default-image

ইউপি নির্বাচনকেন্দ্রিক সংঘাত-সংঘর্ষে এ পর্যন্ত যে ৫৭ জন মানুষ মারা গেছেন, হিসাব নিলে দেখা যাবে এঁদের অধিকাংশ আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী ও সমর্থক। আর সংঘর্ষের ৯০ শতাংশ ঘটেছে আওয়ামী লীগ বনাম আওয়ামী লীগ। ‘মনোনীত’ বনাম ‘বিদ্রোহী’। আওয়ামী লীগ নিজেরা মারামারি করে যখন রক্ত ঝরাচ্ছে বা প্রাণহানি ঘটাচ্ছে, তখন বিএনপির নেতারা দূর থেকে বক্র হাসি হাসছেন। নির্বাচনে জয়ী হলে বরং তাঁদের জেল-জুলুমের ভয় ছিল। এখন আওয়ামী লীগ নিজেদের মধ্যে মারামারি করুক। নির্বাচনে অনিয়ম ও হাঙ্গামার কথা বললে একশ্রেণির আওয়ামী লীগ নেতা পশ্চিমবঙ্গ বা ভারতের উদাহরণ দেন। কিন্তু তাঁরা কি একটি উদাহরণও দেখাতে পারবেন সেখানে তৃণমূলে তৃণমূলে কিংবা সিপিএমএ–সিপিএমএ লাঠালাঠি হয়েছে।

দুই পর্বের নির্বাচন শেষ হওয়ার পর যখন পত্রিকায় খবর বের হলো যে বিএনপি পরবর্তী পর্বগুলো বর্জন করতে পারে, তখনই আওয়ামী লীগের নেতারা হই হই করে উঠলেন যে জনগণ থেকে প্রত্যাখ্যাত বিএনপি জিততে পারবে না বলেই বর্জনের দিকে যাচ্ছে। কিন্তু পরে দেখা গেল দলটি দাঁত কামড়ে নির্বাচনে আছে। এরপর আওয়ামী লীগের নেতারা বললেন, নির্বাচন সুষ্ঠু করার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের; সরকার বা ক্ষমতাসীন দলের নয়। এখন যদি বিএনপি নেতারা বলেন, যে সরকারের অধীনে ইউপি নির্বাচন সুষ্ঠু হয় না, সেই সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন কীভাবে সুষ্ঠু হবে?

আমরা হলফ করে বলতে পারি, ইউপি নির্বাচনটি ঠিকঠাকমতো হতে পারলে আওয়ামী লীগের এত নেতা-কর্মীকে জীবন দিতে হতো না। তখন নির্বাচনটি হতো আওয়ামী লীগ বনাম অন্য দল। সেই দলের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা এককাট্টা হয়ে লড়তেন। এখন ইউপি নির্বাচনটি হয়ে পড়েছে আওয়ামী লীগ বনাম আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগের নেতারা বড়াই করে বলেন যে তাঁদের মনোনীত প্রার্থীরা দলীয় সভানেত্রীর স্বাক্ষরে মনোনয়ন পেয়েছেন। আর বিএনপির প্রার্থীদের মনোনয়নপত্রে সই দিয়েছেন সেই দলের একজন যুগ্ম মহাসচিব। কিন্তু আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর স্বাক্ষরযুক্ত মনোনয়নপত্র কিংবা দলীয় সিদ্ধান্ত অনেকেই না মেনে বিদ্রোহী বা স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। আর মনোনীত প্রার্থী বিদ্রোহী প্রার্থীর বিরুদ্ধে এবং বিদ্রোহী প্রার্থী মনোনীত প্রার্থীর বিরুদ্ধে সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থীরা ধরেই নিয়েছেন, নির্বাচন কমিশন তাঁদের পক্ষে থাকবে, জনপ্রশাসন তাঁদের পক্ষে থাকবে, পুলিশ প্রশাসন তাঁদের পক্ষে থাকবে। এখানে প্রার্থীর গুণাগুণ বিচারের চেয়ে অধিক গুরুত্ব পেয়েছে মনোনয়ন পাওয়া না-পাওয়া। এ কারণেই মনোনয়ন-বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে, যা এর আগে স্থানীয় সরকার সংস্থার নির্বাচনে ওঠেনি।

এই নির্বাচনে আরেকটি বড় ক্ষতি হলো যে গ্রামীণ সমাজের চিরায়ত সামাজিক সম্পর্কে চিড় ধরা। আমাদের গ্রামীণ সমাজে রাজনৈতিক বিভাজন বা নির্বাচনী ডামাডোল সত্ত্বেও একধরনের সামাজিক সংহতি ও সম্প্রীতি ছিল। যাঁরা ইউপি নির্বাচনকে দলীয় প্রতীকে করার বিরোধিতা করেছিলেন, তাঁদেরও প্রধান আশঙ্কা ছিল এটি। কিন্তু সরকার সেসব আমলে না নিয়ে যখন দলীয় প্রতীকে নির্বাচনটি করার সিদ্ধান্ত নিল, তখন তাদের উচিত ছিল নির্বাচনটি মোটামুটি সুষ্ঠু ও অবাধ করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া। ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীদের কারণেই যে নির্বাচনী সংঘাত ঠেকানো যাচ্ছে না, সে কথা নির্বাচন কমিশনও স্বীকার করেছে। আওয়ামী লীগের নেতারা যখন নির্বাচন কমিশনে গিয়ে জানালেন, দলীয় সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চান নির্বাচনটি সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ হোক, তখন কমিশন সেই বার্তাটিই তাঁদের জানিয়ে দিয়েছিলেন।

দলীয় ইউপি নির্বাচনটি কীভাবে উপদলীয় নির্বাচনে পরিণত হয়েছে, তার একটি উদাহরণ এখানে তুলে ধরছি। প্রথম আলোর বাগমারা প্রতিনিধি মামুনুর রশীদ জানাচ্ছেন, রাষ্ট্রবিরোধী ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে রাজশাহীর বাগমারার গোয়ালকান্দি ইউনিয়নের আওয়ামী লীগের মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থী আবদুস ছালামের মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে। একই সঙ্গে দলের প্রাথমিক সদস্য থেকেও বহিষ্কার করা হয়েছে। আজ শনিবার এই ইউনিয়নে নির্বাচন হওয়ার কথা থাকলেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দোহাই দিয়ে বাঘমারার সব ইউনিয়নের নির্বাচন স্থগিত ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে যেমন সাপ বের হওয়ার আশঙ্কা থাকে, এখানেও সে রকমটি ঘটেছে কি না, কে জানে।

আবদুস ছালাম তাঁর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, তিনি আওয়ামী লীগের বাগমারা উপজেলা শাখার কৃষি-বিষয়ক সম্পাদক ও গোয়ালকান্দি ইউনিয়ন শাখার সহসভাপতি ছিলেন। এবারের ইউপি নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন পেয়েছিলেন। একই ইউনিয়ন থেকে দলের ইউনিয়ন শাখার সভাপতি আলমগীর সরকার মনোনয়ন চেয়েছিলেন। তবে তিনি বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করায় গত সোমবার তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।

গত মঙ্গলবার (৩ মে) রাতে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় দপ্তর থেকে ফ্যাক্সযোগে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘গোয়ালকান্দি ইউনিয়নের দলের মনোনীত প্রার্থী আবদুস ছালাম রাষ্ট্র ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত, যা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নীতি-আদর্শ-চেতনাবিরোধী।’

এর আগে তাহেরপুর পৌরসভার মেয়র প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে নির্বাচনী প্রচারণা করায় তাঁকে দল ও প্রশাসনের পক্ষে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। এরপর আবদুস ছালামের বিরুদ্ধে জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ তোলেন দলের বিদ্রোহী প্রার্থী আলমগীর সরকার ও তাহেরপুর পৌরসভা মেয়র আবুল কালাম আজাদ।

রাজশাহীর জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা সৈয়দ আমিরুল ইসলাম বলেছিলেন, ‘এটা দলের বিষয়। এখন নির্বাচন বাতিল বা স্থগিতের কোনো সুযোগ নেই। নির্দিষ্ট সময়ে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। যেহেতু তাঁর (ছালাম) নামে প্রতীক ও ব্যালট ইস্যু করা হয়েছে, তিনি ওই প্রতীকেই নির্বাচন করবেন।’

মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের সময়সীমা পার হওয়ার পর ব্যালট পেপার ছাপা হয় এবং তারপর কারও মনোনয়নপত্র বাতিল বা সেই কারণ দেখিয়ে নির্বাচন স্থগিত করা যায় না। এমনকি ব্যালট পেপারে নাম ছাপা হওয়া প্রার্থী মারা গেলেও নয়। গত বছর নভেম্বরে মিয়ানমারের নির্বাচনে এ রকম একজন ‘মৃত’ প্রার্থী নির্বাচিতও হয়েছিলেন।

