বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

সম্প্রতি তানিয়া নূরের সঙ্গে পাসপোর্ট অফিসের কতিপয় কর্মীর দুঃখজনক ও লজ্জাজনক আচরণের ঘটনা আরও যে প্রশ্নগুলোর জন্ম দেয়, তা হলো চাকরির নিশ্চয়তা, অর্থের দম্ভ কিংবা সম্ভাব্য অপরাধীকে হাতেনাতে ধরতে পারার মস্ত সুযোগ লাভ—এগুলোর কারণেই কি তাঁরা নিজ দায়িত্ব-কর্তব্যের সীমার কথা বিস্মৃত হয়ে গেলেন? পেশাগত মূল্যবোধের প্রতিফলন এ ক্ষেত্রে কোথায়? একজন মানুষ পাসপোর্ট অফিসে তাঁর চোখ স্ক্যান করাতে ব্যর্থ হলে এতগুলো অযাচিত, অশোভন, অসংবেদী প্রশ্নবাণে তাঁকে জর্জরিত করা কি সেই প্রশ্নকারীদের এখতিয়ারে পড়ে? অবশ্য তানিয়া নূর নারী না হয়ে পুরুষ হলে তাঁকে অন্তত একটি প্রশ্ন কম করা হতো, চোখে কাজল দেওয়ার কারণে স্ক্যানারে চোখ ধরা না পড়ার দায় নিতে হতো না।

সমাজবিজ্ঞানী পিটার বার্জার ও থমাস লুকম্যান বাস্তবতার সামাজিক গঠন (সোশ্যাল কন্সট্রাকশন অব রিয়েলিটি) সম্পর্কে বলেছিলেন, আমরা যা দেখি, তার বাইরেও যে আরও কিছু থাকতে পারে, তা ভাবতে পারি না। আমাদের বাস্তবতা তৈরি হয় আমাদের ক্ষুদ্র জ্ঞানের ভিত্তিতে। আমরা নিজের সীমিত জানা ও স্বল্প দেখাকে মনে করি এটাই সব, এটাই সর্বত্র সর্বতোভাবে প্রযোজ্য। মানুষ দৃষ্টিহীন হলে সব সময় দৃষ্টিমানদের চোখে তা ধরা পড়বে, এমনটাই ধরে নিয়েছিলেন পাসপোর্ট অফিসের কর্মীরা। পৃথিবীর তাবৎ দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীর চোখে তাদের অন্ধত্ব একই রকমভাবে দৃশ্যমান না-ও হতে পারে—এ সত্য তাই রয়ে গিয়েছিল কিছু দৃষ্টিমানের দৃষ্টির আড়ালে।

দামি টাইলস ও কার্পেট কিংবা অত্যাধুনিক সোফা বা ঝাড়বাতিতে কক্ষের শোভা বাড়ানোর জন্য অর্থ ব্যয় না করে অনায়াসে সেখানে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সময় কি এখনো হয়নি? চিন্তার সীমিত গণ্ডির কারণে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান সেবাদানের ক্ষেত্রে এখনো অন্তর্ভুক্তিমূলক পদ্ধতি প্রবর্তন করতে পারেনি। উপরন্তু, নিজেদের চিন্তার সীমাবদ্ধতা ও চিত্তের ক্ষুদ্রতার জন্য ভুল স্বীকার করে ক্ষমতা চাওয়ার দৃষ্টান্তও বিরল।

এ সত্য ধরা পড়ার পর তখন তাঁর প্রতি সংবেদনশীল না হয়ে আক্রমণাত্মক হওয়া কিসের পরিচায়ক? আর তাঁকে করা প্রশ্নগুলো একটি সরকারি দপ্তরের শিক্ষিত পেশাজীবীর আচরণের সঙ্গে কতটুকু মানানসই? তাঁদের প্রশ্নগুলো ছিল এমন: ‘আপনি অন্ধ, তার সার্টিফিকেট কই? আপনি যে দেখেন না, তো চোখ এমন স্বাভাবিক কেন? অন্ধ চোখ নরমাল দেখায় কেন? আপনি অন্ধ, তার প্রমাণ কী? আপনার এটা কি নকল চোখ? আপনি অন্ধ, তার ডিক্লারেশন ও সার্টিফিকেট আনবেন, তারপর কাগজ সাবমিট হবে। আপনি চোখে কাজল দিয়ে এসেছেন বলেই স্ক্যান করা যাচ্ছে না।’

এ ঘটনার পর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলেছেন, ফরমটি সংশোধন করতে হবে। তা-ও ভালো। এর মাধ্যমে তাঁরা পরোক্ষে স্বীকার করলেন যে দূরদৃষ্টি প্রয়োগ না করায়, রাষ্ট্রের সব নাগরিকের কথা চিন্তা না করায়, নাগরিকের অধিকার ও সুবিধা প্রবর্তনে অন্তর্ভুক্তিমূলক পদ্ধতিতে কাজ না করায় ফরমটি ত্রুটিযুক্ত ছিল। হাত বা হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি না থাকা মানুষ দেখলে পরে আমাদের বোধোদয় হয়, মানুষটি অঙ্গুলির ছাপ দিতে পারবেন না। কারও দৃষ্টিহীনতার কারণে স্ক্যানারে চোখ ধরা না পড়লে তবেই আমরা অনুভব করি, তাঁর জন্য বিকল্প কোনো পদ্ধতি রাখা প্রয়োজন ছিল। কাউকে হুইলচেয়ারে করে আসতে দেখলে তবেই আমরা বুঝতে শিখি যে সিঁড়ি বেয়ে ওঠা তাঁর জন্য অসম্ভব। দামি টাইলস ও কার্পেট কিংবা অত্যাধুনিক সোফা বা ঝাড়বাতিতে কক্ষের শোভা বাড়ানোর জন্য অর্থ ব্যয় না করে অনায়াসে সেখানে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সময় কি এখনো হয়নি? কিন্তু চিন্তার সীমিত গণ্ডির কারণে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান সেবাদানের ক্ষেত্রে এখনো অন্তর্ভুক্তিমূলক পদ্ধতি প্রবর্তন করতে পারেনি। উপরন্তু, নিজেদের চিন্তার সীমাবদ্ধতা ও চিত্তের ক্ষুদ্রতার জন্য ভুল স্বীকার করে ক্ষমতা চাওয়ার দৃষ্টান্তও বিরল।

পরিতাপের বিষয়, পাসপোর্ট অফিসের সেই কর্মীরা ভুলে গিয়েছিলেন, বেতনভুক্ত কর্মী হিসেবে স্থায়ী চাকরি করলেও তাঁদের কাজ মানুষকে সেবা দেওয়া। সেবা দেওয়ার বিধান আইন দিয়ে প্রণয়ন করা যেতে পারে, কিন্তু সেবা দেওয়ার মানসিকতা তৈরি করবে কোন আইন? এক চোখের দৃষ্টিহীনতার জন্য তানিয়া দায়ী নন। তা ছাড়া যে মানুষটি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধিতা নিয়ে অসীম মনোবলের জোরে শহরের সেরা স্কুল-কলেজ থেকে সেরা ফল করে বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়া শেষে নিজ যোগ্যতায় সফল কর্মজীবী হয়েছেন, সে মানুষের সঙ্গে শুদ্ধাচার করতে না পারায় পাসপোর্ট অফিসের কেউ ক্ষমাও চাইল না।

বিদ্যাসাগরের লক্ষ্য ছিল ‘আমারে না যেন করি প্রচার আমার আপন কাজে’। তাই নিজের সম্মানের ওপরে স্থান দিয়েছিলেন অন্যের উপকারকে। আর আজ আত্মপ্রচারসর্বস্ব দাম্ভিক ‘আমি কী হনু রে’ মানুষের চিন্তা থাকে কেমন করে আরও বেশি করে নিজের ক্ষমতা দিয়ে অন্যকে অপমান ও দগ্ধ করা যায়।

দুই নম্বর পাসপোর্ট করতে এলে কাউকে ধরে যদি আইনের মাধ্যমে শাস্তি দেওয়ার বিধান থাকে, তাহলে এক নম্বর পাসপোর্ট করতে আসা একজন নাগরিকের সঙ্গে দুর্বিনীত আচরণ করা ও তাঁকে শিষ্টাচারবহির্ভূত অপমানকর প্রশ্ন করার জন্যও প্রশ্নকারীদের জবাবদিহির বিধান থাকা উচিত নয় কি? এটিও বলতে হয় একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষকে সদাচার শেখানো যায় না, এটির জন্য যে শিক্ষাব্যবস্থা লাগে, সেটির মধ্যে যে ভয়াবহ গলদ আছে, তা আমরা দেখতে পাই।

ড. ইশরাত জাকিয়া সুলতানা সহকারী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগ এবং সদস্য, সেন্টার ফর পিস স্টাডিজ, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন