default-image

তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি অথবা অমিত শাহ, এমনকি সোনিয়া গান্ধীর মতো বড় মাপের বহু বছরের রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না। এর পরও যিনি ভারত তথা উপমহাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে চমক লাগালেন, তিনি সাধারণ নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের ব্যক্তি, অরবিন্দ কেজরিওয়াল। বর্তমানে দিল্লির দ্বিতীয়বারের অষ্টম মুখ্যমন্ত্রী। ২০১৫ সালের দিল্লি বিধানসভা নির্বাচনে ৭০টি আসনের 
মধ্যে ৬৭টি আসন পেয়ে তাক লাগিয়ে দিলেন। ধরাশায়ী করলেন আপাতত ভারতের বর্তমান অপ্রতিরোধ্য ক্ষমতাসীন দল বিজেপিকে। দিল্লির রাজনৈতিক ও নির্বাচনী রাজনীতির দৃশ্যপট থেকে শূন্যে নামিয়ে আনলেন উপমহাদেশের সবচেয়ে প্রভাবশালী ও পুরোনো দল কংগ্রেসকে।
এটাই কেজরিওয়াল এবং তাঁর দল ‘আম আদমি পার্টি’র প্রথম বিজয় নয়। ২০১৩ সালেও মাত্র কয়েক মাসের পুরোনো দল ‘আম আদমি পার্টি’ নিয়ে চমক দেখিয়েছিলেন ২৮টি আসন পেয়ে। ১৫ বছরের দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী শিলা দীক্ষিতকে পরাজিত করেছিলেন। সেবার তিনি মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন বিজেপির বিরুদ্ধে কংগ্রেসের সমর্থন নিয়ে। রাজনীতিতে অনভিজ্ঞ কেজরিওয়াল তখন ৪০ দিনের বেশি ক্ষমতায় থাকতে পারেননি। বহু নাটকের মধ্য দিয়ে স্বল্প সময়ের রাজনীতিবিদ অরবিন্দ কেজরিওয়াল যখন পদত্যাগ করলেন, তখন অনেক বিশেষজ্ঞ এবং ঝানু রাজনীতিবিদ তাঁকে মাইনাস করে দিয়েছিলেন। এমনকি বিজেপির মহারথীরা কেজরিওয়াল এবং আম আদমি পার্টিকে নিছক অ্যাডভেঞ্চার মনে করে একপ্রকার তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যই করেছিলেন। ২০১৪ সালের লোকসভা প্রচারণার একপর্যায়ে কাশ্মীরে প্রচারণাকালে প্রধানমন্ত্রী মোদি কেজরিওয়ালের কাশি নিয়ে বিদ্রূপ করেছিলেন। এবার দিল্লি বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে মোদি আম আদমি পার্টি এবং কেজরিওয়ালকে বিশ্বাসঘাতক বলেছিলেন। ভারতজুড়ে মোদির এ ধরনের বক্তব্যের নিন্দা হয়েছিল। কিন্তু জনগণ তার জবাবে এই অনভিজ্ঞ লোকটিকে দ্বিগুণ ভোট দিয়ে দেখালেন যে তাঁরা কেজরিওয়ালের মতো সাধারণ মানুষকে প্রতিষ্ঠিত রাজনীতিবিদদের চেয়ে বেশি বিশ্বাস করেন।
আম আদমি পার্টির প্রধান স্লোগান ‘পরিবর্তন’ এবং এরই পরিপ্রেক্ষিতে দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধের স্পৃহা ভোটারদের আগ্রহ বাড়িয়েছে। ভারতে দুর্নীতি রাষ্ট্রীয় সমস্যা বলে চিহ্নিত। দুর্নীতির জালে জড়িয়ে পড়েছে বহু রাজনীতিবিদ। কংগ্রেস সরকারের বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতি আর স্বজনপ্রীতির চাক্ষুষ প্রমাণ ছিল দিল্লির তথা ভারতের জনগণের সামনে। দিল্লির তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী শিলা দীক্ষিতের পরিবারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ছিল। অপর দিকে দিল্লির নিম্ন আয়ের জনগণের ওপর ট্যাক্স, বিদ্যুৎ ও পানির দাম বাড়ানোর ফলে দিল্লির নিম্ন আয়ের মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল। এরই পরিপ্রেক্ষিতে আম আদমি পার্টি নিম্নবিত্ত শ্রেণিকে দুর্মূল্যের বাজারে কিছুটা স্বস্তি দিতে যে কর্মসূচি ২০১৩ সালের নির্বাচনে এবং ৪৯ দিনের সরকার নিয়েছিল, তাতে সাধারণ নিম্নবিত্তের মানুষের বিশ্বাসযোগ্যতা ও সহমর্মিতা অর্জনে সক্ষম হয়েছিল।
আম আদমি পার্টির এমন বিজয়ের কারণগুলো ভারতের রাজনীতিতে কিছুটা হলেও নতুন মাত্রা জোগাবে। কারণগুলোর কয়েকটির আলোচনা করতে গেলেই বলতে হয় প্রথমত, ভারতের রাজনীতিতে বহুবার ক্ষমতায় থাকা কংগ্রেসের নেতৃত্বে স্থবিরতা দৃশ্যমান। পরিবারতন্ত্র কাজ করেনি, ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচন যেমন ফলপ্রসূ হয়নি, তেমনি কাজ করেনি দিল্লি বিধানসভা নির্বাচনেও। দ্বিতীয়ত, বিজেপির পেছনের শক্তি বিশ্ব হিন্দু পরিষদ এবং আরএসএস-এর ‘ঘরওয়াপসি’ বা পুনঃহিন্দুকরণ প্রক্রিয়া দিল্লির সংখ্যালঘুদের আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। বিশেষজ্ঞদের মতে, দিল্লির সংখ্যালঘুদের কংগ্রেস ও বিজেপি প্রত্যাখ্যানের কারণও আম আদমি পার্টির এ সাফল্যের অনুকূলে ছিল। তা ছাড়া মোদি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে তাঁর আচার-আচরণ, বহু মূল্যের পোশাকাদি আর স্টাইল আইকন হয়ে ওঠাকে সাধারণ ভারতীয়রা, বিশেষ করে বড় শহরের নিম্ন আয়ের মানুষকে আকর্ষণ করেনি। হঠাৎ করে কিরণ বেদির অন্তর্ভুক্তি দিল্লির বিজেপির মধ্যে হিতে বিপরীত প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছিল।
এসব রাজনৈতিক কারণ ছাড়াও বাস্তবিক কিছু পদক্ষেপ আম আদমি পার্টির পক্ষে তরুণদের আকৃষ্ট করেছে। বর্তমানে আম আদমি পার্টি তথা সাত সদস্যের মন্ত্রিসভায় ভারতের তরুণদের অন্তর্ভুক্তিই হয়েছে সবচেয়ে বেশি। অনেক তরুণ পেশা ত্যাগ করে ভারতের রাজনীতিতে স্থবিরতা, দুর্নীতি আর পরিবারতন্ত্র ভাঙতে কেজরিওয়ালের নেতৃত্বে উদ্বুদ্ধ হয়েছেন। এটা ভারতের আগামীর রাজনীতির গতি পরিবর্তন করবে।
কেজরিওয়ালের প্রথম সরকারের স্থায়িত্ব স্বল্প সময়ের হলেও দিল্লির নিম্ন আয়ের মানুষকে সস্তায় বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ করা, ভিআইপি কালচারকে বাতিলকরণ ইত্যাদি এবারও কেজরিওয়ালের পক্ষে গেছে। এসব নিয়ে আম আদমি পার্টি দিল্লি ‘ডায়লগ’ও করেছে। এরই ফলে শুধু নিম্ন আয়েরই নয়, দিল্লির বিশাল মধ্যবিত্তদেরও কেজরিওয়ালের সপক্ষে টেনেছে।
দিল্লিতে বড় দলগুলোর ভরাডুবির অন্যতম কারণ ছিল বৃহৎ ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত পৃষ্ঠপোষকতা। বিশেষ করে নরেন্দ্র মোদির গুজরাট স্টাইলে অর্থনীতি চাঙাকরণের ফর্মুলায় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের উল্লেখ নেই। বিজেপি বর্তমানে ভারতের রাজনৈতিক অর্থায়নের বিষয়ে শীর্ষে। গত নির্বাচনের প্রাক্কালে কয়েকজন বড় ব্যবসায়ীর তরফের চাঁদা ৩৬১ কোটি ছাড়িয়ে গিয়েছিল। এ ব্যাপারে কংগ্রেস বেশ পেছনে।
যা-ই হোক, কেজরিওয়াল বিশাল ভারতের রাজধানী জয় করেছেন। এ জয়ের পেছনে যত কারণই থাকুক, আমার মতে প্রধান কারণ, আমজনতা অতি সাধারণ, সৎ একজন মানুষকে নিজেদের মতো করে পেয়েছে। কেজরিওয়াল সাধারণ মানুষের মনের কথা নিজে বলেন। মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরেও যে ব্যক্তি নিরাপত্তা আর সরকারি প্রটোকলের ঘেরাটোপে থাকেননি, এখনো থাকতে চান না, দিল্লির সাধারণ থেকে বিত্তবানেরাও এ ধরনের নেতৃত্বই চেয়েছিলেন। দুর্নীতির বিরুদ্ধে কেজরিওয়ালের কার্যকর পদক্ষেপের যৎসামান্য উদাহরণ মানুষের মনে নাড়া দিয়েছিল। এবার আরও কার্যকর অবস্থান আশা করে। এমন অভিপ্রায়ই রামলীলা ময়দানে শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের পর আম আদমিপ্রধান ও দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছেন।
কেজরিওয়াল ভারতীয় জনতা পার্টির অহংকে কিছুটা হলেও ফুটো করার চেষ্টা করেছেন, তা না হলে যেখানে মাত্র কয়েক মাস আগে লোকসভায় বিজেপি দিল্লি অঞ্চলের সাতটি আসনেই জয়ী হয়েছিল, সেখানেই মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে এমনভাবে ধরাশায়ী হবে কেন? লোকসভা নির্বাচনে প্রদত্ত ভোটের ৪৬ শতাংশ ভোট বিজেপি পেয়েছিল কিন্তু বিধানসভা নির্বাচনে একই স্থানে ভোট কমে ৩২ দশমিক ২ শতাংশ এবং আম আদমি পার্টির ২৪ দশমিক ৮১ শতাংশ ভোট বেড়ে প্রদত্ত ভোটের ৫৪ দশমিক ৩ শতাংশ হয়েছে। অন্যদিকে জাতীয় কংগ্রেস পেয়েছে মাত্র ৯ দশমিক ৭ শতাংশ ভোট। এ পরিসংখ্যান থেকেই প্রতীয়মান যে ভারতে, অন্তত রাজধানী অঞ্চলের ভোটাররা কেজরিওয়ালের এবং আম আদমি পার্টির মতো কাউকে পেলে দুটি বৃহৎ দলের প্রভাবমুক্ত হতে চাইবেন।
কেজরিওয়ালের এ সাফল্য বিজেপির রথযাত্রায় সামান্য হলেও ধাক্কা দিয়েছে। এ বিষয় হয়তো ভারতের রাজনীতিতে গেড়ে থাকা দুই দলের বাইরে সাধারণ মানুষের একটি শক্তির উত্থান দৃশ্যমান হতে পারে। অবশ্যই নির্ভর করবে আগামী কয়েক বছরে দিল্লি সরকার জনগণের আকাঙ্ক্ষা কতখানি পূরণ করতে পারবে। বড় দুই দলের মাঝে কেজরিওয়ালের অভিযাত্রা যতটা সহজ মনে করা যায়, তেমন না–ও হতে পারে। ভারতের রাজধানী অঞ্চলে আম আদমি পার্টির উত্থান খালি সাদা-কালোর বিচারে হয়তো বিশাল ভারতীয় রাজনীতিতে খুব বড় একটা রাজনৈতিক বিপ্লব না–ও হতে পারে, তবে নতুন মাত্রা যোগ করবে।
আমাদের দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির পেছনে যে বড় দুটি দলের সংঘাতময় অবস্থা তৈরি হয়েছে, তাতে অনেকেই কেজরিওয়ালের মতো অতি সাধারণ কাউকে খোঁজার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। তবে আমাদের দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা ভারতের গণতন্ত্রের এবং রাজনৈতিক বাস্তবতার মতো নয়। এখানে কেজরিওয়ালদের উত্থান বড় দলগুলোর স্বার্থহানি করলে অথবা অবস্থানকে চ্যালেঞ্জ করলে সে উত্থান বহুদূর এগোতে পারবে না। কারণ, আমাদের দেশের রাজনীতিতে দুটি বৃহৎ দল যেভাবে জায়গা দখল করে রয়েছে, সেখানে অন্য কারও প্রবেশ সহজ নয়। তবে লেজুড়বৃত্তিতে সমস্যা হয় না, এমন অতীত উদাহরণ রয়েছে। বিগত বিএনপি সরকারের সময় একজন সাবেক রাষ্ট্রপতি বৃহৎ দলকে চ্যালেঞ্জ করতে গিয়ে লাঞ্ছিত হয়েছিলেন। এখনো এমন বাস্তবতাই রয়েছে। আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির কারণে ভারতের মতো শক্ত নাগরিক সমাজও গড়ে উঠতে পারেনি। নাগরিক সমাজের যেকোনো উদ্যোগকে ‘বিরাজনীতিকরণের’ সংজ্ঞায় সংজ্ঞায়িত করা হয়। এসব কারণে এ দেশে আন্না হাজারের মতো মানুষের আবির্ভাব হয় না। আমাদের রাজনীতি যত সংঘাতময়ই হোক না কেন, প্রতিষ্ঠিত ও প্রচলিত রাজনীতিকে কেউ চ্যালেঞ্জ করলে তিনি সহজে পার পাবেন না।
পূর্ণ গণতান্ত্রিক পরিবেশ এবং উচ্চ রাজনৈতিক, নৈতিক ও সংস্কৃতিসম্পন্ন দেশেই কেজরিওয়ালদের উত্থান সম্ভব। যত দিন পর্যন্ত আমাদের দেশের গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ না পাবে, তত দিন নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান দুরূহ মনে হয়। গণতন্ত্রের ভিত মজবুত করতে হলে দেশের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাধীন এবং সাহসী ভূমিকা রাখতে হবে। যত দিন পর্যন্ত রাজনৈতিক দলসহ অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো শক্ত ভিতে দাঁড়াতে না পারবে, তত দিন গণতন্ত্রের বৈচিত্র্যের এবং ভিন্নমতের স্বাদ সাধারণ জনগণ পাবে বলে মনে হয় না।
তথাপি আশা করা যায়, আমাদের সচেতন জনগণই নতুন ধারার রাজনীতির পথ ধরতে আমাদের রাজনীতিবিদদের বাধ্য করবেন। এই পরিবর্তনের জন্য আমাদের দেশের তরুণদেরই এগিয়ে আসতে হবে। তরুণেরাই পারবেন বিদ্যমান রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন ঘটাতে। ভারতের তরুণেরা পারলে আমাদের তরুণেরা পারবেন না কেন?
এম সাখাওয়াত হোসেন (অব.): অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, সাবেক নির্বাচন কমিশনার ও কলাম লেখক৷
[email protected]

বিজ্ঞাপন
কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন