default-image

সংবিধান ও জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী, সংসদ সদস্যরা শুধু সংসদে এবং সংসদীয় কমিটিতে যা বলেন, তার জন্য দায়মুক্তি পান। বাকি সবকিছুর জন্য রাষ্ট্রের একজন সাধারণ নাগরিকের মতোই তাঁরা অধিকার ভোগ করেন। অতএব, সংসদের বাইরে কোনো কাজের জন্য সংসদ সদস্য বিশেষ অধিকার দাবি করতে পারেন না। এ ক্ষেত্রে তাঁর দায়মুক্তির কোনো সুযোগ নেই।

অন্য এক ব্যক্তিকে ফাঁসাতে থানায় বোমা হামলা চালাতে পুলিশকে একজন সাংসদ যে পরামর্শ দিয়েছেন বলে গণমাধ্যমে খবর প্রচার করা হয়েছে, এটি একজন আইনপ্রণেতা হিসেবে গুরুতর অসদাচরণ বলেই মনে করি। এ বিষয়ে দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

এ ছাড়া সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী, স্পিকার কোনো সদস্যকে বিশৃঙ্খল আচরণের জন্য সাময়িক অপসারণ অথবা বহিষ্কার করতে পারেন। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, এমন নজির নেই।

বাংলাদেশে এখন অনেক সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে পেশিশক্তির দাপট, ক্ষমতার অপব্যবহারসহ নানা অনিয়মে জড়িত থাকার যেসব অভিযোগ আসছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত ‘প্রতিযোগিতামূলক’ নির্বাচনে নির্বাচিত সদস্যদের সম্পর্কে এসব অভিযোগ এতটা প্রকট ছিল না। এই অবস্থার অবসানের জন্য প্রয়োজন ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার সংস্কার। উচ্চ আদালতের আদেশেও এর সংস্কারের সুযোগ ছিল, অন্তত দুই মেয়াদের জন্য। কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার বিলোপের পর এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে এবং সংসদ সদস্যদের সম্পর্কে বিরূপ ধারণা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

আরেকটা বিষয়, বাংলাদেশের কোনো সংসদ সদস্য অন্য দেশে ফৌজদারি অপরাধে দণ্ডিত হবেন, এমনটি দেশের সংবিধান প্রণেতারা তখন ভাবতেও পারেননি। অথচ এ রকম ঘটনার মুখোমুখি হতে হচ্ছে এখন দেশের মানুষকে। আইনপ্রণেতা কারা হচ্ছেন এবং তাঁদের কারও কারও নৈতিক মান কোথায় যাচ্ছে, এ নিয়ে জাতি হিসেবে আত্মোপলব্ধি করা আমাদের সবার জন্য জরুরি।

সাংসদসহ বিভিন্ন পর্যায়ের জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে নানা অভিযোগ আসছে। এমন বাস্তবতায় রাজনৈতিক দলগুলোর প্রার্থী বাছাইয়ের বর্তমান প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। অবশ্য বিশেষ কোনো আইনি ব্যবস্থার মাধ্যমে এর সমাধান করা সম্ভব নয়। এ জন্য দলে অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের উপস্থিতি একটি আবশ্যকীয় শর্ত। নির্বাচনপ্রক্রিয়ায় মৌল পরিবর্তন ছাড়া এ সমস্যার সমাধান হবে না। একটা প্রতিযোগিতামূলক রাজনৈতিক দল ব্যবস্থা থেকে এখন ‘একক আধিপত্যশীল দল ব্যবস্থায়’ (One-party dominance system) উত্তরণ ঘটেছে বাংলাদেশে। এটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সংহতকরণের পথে একটা বড় প্রতিবন্ধক বলে মনে করি।

জওহরলাল নেহরুর সময়ে ভারতেও এ রকম ‘একক আধিপত্যশীল দল ব্যবস্থা’ ছিল। কিন্তু সেটি ভারতে গণতন্ত্রের ভিত্তি রচনা করেছিল। কিন্তু দুঃখজনকভাবে বাংলাদেশে এটি গণতন্ত্রের প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্তত এই ক্ষেত্রে ভারত থেকে আমরা শিক্ষা নিতে পারি।

*নিজাম উদ্দিন আহমদ, সংসদবিষয়ক গবেষক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন