বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

এসব প্রমাণ তারা পেশ করলে দশকের পর দশক আজিজকে জেলখানায় পচতে এবং এবং খলিলকে জেলখাটা অবস্থায় মারা যেতে হতো না। বিচারকের সর্বশেষ রায়ে দেখা যাচ্ছে এফবিআই এবং এনওয়াইপিডির গাফিলতির কারণেই তাঁদের সাজা খাটতে হয়েছে।

মামলার শুনানি গ্রহণকারী বিচারকদের প্রধান বিচারপতি ইলেন বাইবেন বলেছেন, এটি ‘ন্যায়বিচারের ভয়ানক বিচ্যুতি’। ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নি সাইরাস ভ্যান্স দুঃখ প্রকাশ করে বলেছেন, এটি এফবিআই এবং নিউইয়র্ক পুলিশের ‘আইন ও জন আস্থার ভয়ানক অগ্রহণযোগ্য লঙ্ঘন’। আজিজ এবং খলিলের এ খালাস পাওয়াটা কোনো অবাক করা বিষয় ছিল না। কারণ, ইতিহাসবিদ, সাংবাদিক এবং আইনজ্ঞরা কয়েক যুগ ধরে বলে আসছেন এই দুজন নিরপরাধ।

অবাক করার মতো বিষয় হলো অপরাধ না করে থাকলেও তাঁদের অন্যায় কারাবরণে এফবিআই এবং এনওয়াইপিডি মুখে কুলুপ এঁটে ছিল। সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে কৃষ্ণাঙ্গ এবং ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের মধ্যে এফবিআই এবং নিউইয়র্ক পুলিশের ওপর আস্থা কমার ক্ষেত্রে এটি বড় কারণ হবে। এটি তাঁদের মনে এই ধারণা দিয়েছে যে কৃষ্ণাঙ্গ ও মুসলমানসহ ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে সে অনুযায়ী তাঁদের বিরুদ্ধে এফবিআই এবং এনওয়াইপিডি ব্যবস্থা নিচ্ছে।

এই বিকৃত বিচারহীনতা আমাদের সামনে অনেকগুলো প্রশ্ন নিয়ে আসে। যেমন তাহলে কি আসল হত্যাকারীরা এফবিআইয়ের সঙ্গেই ছিল? এবং সে কারণেই কি এফবিআই সত্যটা চেপে গিয়েছিল? যে একমাত্র সাক্ষীর সাক্ষ্যের ভিত্তিতে আজিজ এবং খলিলকে হত্যাকারী সাব্যস্ত করা হয়েছিল, সে কি আসলে এফবিআইয়ের চর ছিল? এসব প্রশ্নের জবাব আমরা পাইনি। কারণ, এফবিআই এবং এনওয়াইপিডি এখনো এই মামলায় নিজেদের স্বচ্ছতা প্রমাণ করতে পারেনি।

১৯৫০–এর দশক থেকে ১৯৭০–এর দশক পর্যন্ত ‘কোইন্টেলপ্রো’ নামের একটি কুখ্যাত কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স প্রকল্প চালিয়েছিল। ওই প্রকল্পের অংশ হিসেবেই মূলত এফবিআই আজিজ এবং খলিলকে খালাস দেওয়ার মতো তথ্যপ্রমাণ লুকিয়ে রেখেছিল বলে মনে করা হয়। ওই প্রকল্পের মাধ্যমে তখনকার কৃষ্ণাঙ্গ অধিকারকর্মী ও নেতাদের দমন করার চেষ্টা হচ্ছিল। এর জন্য নজরদারি, সংগঠনের মধ্যে গোয়েন্দাদের চর ঢুকিয়ে দেওয়া এবং আন্দোলনকারীদের মধ্যে বিবাদ বাঁধিয়ে দেওয়ার মতো বেআইনি কাজ ওই সময় এফবিআই নিয়মিত করে গেছে।

মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য ও শিকাগোর সাবেক ব্ল্যাক প্যান্থার নেতা হিসেবে পরিচিত ববি রাশ অন্যায্য বিচারের জন্য এফবিআইয়ের দিকে অভিযোগের আঙুল তুলেছেন। গত ১৮ নভেম্বর এক বিবৃতিতে তিনি বলেছেন, ‘জে এডগার হুভারের (তৎকালীন এফবিআই প্রধান) এফবিআইয়ের বিশ্বাসঘাতকতা ও শয়তানির কারণে দুটি মানুষকে দশকের পর দশক জেলে পচতে হয়েছে জেনে আমি নিদারুণভাবে মর্মাহত হলাম। ম্যালকম এক্স কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকানদের একজন উজ্জ্বলতম নেতা ছিলেন। তিনি ছিলেন মানবিক মানুষ। জে এডগার হুভারের মতো একজন নিম্নশ্রেণির মানুষ ম্যালকম এক্সকে থামাতে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছিলেন বলে আমার বিশ্বাস। এ অবস্থায় এই মামলার বিষয়ে এফবিআইয়ের কে কী জানতেন তার বিশদ বিবরণ আমাদের জানা দরকার।’

ম্যালকম এক্সকে হত্যায় যদি এফবিআইয়ের হাত থেকে থাকে তাহলে এটিই এই সংস্থার এ ধরনের প্রথম কাজ হবে না। ১৯৫৯ সালের ৪ ডিসেম্বর ব্ল্যাক প্যান্থার পার্টির দুই নেতা ফ্রেড হ্যাম্পটন এবং মার্ক ক্লার্ককে তারাই হত্যা করেছিল। শুধু তাই নয়, এফবিআই স্বীকারোক্তি দিয়েছিল ১৯৭২ সালে ব্ল্যাক প্যান্থার নেতা জেরোনিমো প্র্যাটকে খুনের মামলায় যখন দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল, তখন তাঁকে নির্দোষ প্রমাণ করার মতো তথ্যপ্রমাণ তাদের হাতে ছিল। কিন্তু তারপরও তারা তা আদালতে পেশ করেনি। হত্যার ঘটনার সময় জেরোনিমো ঘটনাস্থল থেকে যে ৬৪০ কিলোমিটার দূরে ছিলেন সে তথ্য এফবিআইয়ের হাতে থাকার পরও তারা তা হাজির করেনি।

ম্যালকম এক্স হত্যা মামলা থেকে দুই আসামিকে খালাস দেওয়ার তথ্যপ্রমাণ ‘আবিষ্কারের’ পর বোঝা যাচ্ছে, কুখ্যাত ‘কোইন্টেলপ্রো’ প্রকল্পের অধীনে একই ধরনের যত ঘটনা ঘটেছে এবং যত তথ্যপ্রমাণ আছে, তা নিয়ে এফবিআই পর্যালোচনা করবে। এই ধরনের আর কোনো সত্য ফাঁস হতে পারে কি না, তা নিয়ে তারা বিশ্লেষণ করবে।

যুক্তরাষ্ট্রের ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে’ এফবিআইয়ের ভূমিকা আমাদের যতখানি অস্বস্তি ও নিরাপত্তাহীনতার বোধে আক্রান্ত করেছিল, ম্যালকম এক্স হত্যা মামলার স্বচ্ছতার ঘাটতি তার চেয়েও বেশি আস্থাহীনতা তৈরি করছে। ৯/১১ হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রে সম্ভাব্য যেকোনো ধরনের হামলা ঠেকানোর দায়িত্বে ছিল এফবিআই। ওই সময় জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যুতে ব্যাপক মাত্রার ক্ষমতাপ্রাপ্ত হয়ে এফবিআই যুক্তরাষ্ট্রের মুসলমান এবং অন্য মেরুকৃত সম্প্রদায়ের মানুষের ওপর কঠোর নজরদারি করে এবং তাঁদের ব্যক্তিগত নিভৃতির অধিকার দারুণভাবে ক্ষুণ্ন করে। কিন্তু পরে আমরা জানতে পারলাম, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে তারা কোনো সংগঠিত সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সন্ধান পায়নি। তারা দুই দশক ধরে নজরদারির নামে বহু মানুষকে হয়রানি করল এবং একটি সন্ত্রাসী পরিকল্পনা বা ছকও উদ্‌ঘাটন করতে পারল না।

এরপরও শত শত মুসলমানকে ঠুনকো অভিযোগে আটক করে দিনের পর দিন জেলে ঢুকিয়ে রাখা হয়েছে। বক্তব্য দেওয়া কিংবা ত্রাণ বিতরণ করার জন্যও তারা মুসলমানদের ধরে আটক করেছে। নিজের সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে চরবৃত্তি করতে বাধ্য করতে বহু নিরপরাধ মুসলমানকে উড্ডয়ন নিষিদ্ধ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে। একটি প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে গত দুই দশকে এফবিআই ২২ হাজারের বেশি অপরাধমূলক কাজ করেছে, যার জন্য করদাতা নাগরিকদের পকেট থেকে বছরে গড়ে ৪ কোটি ২০ লাখ ডলার খরচ করতে হয়েছে।

এ অবস্থায় এফবিআইকে এখনই জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।

আল–জাজিরা থেকে নেওয়া, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

  • স্টিভ ডাউনস যুক্তরাষ্ট্রের কোয়ালিশন ফর সিভিল ফ্রিডমস-এর বোর্ড চেয়ারম্যান

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন