর্তৃপক্ষের কিছু করণীয় ছিল না। জিকেএস বা জি কে শামীমকে তখন দেশের মানুষ চিনত কি না, জানি না। কারণ, কার্যাদেশ হয় ২০১৮ সালের প্রথমার্ধে। (প্রথম আলো অনলাইন, ১৭ নভেম্বর ২০২০)

এর অর্থ হলো শিক্ষার্থীরা ন্যায্য দাবিতেই আন্দোলন করেছেন। ন্যায্য দাবির আন্দোলনের জন্য শিক্ষার্থীদের বহিষ্কার হতে হলো কেন? আবার সেই ন্যায্য দাবির আন্দোলন যদি কোনো শিক্ষক সমর্থন করে থাকেন, তারা শিক্ষকের যথাযথ দায়িত্ব পালন করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কেবল শ্রেণিকক্ষেরই পাঠ দান করেন না। তাঁরা শিক্ষার্থীদের ন্যায়বোধ ও অধিকারবোধও শেখান।

উপাচার্য নিজেই স্বীকার করেছেন নির্মাণকাজে অনিয়ম হয়েছে এবং সংশ্লিষ্টরা শাস্তিও পেয়েছেন। তাহলে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে ভুল কোথায়? জি কে শামীমের প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া সম্পর্কে সাফাই গাইতে গিয়ে উপাচার্য বলেছেন, জি কে শামীম সর্বনিম্ন দরদাতার কথা বলেছেন। জি কে শামীমেরা সর্বনিম্ন দরদাতা কীভাবে, কোন কারসাজিতে হন, তা উপাচার্য মহোদয়ের জানা না থাকলেও দেশবাসী জানেন। উপাচার্য নিজে নির্মাণকাজের দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত, এ কথা আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা কোথাও বলেননি। তাঁরা বলেছেন, দুর্নীতি হয়েছে। প্রতিকার করতে হবে। শিক্ষার্থীদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে তাঁদের কথা বলতে দিতে হবে।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বহিষ্কারাদেশের খড়্গ নিয়ে আমরণ অনশনরত এক শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে এখন হাসপাতালে। আরেক শিক্ষার্থী ক্যাম্পাসে। প্রশাসন থেকে বলা হয়েছে, তারা চূড়ান্ত জবাব দিক। আমরণ অনশনরত দুই শিক্ষার্থীর প্রতি উপাচার্য ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের এই নিষ্ঠুরতা কেন?

উপাচার্য বলেছেন, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩৫টি সাংস্কৃতিক সংগঠন সক্রিয় আছে। শিক্ষার্থীরা তাদের মত অবাধ প্রকাশ করতে পারেন। কিন্তু খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে যে ভিন্নমত প্রকাশের ন্যূনতম সুযোগ নেই, সেটি সিন্ডিকেটের ছদ্মাবরণে উপাচার্যের সর্বশেষ সিদ্ধান্তই তাঁর প্রমাণ। সিন্ডিকেটের একজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোর প্রতিনিধিকে বলেছেন, অনেকটা উপাচার্যের আগ্রহেই ওই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

তা ছাড়া শিক্ষকদের সর্বশেষ কারণ দর্শানোর নোটিশের জবাবের ব্যাপারটি আমলে নেওয়া হবে না সেটিও সিদ্ধান্ত হয়ে ছিল। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে সমর্থন দেওয়ার অভিযোগে কারও চাকরিচ্যুত করা ব্যাপারটি সম্ভবত এটাই প্রথম। তিনি আরও বলেন, ওই তিন শিক্ষকের বিরুদ্ধে কোনো শিক্ষার্থীকে হয়রানি, নম্বর কমিয়ে দেওয়া, যৌন হয়রানি করা বা আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ নেই। শুধুমাত্র শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে সমর্থন দেওয়ায় এমন কঠিন সাজা অনভিপ্রেত। বাংলাদেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের যে কোনো যৌক্তিক আন্দোলনে অনেক শিক্ষক সমর্থন দিয়ে থাকেন। কিন্তু তাঁদের কারও আজ পর্যন্ত সাজা হয়েছে বলে শোনা যায়নি।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দাবি, দুই শিক্ষার্থীকে বহিষ্কার করা হয়েছে শিক্ষকের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণের দায়ে। কিন্তু সেই পরিস্থিতি কেন তৈরি হলো, সে কথা তাঁরা বলেন না। তিন শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাঁরা শিক্ষার্থীদের উসকানি দিয়েছেন। আর যে শিক্ষকেরা শিক্ষার্থীদের অবরোধ ভাঙতে চেয়েছেন, তাঁরা কী করেছেন? তাঁরা সেখানে না গেলে হয়তো কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতির উদ্ভব হতো না।

বিজ্ঞাপন

তাই উসকানির অভিযোগ যদি কারও বিরুদ্ধে আনতে হয়, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও অবরোধ ভাঙতে যাওয়া শিক্ষকের বিরুদ্ধে নিল না কেন? আসল উসকানিদাতাদের আড়াল করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তিন শিক্ষককে চরম শাস্তি দিয়েছে।

বাংলাদেশের ইতিহাসে আন্দোলনে উসকানি দেওয়ার জন্য অতীতে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের চাকরি খাওয়া হয়েছে, এ রকম প্রমাণ নেই। ড. ফায়েকুজ্জামান উপাচার্য থাকতে এর আগেও অন্য কারণে শিক্ষকের চাকরি খাওয়া হয়েছিল। পরে তাঁদের চাকরি ফেরত দিতে হয়েছে। এবারেও আইনের আশ্রয় নিলে হয়তো তিন শিক্ষক তাঁদের চাকরি ফেরত পাবেন।

কিন্তু তাদের যে সামাজিকভাবে লাঞ্ছিত হতে হলো, তার দায় কে নেবেন? অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বহিষ্কারাদেশের খড়্গ নিয়ে আমরণ অনশনরত এক শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে এখন হাসপাতালে। আরেক শিক্ষার্থী ক্যাম্পাসে। প্রশাসন থেকে বলা হয়েছে, তারা চূড়ান্ত জবাব দিক। আমরণ অনশনরত দুই শিক্ষার্থীর প্রতি উপাচার্য ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের এই নিষ্ঠুরতা কেন?

সোহরাব হাসান প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক ও কবি।

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন