default-image

বাংলাদেশে অমানবিক ঘটনা, মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি এত বেশি এবং প্রায় প্রতিদিনই ঘটে যে সেসব সংবাদ মানুষকে বিশেষ বিচলিত করে না। শুধু সড়ক দুর্ঘটনায়ই প্রতিদিন গড়ে জনা পঁচিশ মানুষ মারা যায়। মর্মন্তুদ শিশু ও নারী নির্যাতনের ঘটনা এখন গা-সহা হয়ে গেছে। ৫০ বছর আগে মানুষে মানুষে যে সহমর্মিতা ছিল, এখন ব্যস্ত জীবনে তা লক্ষ করা যায় না। এই অবস্থায়ও হঠাৎ দু-একটি ঘটনায় প্রমাণ পাওয়া যায় বাঙালির অন্তর থেকে স্নেহ-মমতা-ভালোবাসা নিঃশেষ হয়ে যায়নি। অপরের দুঃখ-শোকে তার মনটা কেঁদে ওঠে।
গত শুক্রবার শাহজাহানপুর রেলওয়ে কলোনির মাঠে ওয়াসার পাইপের ভেতর পড়ে গিয়ে চার বছরের জিহাদ মারা গিয়ে তা আর একবার প্রমাণ করে দিয়ে গেল। দুর্ঘটনার পর অজ্ঞাত জিহাদ হয়ে উঠেছিল ১৬ কোটি মানুষের সন্তান। ঘটনাটি রাজনৈতিক বা দলীয় ব্যাপার না হওয়ায় তাতে মানসিকভাবে জড়িয়ে পড়ে দল-মত-জাতি-ধর্ম-বর্ণ-নারী-পুরুষনির্বিশেষে সবাই।
প্রতিদিন এত মানুষের অপমৃত্যু হচ্ছে, একটি শিশুর জন্য কেন এত আকুলতা? জিহাদ কোনো বিখ্যাত মা-বাবার
সন্তান ছিল না। তার বাবা একজন নিম্ন আয়ের নিরাপত্তাকর্মী। জিহাদ যদি সড়ক দুর্ঘটনায়, অগ্নিদগ্ধ হয়ে বা অন্য কোনোভাবে মারা যেত, ওর প্রতিবেশীরা ছাড়া আর কারও হৃদয় তাতে কেঁপে উঠত না। জিহাদের অপমৃত্যুর জন্য যেহেতু আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্র দায়ী, আমরা ১৬ কোটি মানুষই দায়ী, তাই তার জন্য বেদনা ও শোকও সবারই।
এ–জাতীয় ঘটনা শুধু বাংলাদেশে নয়, পৃথিবীর অন্য দেশেও আগে ঘটেছে। এবং তা নাড়া দিয়েছে সব মানুষের অন্তরাত্মাকে। বহু বছর আগে একটি শিশু ইতালিতে একটি কূপে পড়ে গিয়েছিল। তার উদ্ধার তৎপরতায় তদারকি করতে গিয়ে ইতালির প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন এবং তাঁর সেই বক্তব্য বিশ্বব্যাপী প্রচারিত হয়েছিল: ‘আমরা চাঁদে মানুষ পাঠিয়ে ফিরিয়ে আনতে পারি, ১০০ গজ নিচে থেকে একটি বাচ্চাকে তুলে আনতে পারি না।’ হাজারো মানুষ প্রতিদিন দুর্ঘটনায় মারা যায়, কিন্তু একটি জীবনের মূল্যও পরিমাপযোগ্য নয়—হোয়েন কোয়েশ্চেন অব লাইফ, ওয়ান ইজ টু বিগ আ নাম্বার—যেখানে জীবনের প্রশ্ন জড়িত, সেখানে একজনই অনেক বড় সংখ্যা। জিহাদ যখন পাইপের ভেতরে পড়ে যায়, তখন সে আর একজন থাকে না, পরিণত হয় ঢাকা শহরের—ঢাকা ওয়াসার এলাকার সমস্ত জনগোষ্ঠীতে।
জিহাদের জন্য অন্য রকম যুদ্ধটিভি চ্যানেলগুলোর অসামান্য তৎপরতায় জিহাদের ঘটনাটি বাংলাদেশের অন্তত আট কোটি মানুষ এবং দেশের বাইরের কয়েক কোটি মানুষ জানে। সুতরাং, তা নতুন করে কাউকে বর্ণনা করার প্রয়োজন নেই। কিন্তু এক জিহাদের মৃত্যু অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়ে গেছে। সেসব প্রশ্নের জবাব হয়তো কোনো দিনই পাওয়া যাবে না। আমাদের এই গাঙ্গেয় বদ্বীপে সেসবের জবাবদিহি করতে কেউ বাধ্য নয়।
দুর্ঘটনা ঘটতেই পারে। অনেক সময় নিজের বাড়িতেও ঘটে। নিজের ভুলের জন্যও ঘটে। কয়েক বছর আগে ভারতের হরিয়ানায় ৬০ ফুট গভীর এক কূপের মধ্যে পড়ে গিয়েছিল পাঁচ বছর বয়সী এক শিশু। ভারতীয় সেনাবাহিনীর সেই শ্বাসরুদ্ধকর উদ্ধারকাজ আমরা টিভিতে দেখেছি। প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং উদ্ধার অভিযান পর্যবেক্ষণ করেছেন। শুধু ভারতের ঘরে ঘরে নয়, বাংলাদেশের ঘরে ঘরেও উৎকণ্ঠার সঙ্গে প্রিন্স নামক শিশুটির জন্য প্রার্থনা করা হয়েছে। জিহাদের ক্ষেত্রেও তা-ই হলো। কিন্তু ঘটনাটি ঘটল কেন?
জিহাদের ঘাতক তো একজন নয়, অনেকে। এক নম্বর আসামি রাষ্ট্রযন্ত্র বা প্রশাসন। অন্যান্য আসামির মধ্যে রয়েছে ঢাকা ওয়াসা, বাংলাদেশ রেলওয়ে, ঢাকা সিটি করপোরেশন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি প্রভৃতি। যে মাঠের মধ্যে কলোনির ছেলেমেয়েরা খেলাধুলা করে, অন্ধকার রাতে মানুষকে চলাফেরা করতে হয়, সেই মাঠের মধ্যে ওই রকম গভীর একটি নলকূপের মুখে ঢাকনা থাকবে না, তা বিশ্বাস করতে কেউ বাধ্য নয়। কর্তব্যে অবহেলার জন্য ওয়াসার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন। তাঁকে/তাঁদেরকে সর্বোচ্চ শাস্তি না দিলে আমাদের সরকার রোজকিয়ামত পর্যন্ত দায়ী থাকবে। সাময়িক বরখাস্ত কোনো শাস্তি নয়, বরং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে পরিবারের কাজকর্মে গভীর মনোযোগ দিতে অখণ্ড অবসর করে দেওয়া।
বিরাট অপরাধী বাংলাদেশ রেলওয়ে। জিহাদের অপমৃত্যুর জন্য রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ দায়ী। জনগণের রোষ থেকে বাঁচতে এবং মানুষের আবেগকে প্রশমিত করতে সব সময়ই যা করা হয়, এ ক্ষেত্রেও তা-ই করা হয়েছে। রেলের একজন কর্মকর্তাকে মুহূর্ত দেরি না করে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। পাইপ বসানোর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল যে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে, তাকে কালো তালিকাভুক্ত বা তার লাইসেন্স নাকি বাতিল করা হয়েছে। এ আবার এক বড় রকমের ধোঁকাবাজি। স্রেফ আত্মরক্ষামূলক ব্যবস্থা।
দুর্নীতি ও চুরিচামারিতে বাংলাদেশ রেলওয়ে ৪২ বছরে সর্বনাশের শেষ কিনারে পৌঁছেছে। ৪২ বছরে রেলওয়ের উল্লেখযোগ্য ঘটনা মাত্র একটি। সেটি ঘটেছে বর্তমান অর্থবছরে। ঘটনাটি হলো একটি বিয়ে এবং সে উপলক্ষে অনেকগুলো বউভাত। কোনো কোনো কাগজ লিখেছে রাজকীয় বিয়ে। বাংলাদেশে আপাতদৃষ্টিতে রাজা ও রাজতন্ত্র নেই। তাই রাজকীয় বিয়ে না বলে বলা উচিত ছিল রাষ্ট্রীয় বিয়ে। তার চেয়েও ভালো হয়, যদি বলা হতো রেলওয়ের বিয়ে। বিয়ে ও বউভাত উপলক্ষে রেলগাড়িতে চড়ার সৌভাগ্য হলো খাসির।
কোথায় রেলওয়ের মাঠে ৪০০ ফুট গভীর পাইপের মুখ খোলা, সে তো অতি সামান্য ব্যাপার। রেলওয়ের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা ৪২ বছরে মাত্র একটি দায়িত্বই অতি নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেছেন। কমলাপুর রেললাইনের দুই পাশ ভরে গেল অগণিত খাসিতে। মাত্র কয়েক দিন আগেই হয়ে গেছে কোরবানির ঈদ। তাই অনেকে অবাক হলো খাসির সমাবেশ দেখে। পত্রিকার রসিক রিপোর্টার শুধু বিয়ের পাগড়ি, লক্ষাধিক টাকার শেরওয়ানির ছবিই ছাপেননি, বউভাতের কাচ্চি বিরিয়ানির জন্য খাসিগুলোর ছবিও ছেপেছেন। ছবির ক্যাপশন: কোরবানির হাট নয়, বউভাতের খাসি। বাঙালির এক বিয়েতে একটিই বউভাত হয়, বিলম্বিত বিয়ের বউভাত অনেকগুলো। কোনোটি রাজধানীতে, কোনোটি মফস্বল শহরে, কোনোটি গ্রামে, কোনোটি বরের নিজের বাড়িতে, কোনোটি কনের পিত্রালয়ে। রেলের কর্মকর্তাদের বিয়ের এন্তেজামে যে কর্তব্যনিষ্ঠা দেখা গেছে, তার শতভাগের এক ভাগ অফিসের কাজে থাকলে জিহাদের দুর্ঘটনায় অপমৃত্যু হতো না।
রাতভর রুদ্ধশ্বাস অভিযানদমকল বাহিনী বিভিন্ন অগ্নিকাণ্ডে দায়িত্ব পালন করে। বাহিনীর কর্মচারীদের অনেকে উদ্ধারকাজ করতে গিয়ে আহত হন। দুর্ভাগ্যজনক হলো, জিহাদ উদ্ধারে প্রথম দিকে যে তৎপরতা তাঁদের ছিল, শেষ পর্যন্ত তা ছিল না। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা নানা রকম বিভ্রান্তির সৃষ্টি করেছেন। জনগণের চোখকে ধোঁকা দেওয়া যায়, কিন্তু মিডিয়ার চোখকে নয়। তা ছাড়া আজকাল কর্তব্য বাদ দিয়ে মিডিয়ায় প্রচারের জন্য আকুলতাই বেশি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ দিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ফ্রান্স ও সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতারা বার্লিনে যেভাবে চুক্তি স্বাক্ষর করে বিবৃতি দেন, একাত্তরের ষোলোই ডিসেম্বর রেসকোর্স ময়দানে মিত্রবাহিনীর জেনারেল অরোরা এবং পাকিস্তান বাহিনীর জেনারেল নিয়ািজ যেভাবে আত্মসমর্পণ দলিলে স্বাক্ষর করেন, সেই ভঙ্গিতেই দমকল বাহিনীর মহাপরিচালক সংবাদ সম্মেলন করে তাঁর উদ্ধার অভিযান সাঙ্গ ঘোষণা করেন। নিয়াজির মতো দুনিয়ার লোককে জানিয়ে পরাজয় ঘোষণা। পাইপের মধ্যে শিশুর অস্তিত্ব নেই, কিসের উদ্ধারকাজ!
সেই একাত্তরের মতোই বাংলার যুবসমাজ শেষ না দেখে ছাড়ার পাত্র নয়। কয়েকজন হৃদয়বান যুবক শিশুটিকে উদ্ধারের জন্য শেষ চেষ্টা চালিয়ে যান। এবং আল্লাহর অশেষ রহমতে তাঁরা সফল হন। উদ্ভাবনী শক্তিসম্পন্ন এই যুবসমাজের তিন কোটি সদস্যকে রাষ্ট্র ও সমাজ গঠনের কাজে ব্যবহার করলে একাত্তরের লাখো শহীদের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হতে পারত।
গত হাজার বছরের ১০টি বিস্ময়কর অনৈতিক, অন্যায় ও অমানবিক কাজের একটি ছিল জিহাদের বাবাকে তুলে নিয়ে পুলিশের ১২ ঘণ্টা আটকে রাখা। যে মুহূর্তে তাঁর মতো সন্তানহারা বাবার প্রয়োজন সর্বোচ্চ সহানুভূতি, সেই মুহূর্তে তাঁকে করা হয় নির্যাতন—তা শারীরিকই হোক বা মানসিকই হোক। ‘কোনখানে ছেলেরে লুকাইয়া রাখছিস’—এই বাক্যটি যার মুখ থেকে বেরিয়েছে, ধারণা করি আল্লাহ তাআলার গজব তার ওপর নাজিল হবে। তবে ওই গজবের ভরসায় তাকে উপযুক্ত শাস্তি থেকে অব্যাহতি দিলে ওই নিষ্পাপ শিশুর অভিশাপে গোটা জাতির ওপর নেমে আসবে গজব। চার শিশুকে থানায় নিয়ে জেরা করা মানবজাতির ইতিহাসে নজিরবিহীন।
ভাববাদী কবি বলেছেন, মানুষের ওপর বিশ্বাস হারানো পাপ। কিন্তু আমাদের রাষ্ট্রের ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক ফরেনসিক বিভাগের কর্তাদের ওপর বিশ্বাস না হারিয়ে উপায় কী? বাচ্চাটির নিষ্পাপ শরীর পরীক্ষা বা কাটাছেঁড়া করে এসে ফরেনসিক কর্তা টিভি ক্যামেরার সামনে হাস্যোজ্জ্বল মুখে যে ব্যাখ্যা দিলেন, তাতে বোঝা গেল আমাদের রাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের কোনো দোষ নেই।
বেতনভুক সরকারি কর্তাদের আমরা দোষারোপ করি কর্তব্যে অবহেলার জন্য। তাঁদের প্রতি জনগণের ক্ষোভের সংগত কারণ রয়েছে। কিন্তু নাগরিকদেরও একটি সামাজিক দায়িত্ব রয়েছে। আড়াই বছর পাইপের মুখ খোলা রইল, বাচ্চারা সেখানে খেলাধুলা করে; স্থানীয় অভিভাবকদের কি কর্তব্য ছিল না নিজেদের উদ্যোগেই পাইপের মুখ বন্ধ করা?
জিহাদের অপমৃত্যু আওয়ামী লীগ-বিএনপির বিষয় নয়, নষ্ট রাজনীতির এর সঙ্গে সম্পর্ক নেই। তাই জাতি দেখতে চায় কর্তব্যে অবহেলার জন্য দোষী ব্যক্তিদের সর্বোচ্চ শাস্তি। তা যদি না হয়, তাহলে বুঝব বাংলাদেশ একটি ঢাকনাবিহীন গভীর পাইপ। আমি গুনে দেখেছি, মাত্র ৪২০ জন সুবিধাভোগী ছাড়া তার মধ্যে আটকা পড়েছে ১৬ কোটি মানুষ। সেখান থেকে তাদের উদ্ধার করতে পারে বুদ্ধিদীপ্ত যুবসমাজের তৈরি বিশেষ খাঁচা।
সৈয়দ আবুল মকসুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক৷

বিজ্ঞাপন
কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন