ভারত যখন তার ৭৩তম স্বাধীনতা দিবস উদ্‌যাপন করতে যাচ্ছে, ঠিক এমনই এক সময়ে এসে ক্রমবর্ধনশীল সংখ্যক ভারতীয়র মনে এই বিশ্বাস জন্ম নিচ্ছে, ১৯৪৭ সালে যে গণতান্ত্রিক চেতনার ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, সেই চেতনা ধরে রাখার লড়াইয়ে ইতিমধ্যেই গণতন্ত্রকামীদের পরাজয় ঘটে গেছে। অনেক বিশ্লেষক উপসংহার টেনেছেন, মোদি সরকার ইতিমধ্যেই দেশের মধ্যে ‘দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্র’ কায়েম করে ফেলেছে। এই বিশ্লেষকদের মতে ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল এবং জম্মু ও কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসনের মর্যাদা উচ্ছেদ করে গত বছরের ৫ আগস্ট এই ‘পুনঃপ্রতিষ্ঠার’ আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়েছিল, যার সমাপ্তি হলো ঠিক এক বছর পর; অযোধ্যায়।

টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচারে কয়েক ঘণ্টার উৎসব অনুষ্ঠান হলো, ভূমিপূজা ও বাবরি মসজিদের স্থলে শুরু হওয়া রামমন্দিরের নির্মাণকাজের উদ্বোধন করলেন মোদি। ভিত্তিপ্রস্তরের স্থলে ৪০ কেজি ওজনের রুপার ইট বসানো হলো।

রামমন্দির নির্মাণকাজ শুরুর বহু আগে থেকেই মোদির বিজেপির হিন্দুত্ববাদ মহাসমারোহে প্রচার করা হয়েছে। অনেকের আশঙ্কা যে ধর্মনিরপেক্ষ চেতনার ওপর এত দিন ভারত দাঁড়িয়ে ছিল, এখন তা একটি হিন্দু রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার কাছাকাছি চলে গেছে।

২০১৪ সালে মোদি সরকার নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে বিজেপি গোটা ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ ভাবমূর্তিকে বদলে দেওয়া শুরু করে। এটি ছিল তাদের হিন্দু জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠা কার্যক্রমের প্রথম পর্যায়। এই পর্যায়ে তারা হিন্দু থেকে যঁারা অন্য ধর্মে দীক্ষিত হয়েছিলেন, তঁাদের পুনরায় হিন্দু ধর্মে ফিরিয়ে আনা, ‘গো-হত্যার’ জন্য অ-হিন্দুদের ওপর, বিশেষ করে মুসলমানদের নির্যাতন করা থেকে শুরু করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতি নানাবিধ নিবর্তনমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় সরাসরি মদদ দিয়েছে। কাশ্মীরের আন্দোলনকারীদের ওপর ব্যাপক দমন–পীড়ন চালানো হয়েছে। যেসব ধর্মনিরপেক্ষ মানুষ এর বিরুদ্ধে কথা বলতে চেয়েছেন, তাঁদের পাকিস্তানি সন্ত্রাসী বলে কোণঠাসা করা হয়েছে।

২০১৯ সালে বড় জয় নিয়ে বিজেপি নির্বাচিত হওয়ার পর দ্বিতীয় ধাপের কাজ শুরু করেছে। মুসলমানদের তিন তালাক অনুশাসনকে অপরাধ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার মধ্য দিয়ে দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজের শুরু। এরপরই জম্মু ও কাশ্মীরের মর্যাদা খর্ব করা হলো। তারপরই নাগরিকত্ব সংশোধন বিল পাস করা হলো। তারপর তারা নিয়ে এল অযোধ্যা ইস্যু। রামমন্দিরের নির্মাণকাজ শুরুর মধ্য দিয়ে মোদি সরকার আন্তধর্মীয় সহাবস্থানের ভিত ভেঙে দিল।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক সুহাশ পালশিকর বলেছেন, সুপ্রিম কোর্ট অযোধ্যা মামলার রায়ে মুসলমানদের ‘বিকল্প’ জমিতে মসজিদ বানানোর কথা বলার পর সবার কাছেই পরিষ্কার হয়েছে, মুসলমানদের খোদ রাষ্ট্রব্যবস্থাই দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসেবে দেখছে।

পার্লামেন্টে বিজেপির দুই–তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় তারা যেকোনো আইনই পাস করতে পারে। কিন্তু বিজেপি আনুষ্ঠানিক পদক্ষেপের বাইরেও এমন কিছু পদক্ষেপ নিচ্ছে, যা সাধারণ ভারতীয়দের একেবারে বিভক্ত করে ফেলছে। সমাজে ঘৃণা ছড়াচ্ছে। উদার গণতান্ত্রিক চর্চাকে ‘দেশবিরোধী আচরণ’ হিসেবে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

সরকারের কাজকর্মের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে আদালতের শরণাপন্ন হলে আদালতকেও শুনানি গ্রহণে অনিচ্ছুক দেখা যাচ্ছে। কাশ্মীরের ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ করে রাখা হচ্ছে। মানুষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সরকারবিরোধী মত দিতে পারছে না।

সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, রাষ্ট্র হিসেবে ভারত কার্যত কোন চরিত্রের, তা দিন দিন বোঝা মুশকিল হয়ে পড়ছে। যাঁরা ভারত রাষ্ট্র গড়েছিলেন, তাঁদের আদর্শকে হিন্দু রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অভিলাষ রাখা মোদি ও তাঁর বিজেপি চ্যালেঞ্জ করে বসেছে।

ছয় বছর ধরে হিন্দু জাতীয়তাবাদের সমর্থকেরা এক বায়বীয় মুক্তির স্বাদ আস্বাদ করছেন, কিন্তু ভারতের প্রকৃত মুক্তির লড়াই আজও শেষ হয়নি। ৫ আগস্টের বিভক্ত ভারত কখনোই ১৫ আগস্টের ঐক্যবদ্ধ ভারতের প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে পারবে না।

ইংরেজি থেকে অনূদিত। স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
শশী থারুর: ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এবং বর্তমানে কংগ্রেস পার্টির নির্বাচিত এমপি

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন