বিজ্ঞাপন

দ্বিতীয়ত, স্কুল চালু রাখলেই হবে না। শিক্ষার যে ক্ষতি হয়েছে, তা পোষানোর জন্য যথার্থ ব্যবস্থা নিতে হবে। ব্যাপারটি প্রশাসনিক দৃষ্টিতে যা সহজে করা যাবে, সেভাবে না দেখে শিক্ষাবিজ্ঞানের আলোকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। জ্ঞান ও দক্ষতার শ্রেণি ও সংজ্ঞা শিক্ষার্থী কীভাবে আহরণ করে, তা মাথায় রাখতে হবে। এ পর্যন্ত কর্তৃপক্ষের চিন্তাভাবনা স্কুল খুলে দেওয়ার পর বছরের যে কত কার্যদিবস বাকি থাকে, সেই দিনগুলোর জন্য কিছু পাঠ রেখে বাকি পাঠের বিষয় বাদ দিয়ে দেওয়া। প্রাথমিকের ছয়টি বিষয় ও মাধ্যমিকের তেরোটি বিষয় বজায় রেখে এই বিধান প্রয়োগ করা হবে। বছরের পরীক্ষাও এই সংক্ষিপ্ত পাঠক্রম অনুযায়ী নেওয়া হবে এবং ছাত্ররা বছরের শেষে পরবর্তী শ্রেণিতে চলে যাবে। হয়তো পরবর্তী শ্রেণিতেও কিছু কাটছাঁট হবে এবং শ্রেণি–উত্তরণ ও শিক্ষাবর্ষ স্বাভাবিকভাবে চলবে। এটা একটা প্রশাসনিক সুবিধার ব্যাপার। যে ছাত্র অনেক কিছু না পড়ে পরবর্তী শ্রেণিতে চলে যাবে, সে সেই শ্রেণির সব পাঠ্য বিষয় সামলাবে কীভাবে? দীর্ঘ সময় পড়াশোনায় না থাকার ক্ষতি এভাবে পোষানো যাবে না, বরং শিক্ষার্থীদের ব্যর্থতার দিকে ঠেলে দেওয়াহবে। এই সমস্যার বিজ্ঞানসম্মত সমাধান হচ্ছে সীমিত সময়ের মধ্যে সব বিষয় পড়ানোর চেষ্টা না করে সুনির্দিষ্ট মৌলিক দক্ষতায় দৃষ্টি দেওয়া। প্রাথমিক স্তরে বাংলা ভাষা ও গণিতে জোর দিতে হবে। মাধ্যমিকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত বাংলা, গণিতসহ বিজ্ঞান ও ইংরেজিতে দৃষ্টি দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে বিশেষ কাটছাঁট করা যাবে না। এই মৌলিক বিষয়গুলোয় শ্রেণির উপযুক্ত জ্ঞান ও দক্ষতা আয়ত্ত করলে শিক্ষার্থী অনেকটা স্বাবলম্বী হবে এবং বাকি বিষয়গুলো ভবিষ্যতে সামলে নিতে পারবে।

কারিকুলাম বোর্ড ও শিক্ষা কর্তৃপক্ষকে এ ব্যাপার বুঝে পাঠ্যসূচি সংক্ষিপ্ত করার সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এ জন্য শিক্ষকদের তৈরি করতে হবে। পাঠদানের প্রক্রিয়া ও পদ্ধতি পরিমার্জন করতে হবে। শিক্ষকদের জন্য বিষয় ও শ্রেণি অনুযায়ী নির্দেশিকা দিতে হবে এবং এসব প্রযুক্তির মাধ্যমেও সবার কাছে পৌঁছে দিতে হবে। শিক্ষার্থীদের জন্যও বিষয়গুলো অনলাইনে দিতে হবে, যা শ্রেণিতে শিক্ষার পরিপূরক হবে। শিক্ষকদের জন্য ফলভিত্তিক প্রণোদনা দিতে হবে। বেসরকারি এমপিওবহির্ভূত শিক্ষার্থীদেরও এ উদ্যোগে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। তাদের সংখ্যা বিশাল এবং তারাও বিপর্যস্ত।

তবে বিষয় কমিয়ে দিয়েও দীর্ঘ সময়ের ক্ষতি অল্প সময়ে পোষানো যাবে না। এ জন্য বর্তমান শিক্ষাবর্ষের মেয়াদ আরও অন্তত ছয় মাস বাড়ানো যেতে পারে, ২০২২ সালের জুন মাস পর্যন্ত। ইতিমধ্যে বছরের শেষে পরীক্ষা ও নতুন বছর শুরুর জন্য পড়াশোনার বাইরে সময় ব্যয় করতে হবে না। অন্য কথায়, বর্তমান বছরে শ্রেণি–উত্তরণ বিরতি দেওয়া যেতে পারে ছয় মাসের জন্য।

সংকটকালে এই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের সুযোগ নিয়ে বিদ্যালয় শিক্ষাবর্ষে পরিবর্তন আনা যেতে পারে। অর্থাৎ, ২০২২ সালের নতুন শিক্ষাবর্ষ ও নতুন শ্রেণিতে উত্তরণ হবে গ্রীষ্মের বিরতির পর সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে। খ্রিষ্টীয় বর্ষপঞ্জি অনুসারে ঔপনিবেশিক যুগের শিক্ষাবর্ষে পরিবর্তন আমাদের দেশের আবহাওয়ার জন্য প্রয়োজন বলে অনেকেই মত দিয়েছেন। অন্য অনেক দেশের মতো সেপ্টেম্বর থেকে জুন শিক্ষাবর্ষে অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অপেক্ষাকৃত নাতিশীতোষ্ণ ও ঝড়ঝঞ্ঝামুক্ত সময়ে নিয়মিত স্কুল চালু রাখা যাবে। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের প্রথমার্ধ পর্যন্ত গ্রীষ্মের লম্বা ছুটি হতে পারে প্রতিবছর এই নির্দিষ্ট সময়ে। পবিত্র রমজান বাবদ ছুটি থাকবে না, যদি তা গ্রীষ্মের ছুটিতে না পড়ে। তবে রমজানের জন্য অন্য সব অফিস দপ্তরের মতো সময়সূচি বদলানো যেতে পারে।

স্কুল খোলা, শিক্ষার ক্ষতি পোষানো ও পুনরুদ্ধার সফলভাবে চালানোয় স্থানীয় সমাজ ও এনজিওগুলোর সহযোগী হিসেবে গ্রহণ করার উদ্যোগে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। কেন্দ্রীয় নির্দেশ ও নীতি প্রতিটি উপজেলায় ও প্রতিটি বিদ্যালয়ে তাদের পরিস্থিতি অনুযায়ী কাজে লাগানোতে, এ জন্য উপজেলায় ও প্রতিটি বিদ্যালয়ে কর্মপরিকল্পনা তৈরিতে, এসবের তত্ত্বাবধান ও পরীক্ষণে, আর্থিক প্রয়োজন নির্ধারণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে অন্যদের যুক্ত করতে হবে। এ জন্য উপজেলা ও বিদ্যালয়ে কর্মী দল গঠন করতে হবে

মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পাবলিক পরীক্ষা (এসএসসি ও এইচএসসি) নিয়ে কর্তৃপক্ষ বিপাকে পড়েছে। এ বছর কি সব বিষয় নিয়ে দেড় মাস ধরে পরীক্ষা নেওয়া যাবে এবং কখন তা হতে পারে? এ ক্ষেত্রেও মূল দক্ষতার ধারণার আলোকে বাংলা, গণিত, ইংরেজি ও বিজ্ঞানের জন্য চার দিনে মাধ্যমিকের পরীক্ষা নেওয়া যেতে পারে। উচ্চমাধ্যমিকে আরও কিছু বিষয় যোগ করলেও এক সপ্তাহের মধ্যে পরীক্ষা শেষ করা যেতে পারে। শিগগিরই ২০২১–২২ শিক্ষাবর্ষের জন্য এ সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি ও মানসিক দুশ্চিন্তা থেকে রক্ষা করা যেতে পারে।

তৃতীয়ত, স্কুল খোলা, শিক্ষার ক্ষতি পোষানো ও পুনরুদ্ধার সফলভাবে চালানোয় স্থানীয় সমাজ ও এনজিওগুলোর সহযোগী হিসেবে গ্রহণ করার উদ্যোগে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। কেন্দ্রীয় নির্দেশ ও নীতি প্রতিটি উপজেলায় ও প্রতিটি বিদ্যালয়ে তাদের পরিস্থিতি অনুযায়ী কাজে লাগানোতে, এ জন্য উপজেলায় ও প্রতিটি বিদ্যালয়ে কর্মপরিকল্পনা তৈরিতে, এসবের তত্ত্বাবধান ও পরীক্ষণে, আর্থিক প্রয়োজন নির্ধারণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে অন্যদের যুক্ত করতে হবে। এ জন্য উপজেলা ও বিদ্যালয়ে কর্মী দল গঠন করতে হবে। একটি বড় কাজ হবে পিছিয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার জন্য স্থানীয়ভাবে এনজিওগুলো নিয়ে শিক্ষক সহযোগী নিয়োগ দিতে হবে। এ উদ্যোগে গণসাক্ষরতা অভিযানের দেশব্যাপী সাংগঠনিক নেটওয়ার্ককে কাজে লাগানো যেতে পারে।

চতুর্থত, প্রাক্‌–প্রাথমিক ও প্রাথমিক স্তরে মধ্যাহ্ন আহারের কার্যক্রম ত্বরান্বিত করে আগামী দুই বছরে সব শিক্ষার্থীকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। প্রতিবেশী পশ্চিমবঙ্গে স্কুল বন্ধ থাকার সময় শিক্ষার্থীদের পরিবারে চাল-ডাল-তেল পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। সারা ভারতে স্কুলে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত সব শিক্ষার্থীর জন্য সরকারি ব্যয়ে মধ্যাহ্ন খাবার চালু আছে। আমরা কেন পারব না? গড় আয়ে আমরা ভারতকে অতিক্রম করছি বলে দাবি করা হচ্ছে।

এসব সিদ্ধান্তের ব্যাপারে প্রস্তাব ও পরিকল্পনার দায়িত্ব দুই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের। বাজেটের হিসাব ও দাবি পেশ করার দায়িত্বও তাদের। তারপরই অর্থ মন্ত্রণালয় নতুন বাজেটে এসব প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত করতে পারে প্রধানমন্ত্রীর সার্বিক নির্দেশনায়।

ড. মনজুর আহমদ ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন