অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল ২০২০-২১ অর্থবছরের জন্য সংসদে যে বাজেট প্রস্তাব করেছেন, তার প্রধান লক্ষ্য অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি। মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির যে অবাস্তব ও আকাশচুম্বী লক্ষ্য ধরা হয়েছে (৮ দশমিক ২ শতাংশ), বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার পূর্বাভাসের সঙ্গে তার মিল নেই। বিশ্বব্যাংকের মতে, এ বছর বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হবে ১ দশমিক ৬ শতাংশ। সংস্থাটি বলছে, ২০২০ সালে বিশ্বে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৫ দশমিক ২ শতাংশ সংকুচিত হবে। উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলোর সংকোচন হতে পারে ২ দশমিক ৫ শতাংশ হারে। এসব পূর্বাভাস সত্ত্বেও প্রস্তাবিত বাজেট দেখে মনে হয়, বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী আশা করছেন যে বাংলাদেশের অর্থনীতি এই ধারার একেবারে বিপরীতে গিয়ে এই জুলাই মাস থেকেই ঘুরে দাঁড়িয়ে তাক লাগানোর ঘটনা ঘটিয়ে দিতে পারবে। 

প্রশ্ন হলো কোভিড মহামারিতে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাসহ জাতীয় অর্থনীতির যখন বেহাল অবস্থা, এই সময়ে জাতীয় বাজেটের লক্ষ্য শুধু জিডিপিকেন্দ্রিক হওয়া কতটা বিবেচকের লক্ষণ। এটি সরকারের অগ্রাধিকার কোথায় তা বুঝিয়ে দেয়। পরিসংখ্যানের কারুকাজে আগেও বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি আকাশ ছুঁয়েছিল, কিন্তু কোভিড–১৯ মহামারি দেখিয়ে দিয়েছে যে এসব দাবি অন্তঃসারশূন্য। কেননা তিন মাসের মধ্যেই দেশের দরিদ্রের সংখ্যা ৬ কোটিতে গিয়ে পৌঁছেছে, ৩৫ শতাংশ মানুষ এখন দরিদ্রের তালিকাভুক্ত। গত এক দশকের প্রবৃদ্ধিমুখী উন্নয়ন যে দরিদ্র এবং মধ্যবিত্তের জন্য কোনো সামাজিক সুরক্ষার ব্যবস্থা করেনি, এ কথা জানাবোঝার পরও কেন বাজেটের লক্ষ্য হবে একই রকমের অর্থনীতি, সেটাই বড় প্রশ্ন। নাগরিকদের বিপদ থেকে সুরক্ষার বিষয়ে অনাগ্রহ এই বাজেটের বরাদ্দ থেকে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। 

বাজেটে ভেঙে পড়া জনস্বাস্থ্যকে উদ্ধার করা ও ঢেলে সাজানোর দিকে মনোযোগ আমরা দেখতে পাই না। জনস্বাস্থ্য এখন বড় সংকটে, কিন্তু বরাদ্দ বেড়েছে আগের বছরের চেয়ে মাত্র ১৩ দশমিক ৬৩ শতাংশ। মোট বরাদ্দ ২৯ হাজার ২৪৭ কোটি টাকা; পরিচালন ব্যয়ে যাবে ১৬ হাজার ৭৪৭ কোটি টাকা। বাকিটা ব্যয় হবে স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে। করোনাভাইরাস মোকাবিলায় জরুরি চাহিদা মেটাতে ১০ হাজার কোটি টাকা থোক বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। এই টাকা কীভাবে ব্যয় হবে, তা বলা মুশকিল। স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতি দীর্ঘদিনের। এখন সেই দুর্নীতি মহামারির সঙ্গেই পাল্লা দিচ্ছে। ফলে অবস্থা হচ্ছে যেন এই বাজেট ২০১৮ বা ২০১৯ সালের। উপরন্তু সরকার জবাবদিহিহীন ব্যবস্থাকেই বহাল রাখতে চাইছে। গোটা শাসনব্যবস্থার জবাবদিহিহীনতা থেকে স্বাস্থ্য খাত তো আলাদা কিছু নয়। এই খাতে বরাদ্দের প্রশ্নই শুধু গুরুত্বপূর্ণ নয়। এটাও লক্ষণীয় যে অতীতে বরাদ্দকৃত অর্থ সম্পূর্ণ ব্যয় হয়নি। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) উদ্ধৃতি দিয়ে বণিক বার্তার প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে ‘স্বাস্থ্য খাত গত তিন অর্থবছরে প্রায় ৩ হাজার ২৮১ কোটি টাকার প্রকল্প নির্দিষ্ট সময়ে বাস্তবায়ন করতে পারেনি’ (বণিক বার্তা, ১২ মে ২০২০)। দুর্নীতি ও অদক্ষতা মোকাবিলার লক্ষ্যে কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে, গত তিন মাসেও তা জানা যায়নি। ফলে বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের ব্যাপারে আগের বছরের দৃষ্টিভঙ্গি বলছে, অবস্থার আশু বা মধ্য মেয়াদে উন্নতি হবে না। 

করোনাভাইরাসের প্রকোপের পর বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় অর্থনৈতিকভাবে দুর্বলদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা। বাংলাদেশেও তিন মাস ধরে এ নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছে। কিন্তু তার খুব একটা প্রতিফলন বাজেটে নেই। সামজিক সুরক্ষার জন্য বরাদ্দ বেড়েছে বটে, কিন্তু বিপদের মাত্রার সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে হতাশ হতে হয়। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে সামাজিক সুরক্ষায় বরাদ্দ ছিল ৮১ হাজার ৮৬৫ কোটি টাকা, প্রস্তাবিত বাজেটে তা দাঁড়িয়েছে ৯৫ হাজার ৫৭৪ কোটি টাকা। বেড়েছে ১৩ হাজার ৭০৯ কোটি টাকা। বাজেটের ১৬ দশমিক ৮৩ শতাংশ এবং জিডিপির ৩ দশমিক ০১ শতাংশ। যখন ৬ কোটি মানুষ দরিদ্র হয়ে গেছে, তখন জিডিপির ৩ শতাংশ এই লক্ষ্যে বরাদ্দ কি যথেষ্ট? সরকার ইতিমধ্যেই ত্রাণ তৎপরতা ৫০ শতাংশ কমিয়েছে (বণিক বার্তা, ১২ জুন ২০২০)। এই সুরক্ষার ব্যবস্থা আরও বাড়ানোর তাগিদ দেখা যাচ্ছে না। এটা দুর্ভাগ্যজনক, কিন্তু বিস্ময়কর নয়। কেননা বাজেটে তাঁদের প্রতিই পক্ষপাত, যাঁদের সামাজিক সুরক্ষার দরকার নেই: কারণ তাঁদের বৈধ–অবৈধ অর্থের পাহাড় গড়ে উঠেছে। বাজেটে ‘কালোটাকা’ ‘সাদা’ করার ব্যবস্থা তাঁদের জন্যই। এভাবে অবৈধ টাকার বৈধতা দেওয়ার ব্যবস্থা আগেও ছিল, কিন্তু এই বাজেটে এর পরিধি বাড়ানো হয়েছে। এটা কতটা নৈতিক? এটা যাঁরা নিয়মিত কর দেন, তাঁদের জন্য
কতটা ন্যায্য? দেশের টাকা বিদেশে পাচারের এই ব্যবস্থা থাকতে যাঁরা বিদেশে টাকা পাচার করতে চান, তাঁরা কেন কর দিয়ে টাকা দেশে রাখবেন? এঁরা ক্ষমতার সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে যুক্ত কিংবা ক্ষমতাসীনদের আশীর্বাদপ্রাপ্ত। ফলে এভাবে অবৈধ অর্থের বৈধতা দেওয়ার মানেটা বোধগম্য। 

আয়করের নতুন ধাপভিত্তিক ব্যবস্থায় আয়সীমার একেবারে নিচের দিকের মানুষেরা ছাড় পাবেন। কিন্তু সব মিলিয়ে লাভের পাল্লা শেষ পর্যন্ত ধনিকদের দিকেই ভারী। সিপিডির গবেষক ফাহমিদা খাতুনের হিসাবমতে, যাঁদের আয় বেশি তাঁরা বেশি সুবিধা পাবেন। যাঁর মাসিক করযোগ্য আয় ২৫ হাজার টাকা, তিনি বছর শেষে ৫ হাজার টাকার ছাড় পাবেন। আর যাঁর মাসিক করযোগ্য আয় ৪ কোটি টাকা, তিনি বছর শেষে ছাড় পাবেন প্রায় ২ কোটি ৩৮ লাখ টাকা (প্রথম আলো, ১২ জুন ২০২০)। সাধারণ মধ্যবিত্তরা করোনা সংকটের আগেই বিপদে ছিলেন, এখন বিপদ বেড়েছে অনেক। কিন্তু তাঁরা যতটা করছাড় পাবেন, অতিধনীরা পাবেন তার চেয়ে বেশি। 

প্রস্তাবিত বাজেটে সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ বেড়েছে জনপ্রশাসন খাতে। মোট বাজেটের ১৯ দশমিক ৯ ভাগ বরাদ্দ হয়েছে। কয়েক বছর ধরে সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ হয় এই খাতে। নাগরিকদের দেওয়া প্রতি ১০০ টাকার করের ১৮ টাকা ৭০ পয়সা যাবে সরকারি কর্মচারীদের বেতন–ভাতায়, পেনশনে যাবে ৭ টাকা ৮০ পয়সা। এবার অন্য সময়ের চেয়ে ভিন্ন কিছু হলো না। প্রশাসনে সাশ্রয়ের ব্যবস্থা নেওয়ার কোনো উপায় ছিল না? বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত প্রস্তাবিত বাজেটে ২৬ হাজার ৭৫৮ কোটি টাকা বরাদ্দ পেয়েছে, এর একটা বড় অংশই যাবে ব্যক্তি খাতের ভর্তুকিতে। ১০ বছর ধরে তাই হচ্ছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ ১৮ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদে বলেছেন, গত ১০ বছরে সরকার বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি দিয়েছে ৫২ হাজার ২৬০ কোটি টাকা। গত বছর ৭ ডিসেম্বর ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস–এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোনো বিদ্যুৎ উৎপাদন না করেই বেসরকারি কোম্পানিগুলো গত ১০ বছরে উঠিয়ে নিয়েছে ৫১ হাজার ১৫৭ কোটি টাকা। প্রস্তাবিত বাজেটে একদিকে ধনিকদের সুবিধা বাড়ছে, অন্যদিকে দরিদ্র ও মধ্যবিত্তদের এখন যা সবচেয়ে বেশি দরকার, সেই স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষা খাতে বরাদ্দ এবং বৃদ্ধি দুই–ই সীমিত। করোনাভাইরাস সংকট মোকাবিলায় যে ধরনের বাজেটের দরকার ছিল, এটাতে তার লক্ষণ নেই। এটা করোনাকালের বাজেট নয়। 

আলী রীয়াজ যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির সরকার ও রাজনীতি বিভাগের ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0