হিলালী ‘নিখোঁজ’ হন ১ জুলাই (শুক্রবার) রাতে এবং দুদিন পর রোববার মধ্যরাতে তাঁকে সাভারের হেমায়েতপুরে চোখ বাঁধা অবস্থায় ফেলে রেখে যাওয়া হয়। তাঁকে খুঁজে পাওয়ার পর তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, শুক্রবার রাত আটটার দিকে বাসা থেকে উত্তরা ১৩ নম্বর সেক্টরের অফিসের উদ্দেশে বের হয়েছিলেন আমিন মোহা. হিলালী। উত্তরার জমজম টাওয়ার থেকে ১৩ নম্বর সেক্টরের দিকে হেঁটে যাচ্ছিলেন তিনি। এ সময় রাস্তায় পরপর তিনটি মাইক্রোবাস দাঁড়িয়ে ছিল। তিনজন তাঁকে কোলে করে একটি মাইক্রোবাসে তুলে চোখ বেঁধে ফেলেন। আমিন মোহা. হিলালীর ভাই রফিকুল ইসলাম সংবাদমাধ্যমের কাছে বলেন, জমি কেনাবেচায় নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাকে কত টাকা ঘুষ দেওয়া হয়েছে, তা স্বীকারোক্তিতে বলতে বলা হয়। ঘুষ দেওয়ার কথা উল্লেখ করে হিলালীকে ক্ষমা চাইতে বলা হয়। স্বীকারোক্তি নেওয়ার সময় ভিডিও ধারণ করা হয় এবং তাঁর ১০ আঙুলের ছাপও নেওয়া হয়।

সর্বশেষ এ বছরের ১৬ জুন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক জাতীয় সংসদে বলেছেন, আইন প্রণয়নের বিষয়টি সরকারের বিবেচনায় রয়েছে। তবে হিলালীর এই ঘটনার পর মনে হচ্ছে, শুধু ভুক্তভোগী বা সাক্ষীর জন্য নয়, আসামির সুরক্ষা ও নিরাপত্তার জন্যও বাংলাদেশে আইনের প্রয়োজন রয়েছে! ভুক্তভোগী, সাক্ষী, আসামি সবার নিরাপত্তার জন্যই যদি আইনের প্রয়োজন হয়, তাহলে বুঝতে হবে দেশের কোনো মানুষই এখন আর নিরাপদ নয়।

ব্যবসায়ী হিলালী একটি দুর্নীতি মামলার আসামি, তাঁর বিরুদ্ধে আইনসঙ্গতভাবে আদালতের নির্দেশে যেকোনো ব্যবস্থা নেওয়া যেতেই পারে। কিন্তু তাঁকে এভাবে তুলে নিয়ে যাওয়া ও জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি আদায়ের বিষয়টি খুবই আশঙ্কাজনক এবং একই সঙ্গে তা অনেক প্রশ্নেরও জন্ম দিয়েছে। প্রশ্নগুলোর মধ্যে রয়েছে, কারা তাঁকে তুলে নিয়ে গেল? কেন বা কোন উদ্দেশ্যে নিয়ে গেল? তাঁর কাছ থেকে নেওয়া স্বীকারোক্তির আদৌ কোনো আইনগত ভিত্তি আছে কি না?

হিলালীর বরাত দিয়ে তাঁর ভাই জানান, তুলে নেওয়ার দুই ঘণ্টা পর তাঁকে একটি ছোট্ট কক্ষে রাখা হয়েছিল। সেখানে একজন চিকিৎসক মাস্ক পরিহিত অবস্থায় দিনে তিনবার তাঁর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেছেন। ওজন, ডায়াবেটিস ও রক্তচাপ পরীক্ষা করেছেন চিকিৎসক। নিয়মিত ওষুধ দিয়েছেন। তিন বেলা খাবারও দেওয়া হয়েছে তাঁকে। হিলালীর সঙ্গে তাঁরা কোনো দুর্ব্যবহার করেননি। তাঁদের সবকিছুতে শৃঙ্খলা ছিল (৪ জুলাই, প্রথম আলো অনলাইন)।

হিলালীর অপহরণকারীরা তাঁর কাছ থেকে কোনো টাকা-পয়সা নেননি এবং তাঁকে আটকে রেখে তাঁরা কোনো মুক্তিপণও দাবি করেননি। হিলালীর বক্তব্য ও এই ঘটনা থেকে স্পষ্ট যে সাধারণ কোনো দুর্বৃত্তের দল নয়, বরং পেশাদার কোনো গ্রুপ তাঁকে অপহরণের সঙ্গে যুক্ত ছিল। তারা প্রকাশ্যে মাইক্রোবাসে যেকোনো ব্যক্তিকে তুলে নিতে পারে, কাউকে তুলে নেওয়ার পর তাঁকে আটক রাখার জন্য ‘সেফ হোম’ এর ব্যবস্থা পর্যন্ত তাঁদের আছে, সেখানে দিনে তিনবার একজন চিকিৎসক নিয়ে আসতেও তাঁদের কোনো বেগ পেতে হয় না এবং সবচেয়ে বড় কথা এই অপরহরণকারীরা খুবই শৃঙ্খলার সঙ্গে কাজ করতে সক্ষম। এর আগেও এ ধরনের ‘অপহরণের’ অনেক ঘটনা ঘটেছে এবং যেগুলোর কোনো রহস্যভেদ কখনও হয়নি। দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংস্থাগুলো এ ধরনের অপহরণ বা গুমের ঘটনার সঙ্গে আইন–শৃঙ্খলা বাহিনীর যুক্ততার অভিযোগ করে আসছে। হিলালীকে তুলে নেওয়ার ঘটনাটি খুব স্বাভাবিক কারণেই নানা সন্দেহ ও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

হিলালীকে তুলে নেওয়ার পর তাঁর কাছ থেকে যেভাবে ‘স্বীকারোক্তি’ আদায় করা হয়েছে, সেটার মধ্যে ‘পেশাদারিত্ব’ থাকলেও, এর কিন্তু কোনো আইনগত ভিত্তি নেই। ফৌজদারি কার্যবিধি অনুসারে, কোনো ব্যক্তি ‍দুইভাবে স্বীকারোক্তি দিতে পারেন। ১৬১ ধারায় পুলিশের কাছে এবং ১৬৪ ধারায় ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে। আদালত সাধারণত ১৬৪ ধারায় দেওয়া স্বীকারোক্তিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে। অন্যদিকে পুলিশের কাছে দেওয়া স্বীকারোক্তি খুব সহজেই প্রত্যাহারযোগ্য হওয়ায় এর গুরুত্বও কম। এই দুই পদ্ধতি ছাড়া অন্য কোনোভাবে কোনো ব্যক্তির স্বীকারোক্তি আদায় করা হলেও এর আইনগত কোনো ভিত্তি নেই এবং তা আদালতে উপস্থাপনযোগ্যও নয়।

তাহলে হিলালীকে তুলে নেওয়া এবং তাঁর কাছ থেকে স্বীকারোক্তি আদায়ের উদ্দেশ্যটা কী? হিলালীকে ভয় দেখানো এবং তাঁকে চাপে রাখাটাই এর কারণ বলে আপাতদৃষ্টে মনে হয়। এটাকে বিচ্ছিন্ন বা সাধারণ কোনো ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটা একদিকে যেমন আইনের শাসনকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে, তেমনি ভয়ের সংস্কৃতিও তৈরি করছে। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম, রিমান্ডে নির্যাতনের অভিযোগের পর এখন যদি এভাবে জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি আদায়ের অভিযোগও উঠতে থাকে, তাহলে সেটা খুবই আশঙ্কাজনক পরিস্থিতির ইঙ্গিত দেয়। তাই এই ঘটনার জন্য কে বা কারা দায়ী, তা তদন্ত করে দেখা উচিত। হিলালী যেহেতু একটি আলোচিত মামলার আসামি, সেক্ষেত্রে আদালতেরও উচিত বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা।

আসামিপক্ষের হুমকি–ধমকি, ভয়-ভীতি এবং অন্যান্য নিরাপত্তাঝুঁকি থেকে রক্ষা করতে বেশ অনেক দিন ধরেই ভুক্তভোগী (ভিকটিম) ও সাক্ষীদের সুরক্ষার জন্য আইন করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সর্বশেষ এ বছরের ১৬ জুন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক জাতীয় সংসদে বলেছেন, আইন প্রণয়নের বিষয়টি সরকারের বিবেচনায় রয়েছে। তবে হিলালীর এই ঘটনার পর মনে হচ্ছে, শুধু ভুক্তভোগী বা সাক্ষীর জন্য নয়, আসামির সুরক্ষা ও নিরাপত্তার জন্যও বাংলাদেশে আইনের প্রয়োজন রয়েছে! ভুক্তভোগী, সাক্ষী, আসামি সবার নিরাপত্তার জন্যই যদি আইনের প্রয়োজন হয়, তাহলে বুঝতে হবে দেশের কোনো মানুষই এখন আর নিরাপদ নয়।

মনজুরুল ইসলাম সাংবাদিক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন