default-image

প্রস্তাবিত বাজেটে সরকার জনপ্রিয়তা অর্জনের সুযোগ হেলায় হারাল বলেই বোধ হচ্ছে। অথচ টানা তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আছে এই সরকার। এখন সে বড় কিছু সংস্কার করবে, মানুষ এমনটাই আশাই করছিল। কিন্তু প্রস্তাবিত বাজেটে সরকার রাজস্ব আহরণের যে তরিকা বাতলাল, তা যেমন একদিকে খুবই সহজ, অন্যদিকে অগণতান্ত্রিকও বটে।

সঞ্চয়পত্রের ওপর উৎসে কর বাড়ানো অত্যন্ত অন্যায় হয়েছে বলতে হয়। সঞ্চয়পত্রের সুদ অনেক বেশি এবং এতে আর্থিক ব্যবস্থায় ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি হচ্ছে, তা ঠিক। পাশাপাশি এর অপব্যবহারও হচ্ছে। এসব অন্যভাবে সামাল দেওয়া যেত। কিন্তু উৎসে কর বাড়ানোর ফলে অবসরপ্রাপ্ত মানুষ চাপে পড়বে, কারণ এটিই তাদের আয়ের একমাত্র অবলম্বন। অন্য কথায়, এটি তাদের সঙ্গে জুলুম করার শামিল। সঞ্চয়পত্রের চাহিদা যেহেতু আকাশচুম্বী, সেহেতু এখানে কর বাড়িয়ে দিলে আদায় করা সহজ।

এরপর মোবাইল ফোনে কথা বলার ওপর সারচার্জ ও স্মার্টফোনের দাম বাড়ানো বিষয়টিও অত্যন্ত শিওর শট। ঝুঁকি নেই। মানুষের জীবনে মোবাইল ফোনের গুরুত্ব দিনের পর দিন বাড়ছে। এটি শুধু খবরাখবর নেওয়ার মধ্যেই সীমিত নেই, একে কেন্দ্র করে নানা সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। অন্যদিকে স্মার্টফোন এখন ডিজিটাল যুগের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। ফিচার ফোন ছেড়ে মানুষ যখন স্মার্টফোনের দিকে ঝুঁকছে, তখন তাতে শুল্ক বাড়িয়ে দিলে নিশ্চিন্তে কিছু অতিরিক্ত রাজস্ব আদায় করা যাবে, এই ভাবনা থেকেই সরকার এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে ধারণা করা যায়।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড প্রতিবছরই প্রয়োজনীয় রাজস্ব আদায়ে ব্যর্থ হচ্ছে। দেখা যায়, অর্থবছরের মাঝামাঝি সময়ে এসে রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রা ছাঁটতে হয়। এই পরিপ্রেক্ষিতে আগামী অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ১৭ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু আয়কর বাড়ানোর লক্ষ্যে সরকারের বিশেষ উদ্যোগ নেই। তাই সরকার কয়েক বছর ধরেই এসব শিওর শট খেলছে।

বাজেটে কোন কোন পণ্যের দাম বাড়তে যাচ্ছে, তা একবার দেখে নেওয়া যাক: তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের সিলিন্ডারে ৫০ টাকা বাড়তি করারোপের কারণে এর দাম নিশ্চিতভাবেই বাড়তে যাচ্ছে। অন্যদিকে বাজেট ঘোষণার পর বাজারে চিনির দাম প্রায় ৩ টাকা ও ভোজ্যতেলের দাম প্রায় আড়াই টাকা বেড়েছে। বাড়বে শিশুখাদ্যের দামও। গুঁড়া মসলা, ভালো মানের বিস্কুট, কেক, ফলের রস, আচার আর আইসক্রিমও থাকতে পারে মূল্যবৃদ্ধির তালিকায়। তৈজসপত্র কিনতে বাড়তি টাকা লাগবে। পোশাকে আগের চেয়ে বেশি হারে মূল্য সংযোজন কর (মূসক/ভ্যাট) দিতে হবে। যাতায়াতেও আগের চেয়ে কিছুটা খরচ বাড়তে পারে। তালিকাটি দেখলেই বোঝা যায়, সরকার সহজেই এসব খাত থেকে বাড়তি রাজস্ব আদায় করতে পারবে।

বাংলাদেশে আদায়কৃত রাজস্বের বড় অংশ আসে পরোক্ষ কর থেকে, যার পরিমাণ প্রায় ৭০ শতাংশ। প্রত্যক্ষ কর বা আয়করের পরিমাণ ৩০ শতাংশ | অথচ মালয়েশিয়ায় প্রত্যক্ষ করের পরিমাণ ৭৫ শতাংশ ও ভারতে ৫৬ শতাংশ৷ দেশে আয়কর প্রদানকারীর সংখ্যাও যথেষ্ট কম। বর্তমানে টিআইএনধারীর সংখ্যা প্রায় ৪০ লাখ হলেও রিটার্ন দেন বছরে মাত্র ১৭ থেকে ১৮ লাখ টিআইএনধারী। অর্থাৎ তাঁরাই আয়কর দেন। প্রস্তাবিত বাজেটে অর্থমন্ত্রী সংখ্যাটা আগামী কয়েক বছরে এক কোটিতে উন্নীত করার ঘোষণা দিয়েছেন। কিন্তু সেটা কীভাবে করা হবে, তা বড় এক প্রশ্ন।

প্রত্যক্ষ করের পরিমাণ ধাপে ধাপে বাড়ানোর মতো পরিকল্পনা সরকারের নেই।

পরোক্ষ কর আসে মূলত মূসক (ভ্যাট) ও অন্যান্য শুল্ক থেকে, আর প্রত্যক্ষ কর বা আয়কর আসে মানুষের আয়ের ওপর আরোপিত কর, ভ্রমণ কর প্রভৃতি থেকে। একটি দেশে প্রত্যক্ষ করের চেয়ে পরোক্ষ করের পরিমাণ বেশি হওয়াটা মোটেও গণতান্ত্রিক নয়। এতে বোঝা যায়, রাষ্ট্রে যাদের আয় বেশি, তাঁরা কম কর দেন; আর যাঁদের আয় কম, তাঁরা কর দেন বেশি। কারণ, পরোক্ষ করের হার সবার জন্য এক। অনুক্রমিক করব্যবস্থায় একটি দেশে প্রত্যক্ষ করের পরিমাণ মোট আদায়কৃত করের প্রায় ৫০ শতাংশ হওয়া উচিত। আর আয়ের নিরিখে করের হারও বাড়ার কথা। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের প্রকাশনাতেও এসব কথা বলা হয়েছে।

দেশে সম্পদ কর নেই। যাঁদের সম্পদ আড়াই কোটি টাকার ওপরে, তাঁদের প্রদত্ত আয়করের ওপর সারচার্জ দিতে হয়। কিন্তু ভিত্তিমূল্যের মানদণ্ডে সম্পদের মূল্যায়ন করা হয় বলে সেটা তেমন কার্যকর হয় না। আবার এবারের প্রস্তাবিত বাজেটে সেই সীমা বাড়িয়ে তিন কোটি টাকা করা হয়েছে। অথচ ব্যক্তিশ্রেণির আয়করের সীমা চার বছর ধরে একই জায়গায় আছে। বোঝা যায়, সরকার আসলে কাদের ছাড় দিতে চায়। আবার পোশাকমালিকেরা বরাবরের মতো এবারও প্রণোদনা পেয়েছেন।

সাধারণত অলস ও অনুৎপাদনশীল সম্পদ নিরুৎসাহিত করতে সম্পদ কর আরোপ করা হয়। এর মাধ্যমে অর্জিত কর সুনির্দিষ্টভাবে সমাজের নিম্ন শ্রেণির মানুষের আয়বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানে ব্যবহার করা যায়। কিন্তু উল্লিখিত বাস্তবতায় বলা যায়, তা দূর অস্ত। ফলে বছরের পর বছর ধরে মানুষ উত্তরাধিকার সূত্রে এই সম্পদ ভোগ করে যাচ্ছে। দেশ যে বৈষম্য বাড়ছে বা বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বেশি হারে অতি ধনী বাড়ছে, তার কারণ অননুমেয় নয়।

তবে এরও প্রতিকার আছে। অর্থনীতিবিদ টমাস পিকেটি সেই পথ বাতলে দিয়েছেন: সম্পদ করারোপ, উত্তরাধিকার কর প্রবর্তন, শিক্ষার আওতা বাড়াতে ব্যয় বৃদ্ধি, করপোরেট পরিচালনা বিধি সংস্কার, কর্মীদের বেতন বৃদ্ধি, ব্যাংকের শোষণ বন্ধে আর্থিক খাতে নিয়ন্ত্রণ আরোপ প্রভৃতি।

প্রতীক বর্ধন: সাংবাদিক
ই–মেইল: protik.bardhan@prothomalo.com

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0