প্রশ্ন হলো, আবদুস ছালাম যদি জঙ্গি তৎপরতার সঙ্গে জড়িত হয়ে থাকেন, তাহলে তিনি আওয়ামী লীগের বাগমারা উপজেলা শাখার কৃষি-বিষয়ক সম্পাদক ও গোয়ালকান্দি ইউনিয়ন শাখার সহসভাপতি হলেন কীভাবে? আমরা এত দিন শুনে এসেছি বিএনপি-জামায়াতই জঙ্গি তোষণ করে। এখন দেখছি আওয়ামী লীগও কম যায় না। ইউপি নির্বাচনের আগে যে হারে বিএনপি-জামায়াতের নেতারা আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে মনোনয়ন পেয়েছেন, তাতে তৃণমূল পর্যায়ে দলটির রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বই প্রকাশ পেয়েছে। যদি আবদুস ছালাম মনোনয়ন না পেয়ে আলমগীর সরকার পেতেন, তাহলে নিশ্চয়ই তাঁর (আবদুস ছালাম) বিরুদ্ধে এই অভিযোগ না করে নির্বাচনী কাজে তাঁর সর্বাত্মক সমর্থন ও সহায়তা চাইতেন।

চতুর্থ দফা নির্বাচনের অাগে এক দিনের নির্বাচনী সহিংসতার খবর থেকেই বোঝা যাবে এটি আসলে দলীয় নির্বাচন নয়, উপদলীয় নির্বাচন। গতকাল প্রথম আলোয়প্রকাশিত খবরে বলা হয়: চট্টগ্রামের হাটহাজারীর মির্জাপুর ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান পদপ্রার্থীর নির্বাচনী ক্যাম্পের কাছে গত বৃহস্পতিবার রাতে গুলিবিদ্ধ হয়ে নূরে এলাহী (৩২) নামে এক কর্মী নিহত হন। নিজেদের কোনো কর্মীর কাছে থাকা অস্ত্র থেকে গুলি বের হয়ে নূরে এলাহীর বুকে লাগে। একই দিন ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু উপজেলার ফলসি ইউনিয়নে সংঘর্ষে দিদার হোসেন (৬৫) নামের এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। তিনি আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীর সমর্থক। আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান প্রার্থী বজলুর রহমানের সমর্থকদের সঙ্গে দলের বিদ্রোহী প্রার্থী ফজলুর রহমানের সমর্থকদের সংঘর্ষের সময় দিদার হোসেনের মৃত্যু হয়। এ ছাড়া কুমিল্লা জেলার চৌদ্দগ্রামে, মাগুরার মহম্মদপুরে, মাদারীপুর জেলার কালকিনি উপজেলায়ও আওয়ামী লীগ মনোনীত ও বিদ্রোহী প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।

বিএনপির শাসনামলে দেশের নৈরাজ্য পরিস্থিতি অবলোকন করে লেখক-কবি হুমায়ুন আজাদ লিখেছিলেন এই বাংলাদেশ কি আমরা চেয়েছিলাম? সেই বাংলাদেশ ছিল পূর্ণিমা-ফাহিমাদের কান্নায় ভেজা, সেই বাংলাদেশ ছিল জঙ্গি হামলায় আক্রান্ত, রক্তাক্ত। এ বই লেখার কয়েক বছর না যেতেই হুমায়ুন আজাদ নিজেই জঙ্গি হামলার শিকার হন এবং কয়েক মাস পর তিনি জার্মানিতে মারা যান। এবারের ইউপি নির্বাচনের হালচাল দেখেও একটি প্রশ্নই বারবার করতে ইচ্ছে হয়, ‘এই নির্বাচন কি আমরা চেয়েছিলাম?’

সে সময়ে যেসব অঘটন হুমায়ুন আজাদকে ক্ষুব্ধ করেছিল, সেগুলোর অবসান ঘটেছে, তা বলা যাবে না। তখনো জঙ্গি হামলায় মানুষ মারা যেত। এখনো যাচ্ছে। তখনো নির্বাচনে শাসক দলের একক দৌরাত্ম্য ছিল। এখনো তা-ই। ক্ষমতার কুশীলব বদলায়, চরিত্র বদলায় না।

সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।

বিজ্ঞাপন
কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন