default-image

গত ২৫ এপ্রিল বাংলাদেশের ব্যবসায়ী-শিল্পপতিদের শীর্ষ সংগঠন ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) নেতারা এফবিসিসিআইয়ের মালিকানায় ব্যাংক, বিমা, বিশ্ববিদ্যালয় এবং মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে পত্রপত্রিকায় খবর প্রকাশিত হওয়ার পর সেটা নিয়ে রাজনীতির অঙ্গনে ও বিশেষজ্ঞ মহলে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় উঠেছে।

বিদায়ী সভাপতির মেয়াদ কিছুদিনের মধ্যেই সম্পন্ন হতে চলেছে, অতএব তাঁর আমলে নেওয়া সিদ্ধান্তে ব্যাংক, বিমা, বিশ্ববিদ্যালয় এবং মেডিকেল কলেজ পাইয়ে দিলে ভবিষ্যতে ‘কীর্তি’ হিসেবে ওসব অবদান উল্লেখযোগ্য হবে! কিন্তু এফবিসিসিআইয়ের মালিকানায় ব্যাংক প্রতিষ্ঠার ব্যাপারটা যেহেতু খোদ এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতিসহ ব্যবসায়ী-শিল্পপতি মহলের অনেকের কাছেই অভূতপূর্ব ও অপ্রয়োজনীয় আবদার মনে হচ্ছে, তাই এই দাবিটা নিয়ে কিছু আলোচনা-বিশ্লেষণ প্রয়োজন। গত ২৬ এপ্রিল ২০২১ তারিখে প্রথম আলোয় এ সম্পর্কে আমার মন্তব্য প্রকাশিত হয়েছে, যেখানে আমি এই ব্যাংক প্রতিষ্ঠার লাইসেন্স অচিরেই এফবিসিসিআই কর্তৃপক্ষকে প্রদান করা হবে বলে ভবিষ্যদ্বাণী করেছি। আজ আমার এই অবস্থান ব্যাখ্যা করছি।

এটাকে আমি ‘অদ্ভুত আবদার’ অভিহিত করছি এ জন্য যে বাংলাদেশের ব্যাংকমালিকদের সবাই তো এফবিসিসিআইয়ের সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত কোনো না কোনো ব্যবসায়ী-শিল্পপতি গোষ্ঠীর বা সমিতির নেতা-নেত্রী কিংবা প্রভাবশালী সদস্য। তাঁদের মধ্যে অনেক পরিবারের হাতে এখন ব্যাংকগুলোর মালিকানা কেন্দ্রীভূত হয়েছে। এমনও দেখা যাচ্ছে, প্রাথমিকভাবে যাঁরা ব্যাংকগুলোর উদ্যোক্তা-শেয়ারহোল্ডার ছিলেন, তাঁরা তাঁদের শেয়ার উচ্চমূল্যে বিক্রি করে এক ব্যাংক থেকে সটকে পড়ে অন্য ব্যাংকে ঘাঁটি গেড়েছেন। কিংবা বিক্রয়লব্ধ অর্থ বিদেশে পাচার করে সপরিবার বিদেশে চলে গেছেন। রাজনীতিবিদ ও তাঁদের আত্মীয়স্বজনের মধ্যে এমন কারবারের মাধ্যমে মুফতে কোটি কোটি টাকা বানিয়ে বিদেশে পাড়ি দেওয়াটা এ দেশের ‘ক্রোনি-ক্যাপিটালিস্ট পলিটিক্যাল কালচার’ হিসেবে সুপরিচিত। এ দেশের প্রভাবশালী ব্যবসায়ী-শিল্পপতি গ্রুপগুলোর সিংহভাগ যেহেতু পরিবারকেন্দ্রিক মালিকানা ও পরিচালনার অধীনে ন্যস্ত রয়েছে, তাই ক্রমেই অধিকাংশ ব্যাংকের মূল মালিকানা ও পরিচালনা পর্ষদগুলো একক পারিবারিক নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে। (ন্যাশনাল ব্যাংকের মালিকানা ও পরিচালনা নিয়ে ভাইবোনদের সাম্প্রতিক কোন্দল পরিবারের সদস্যদের মধ্যেই ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কাড়াকাড়ির অনেক ঘটনা সামনে নিয়ে এসেছে)।

বিজ্ঞাপন

শেয়ারবাজারে পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি হিসেবে ব্যাংকগুলোর শেয়ার বেচাকেনা চালু থাকলেও সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের হাতে ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ চলে যাওয়ার সম্ভাবনা এ দেশে নেই। দেশের কয়েকজন রাঘববোয়াল ব্যবসায়ী বিভিন্ন পন্থায় নানা নামে একাধিক ব্যাংকের বিপুল শেয়ার কিনে নিচ্ছেন। চট্টগ্রামের একজন ব্যবসায়ী নাকি এখন সাতটি ব্যাংকের মালিকানা প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছেন। ব্যাংকের মালিকানায় একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার আইনসম্মত সুযোগ অন্য কোনো দেশে চালু আছে কি না, তা আমার জানা নেই। কিছু ব্যাংক আবার সশস্ত্র বাহিনী, বিজিবি, পুলিশ, আনসার, ভিডিপির মতো সরকারি বাহিনীগুলোর মালিকানায় কিংবা এনজিওর মালিকানায়ও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

সে জন্য কেউ কেউ বলছেন, এফবিসিসিআই ব্যাংক চাইলে দোষ কোথায়, এ ক্ষেত্রে তো আইনি বাধা নেই। আমার কাছে ব্যাপারটা ‘অদ্ভুত’ লাগছে এ জন্য যে ব্যাংকমালিকেরাই তো এ দেশের ব্যবসায়ী-শিল্পপতিদের মধ্যমণি। এতত্সত্ত্বেও আলাদা করে এফবিসিসিআইকে কেন ব্যাংকিং ব্যবসায়ে নামতে হবে? কারা এ ব্যাংকের ফায়দা নেবে? নতুন এ ব্যাংকে আরও কিছু বাদ পড়া ব্যবসায়ীকে ঢোকানোর মাধ্যমে এফবিসিসিআইয়ের নেতাদের মুনাফা আহরণের আরেকটি পন্থা দেখছি না তো আমরা?

১৯৯৮ সাল থেকে তিন বছর বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) মহাপরিচালক থাকার সময় থেকেই বাংলাদেশের ব্যাংকিং বিষয়ে আমার গবেষণা অব্যাহত রয়েছে। বাংলাদেশে বর্তমানে ৬১টি ব্যাংক চালু রয়েছে এবং আরও কয়েকটি লাইসেন্স পাওয়ার পর চালু হওয়ার প্রক্রিয়াধীন। এত ব্যাংক প্রতিষ্ঠা অর্থনীতির প্রয়োজনে করা হয়নি, স্রেফ রাজনীতি ও স্বজনপ্রীতির কারণে দেওয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগের অন্ধভক্ত নেতা-কর্মী ও সমর্থক ব্যতিরেকে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ স্বীকার করবেন যে দেশে এখন প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্তসংখ্যক ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে এবং যেসব বিবেচনায় ২০০৯ সালে মহাজোট ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকে ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে, তাতে অর্থনীতির স্বার্থ কিংবা জনগণের আর্থিক লেনদেনের যুক্তিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। সারা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ব্যাংকের সেবা পৌঁছে দেওয়ার জন্য নতুন ব্যাংক প্রতিষ্ঠার চেয়ে বিদ্যমান ব্যাংকগুলোর শাখা বিস্তারকে উৎসাহিত করা হলে অনেক কম ব্যয়ে ওই সুবিধা অর্জন করা যেত।

আসলে প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত জেনেও নতুন নতুন ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে স্রেফ ‘ক্রোনি ক্যাপিটালিস্ট রাজনীতি’ ও স্বজনপ্রীতির তাগিদে। বাংলাদেশ ব্যাংকের আপত্তিকে বারবার অগ্রাহ্য করা হয়েছে, অসহায় দর্শকের ভূমিকা পালন অব্যাহত রেখেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ব্যাংকের মালিকানার লাইসেন্স যে ভাগ্যবানদের জন্য কোটিপতি হওয়ার সহজ পথ করে দিয়েছে, তাঁদের মধ্যে বেশ কয়েকজন রাজনৈতিক নেতৃত্বের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়স্বজন রয়েছেন

আসলে প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত জেনেও নতুন নতুন ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে স্রেফ ‘ক্রোনি ক্যাপিটালিস্ট রাজনীতি’ ও স্বজনপ্রীতির তাগিদে। বাংলাদেশ ব্যাংকের আপত্তিকে বারবার অগ্রাহ্য করা হয়েছে, অসহায় দর্শকের ভূমিকা পালন অব্যাহত রেখেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ব্যাংকের মালিকানার লাইসেন্স যে ভাগ্যবানদের জন্য কোটিপতি হওয়ার সহজ পথ করে দিয়েছে, তাঁদের মধ্যে বেশ কয়েকজন রাজনৈতিক নেতৃত্বের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়স্বজন রয়েছেন। অনেকেই হয়তো খেয়াল করেন না যে এ দেশের ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ সংকট যত গুরুতরই হোক, দেশের প্রায় প্রতিটি বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ মুনাফা করে যাচ্ছে।

অতএব ব্যাংকের লাইসেন্স যাঁরা বাগাতে পেরেছেন, তাঁরা সহজেই কোটি কোটি টাকার মালিক হয়ে যান ওই মুনাফার ভাগ পাওয়ার কারণে। সে জন্যই ‘ক্রোনি ক্যাপিটালিজমের’ ক্লাসিক নজির হলো ব্যাংকের মালিকানা বণ্টনের এই রাজনৈতিক দুর্নীতি। আর এই ব্যাংক-উদ্যোক্তাদের অনেকেই তাঁদের রাজনৈতিক সংযোগের জোরে বা আত্মীয়তার পরিচয়ে ব্যাংক প্রতিষ্ঠার লাইসেন্স পেয়ে বিনা মূলধনে অন্যান্য ব্যবসায়ীর অর্থে তাঁদের ব্যাংকের উদ্যোক্তা-পরিচালক বনে গেছেন। মানে, তাঁদের শেয়ারের জন্য বিনিয়োগ করা পুঁজিও হয়তো ব্যাংকের অন্য পরিচালকেরা পরিশোধ করে দিয়েছেন। এই পরিচালকদের সিংহভাগ আবার দেশের বড় বড় ব্যবসায়ী-শিল্পপতি, যাঁরা ব্যাংকের মালিকানা পেয়ে এ দেশের ব্যাংকঋণের ওপর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণাধিকার অর্জন করে ফেলেছেন। ব্যাংক কোম্পানি আইনে নিজেদের ব্যাংক থেকে ঋণ পাওয়ার ব্যাপারে তাঁদের ওপর নানা বিধিনিষেধ আরোপ করা হলেও একে অপরের ব্যাংক থেকে দেদার ঋণ গ্রহণের সংস্কৃতি (লোন সোয়াপ) এ দেশে ভয়াবহ পর্যায়ে উন্নীত হয়ে গেছে।

বিজ্ঞাপন

এটা সর্বজনবিদিত যে বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের সবচেয়ে মারাত্মক সংকট ঋণখেলাপি সমস্যা। আইএমএফ ২০১৯ সালের জুনের শেষে বাংলাদেশের খেলাপি ঋণ ২ লাখ ৪০ হাজার ১৬৭ কোটি টাকা অতিক্রম করেছে বলে জানিয়েছিল, যার মধ্যে ওই সময় বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক উল্লিখিত ১ লাখ ১২ হাজার ৪২৫ কোটি টাকা শ্রেণীকৃত ঋণের সঙ্গে আদালতের নিষেধাজ্ঞার কারণে ঝুলে থাকা ৭৯ হাজার ২৪২ কোটি টাকা, স্পেশাল মেনশান অ্যাকাউন্টের ২৭ হাজার ১৯২ কোটি টাকা এবং নিয়মবহির্ভূতভাবে পুনঃ তফসিল বা রিশিডিউলিং করা ২১ হাজার ৩০৮ কোটি টাকা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। এই অঙ্কের সঙ্গে ২০১৯ সালের জুন পর্যন্ত অবলোপন বা রাইট-অফ করা মন্দ ঋণ ৫৪ হাজার ৪৬৩ কোটি টাকা যোগ করে ২০১৯ সালের জুনেই মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৩ লাখ কোটি টাকার কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল।

২০২০ সালের মার্চে করোনাভাইরাস মহামারি আঘাত করার পর গত ১৪ মাস আর কোনো ঋণগ্রহীতার ঋণকে খেলাপি ঘোষণা করা হচ্ছে না, বাংলাদেশ ব্যাংকও আর কোনো খেলাপি ঋণের হিসাব প্রকাশ করছে না। খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে এখন পাঁচ লাখ কোটি টাকা অতিক্রম করলেও আমি অবাক হব না। ব্যাংক খাতের এই মহাসংকটকে আড়াল করে চলেছে ব্যাংকগুলোতে উপচে পড়া আমানতের ঢল। প্রবাসী বাংলাদেশিদের প্রেরিত রেমিট্যান্সের ঢল যদ্দিন অব্যাহত থাকবে, তদ্দিন ব্যাংকগুলোতে আমানতের জোয়ারও অব্যাহত থাকবে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মহামারির কারণে বিনিয়োগে ভাটার টান। ফলে ব্যাংকিং খাতে উদ্বৃত্ত তারল্য এখন দেড় লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। এ অবস্থায় এফবিসিসিআই আরেকটি ব্যাংক পেয়ে গেলে অবাক হব না।

ড. মইনুল ইসলাম অর্থনীতিবিদ ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন