default-image

চীনের এক আদালত বিবাহবিচ্ছেদের এক মামলায় আদেশ দিয়েছেন, বিগত পাঁচ বছরে সংসার করতে গিয়ে এক স্ত্রী যে শ্রম দিয়েছেন, তার মজুরি বাবদ স্বামীকে মোট ৭ হাজার ৭০০ ডলারের সমপরিমাণ অর্থ দিতে হবে। এটা খোরপোষ নয়, স্বামীর সম্পত্তির অংশও নয়। প্রতিদিন রান্নাবান্না থেকে সন্তান পালন পর্যন্ত সমস্ত শ্রমের আংশিক মূল্য। আদালতের মতে, গার্হস্থ্য শ্রমকে গুরুত্বহীন নয়, সে শ্রমের আর্থিক মূল্য এই দম্পতির অর্জিত সম্পত্তির অন্তর্গত। এখন ভাগাভাগির সময় তা হিসাবে আনতে হবে।

বিচারকের রায় শুনে চীনা স্বামী বেচারার চোখ ছানাবড়া। ঘরের কাজ করার জন্য মেয়েদের আলাদা মজুরি দিতে হবে—এমন কথা আমার বাপের জন্মে কেউ শোনেনি। আদালতের সাফ জবাব, এর আগে না শুনলে এখন থেকে শুনতে হবে।

বিজ্ঞাপন

চীনের ভেতরে ও বাইরে অনেকে বিষয়টিকে বিলম্বে হলেও ঠিক কাজ বলে সাধুবাদ দিয়েছেন। কোনো কোনো নারী বলেছেন, পাঁচ বছরে মোটে ৭ হাজার ৭০০ ডলার! এমন মজুরির কথা জানা থাকলে কোনো মেয়ে বিয়ে করতেই রাজি হবেন না।

এ কথা ঠিক, হাজার বছর ধরে আমরা সব ধরনের গার্হস্থ্য শ্রমকে অর্থের অঙ্কে হিসাব না করতে অভ্যস্ত। মাকে দেখেছি, বোনদের দেখেছি, বিয়ের পর নিজের বউকে দেখছি। শুধু ঘরের কাজ নয়, ফসলের মাঠে নারীদের কাজও আমাদের হিসাবে থাকে না। ভারতে বা বাংলাদেশে গ্রামীণ নারীদের দুই-তৃতীয়াংশ কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত, কিন্তু তাঁদের কাউকে আমরা কৃষক বা কৃষিশ্রমিক ভাবি না। কোনো কোনো দেশে সুপেয় পানি সংগ্রহ করতে মেয়েদের প্রতিদিন পাঁচ থেকে সাত ঘণ্টার বেশি সময় ব্যয় করতে হয়, কয়েক মাইল হেঁটে পানি নিয়ে ফিরতে হয়। এই শ্রমকেও হিসাবের বাইরে রাখা হয়। শহুরে যেসব নারী অফিস-আদালতে কাজ করেন অথবা যাঁরা অন্যের বাড়িতে কায়িক শ্রম করে সংসার খরচে জোগান দেন, তাঁদেরও ঘরে ফিরে সেই হেঁশেল ঠেলতে হয়। বিত্তবান পরিবারে কাজের লোক রাখার নিয়ম রয়েছে, তাঁদের শ্রমকে অর্থ দিয়ে মাপতে আপত্তি নেই। কিন্তু বউয়ের বেলায় সব ‘ফ্রি’।

আমরা পুরুষেরা সমাজে নারী ও পুরুষের জন্য আলাদা ভূমিকা নির্ধারণ করে দিয়েছি, সে হিসেবে মেয়েরা উদয়াস্ত পরিশ্রম করবেন, কিন্তু সে শ্রমের কোনো মূল্য ধরার প্রয়োজন দেখিনি। পণ্ডিতেরা বলবেন, এর সঙ্গে জড়িত ক্ষমতা প্রশ্ন। পৃথিবীর সব দেশেই পুরুষ নিজেদের কর্তৃত্ব বজায় রাখতে মেয়েদের অসম রাখতে চায়। সামাজিক ও অর্থনৈতিক মূল্য যত খাটো হবে, তাঁদের অবনত রাখা তত সহজ হবে। অন্য আরেক বিপদও রয়েছে। নারীদের শ্রমের সঠিক মজুরি দিতে গেলে পুরুষদের পকেটে ইঁদুর দৌড়াবে। মার্কিন অর্থনীতিবিদেরা হিসাব করে বলেছেন, নারীদের প্রতিদিনের গার্হস্থ্য শ্রমের ন্যূনতম মজুরি ধরে যদি শোধ করা হয়, তাহলে বছরে তাঁদের দেড় ট্রিলিয়ন ডলার দিতে হবে। এই অর্থনীতিবিদেরা সহজ করে বলছেন, এই অর্থ আমেরিকার ৫০টি বৃহৎ কোম্পানির মোট মূল্যমানের সমান। জাতিসংঘের হিসাবে, মেয়েদের গার্হস্থ্য শ্রমকে যদি অর্থের হিসাবে বিচার করা হতো, তাহলে তা যেকোনো দেশের মোট জাতীয় আয়ের ৩৯ শতাংশ বা তার চেয়েও বেশি।

বাংলাদেশে মেয়েদের শ্রমের বোঝা পশ্চিমের তুলনায় বেশি বৈ কম নয়। কয়েক বছর আগে ডব্লিউবিবি ট্রাস্ট ও হেলথ ব্রিজ নামের দুটি সংস্থা মেয়েদের অর্থনৈতিক অবদানের ওপর এক সরেজমিন তদন্ত শেষে প্রস্তুত প্রতিবেদনে জানিয়েছিল, বাংলাদেশে অধিকাংশ নারী দৈনিক গড়পড়তা ১৬ ঘণ্টা কাজ করেন, ফলে অধিকাংশেরই বিশ্রামের জন্য কোনো সময় থাকে না। যেসব নারীর পক্ষে গৃহস্থালির কাজের জন্য শ্রমিক, অর্থাৎ ঝি রাখার সামর্থ্য আছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাঁদেরও রান্নার কাজ করতে হয়। যাঁরা অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন, তেমন মায়েদের শিশুদের শিক্ষার দায়িত্ব নিতে হয়। এসব কাজের জন্য তাঁরা ফুটো কড়িও পান না। এই সমীক্ষায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশের জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি নারীকে তাঁদের অনার্জিত শ্রম বাবদ যদি মজুরি দেওয়া হতো, তাহলে বছরে তার মোট মূল্যমান প্রায় আড়াই শ বিলিয়ন ডলার হবে, যা ২০১২ সালের হিসাবে দেশের মোট জাতীয় উৎপাদনের প্রায় দ্বিগুণ।

নারীরা যেকোনো মজুরি ছাড়াই কী পরিমাণ কায়িক শ্রম করেন, অনেক সময় তা আমাদের নজরে পড়ে না। বেশ কয়েক বছর আগে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) বাংলাদেশে নারীদের গার্হস্থ্য শ্রম নিয়ে একটি প্রতিবেদন ছেপেছিল। তাতে এক ডাক্তারের সঙ্গে এক কৃষকের কথোপকথন তুলে ধরা হয়, তাতে পরিষ্কার বোঝা যায়, কৃষক তাঁর স্ত্রীর গৃহস্থালির কাজকর্মকে কোনো কাজই মনে করেন না।

বিজ্ঞাপন

আমি আমেরিকায় থাকি, এখানেও পরিস্থিতি খুব ভিন্ন নয় (অবশ্য ব্যতিক্রম যে নেই তা নয়)। ভাবুন তো, নারীরা যদি হঠাৎ একদিন ঠিক করেন তাঁরা রান্নাবান্না, ঘরের কাজ করবেন না, তাহলে অবস্থাটা কেমন হবে? পূরবী বসু ‘অরন্ধন’ নামের এক গল্পে তেমন একটি কাল্পনিক চিত্র এঁকেছেন। কিন্তু কাল্পনিক নয়, ১৯৭৫ সালের ২৪ অক্টোবর আইসল্যান্ডের নারীরা একদিন সত্যি সত্যি একজোট হয়ে ঠিক করেছিলেন তাঁরা রান্নাবান্না, ধোয়ামোছা ইত্যাদি করবেন না, এমনকি বাচ্চাদের দেখভালেও অংশ নেবেন না। ‘অতি দীর্ঘ এক শুক্রবার’ নামে পরিচিত সেই ধর্মঘটের একটা সুফল হয়েছিল এই যে সরকার আইন করে একই রকম কাজের জন্য মেয়েদের সমান মজুরি নির্ধারণ করেছিল।

চীনা আদালতের এই সিদ্ধান্তের ফলে পৃথিবীর দেশে দেশে গার্হস্থ্য শ্রমের জন্য মজুরি প্রদানের হিড়িক পড়ে যাবে, তা মনে হয় না। বস্তুত পৃথিবীর কোনো দেশেই আইন করে গার্হস্থ্য মজুরির নিয়ম চালু নেই, নিকট ভবিষ্যতে হবে, তা–ও মনে হয় না। ভারতে শুনেছি বিখ্যাত অভিনেতা কমল হাসান, যিনি এখন রাজনীতিতেও নাম লিখিয়েছেন, তিনি মেয়েদের গার্হস্থ্য শ্রমের জন্য মজুরি দেওয়ার প্রস্তাব করেছেন। শুধু পুরুষেরা নন, মেয়েরাও তাঁর প্রস্তাবের প্রতিবাদ করেছেন। চীনা আদালতের খবরটা ছাপা হওয়ার পর এই আমেরিকাতেও দেখেছি অনেকে তীব্র আপত্তি জানিয়েছেন। এক নারী লিখেছেন, বিয়ে তো শুধু লেনদেনের ব্যাপার নয়, এর কেন্দ্রে রয়েছে ভালোবাসা। ‘শিশু পালন অথবা গৃহকর্ম আমরা স্বেচ্ছায় ও সানন্দে করি, এটি ঈশ্বর–নির্ধারিত কর্ম।’

তাঁর এ কথা ঠিক কি ভুল, সে তর্কে যাব না। গার্হস্থ্য মজুরি নিয়ে আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে নারীদের শ্রমের প্রতি সম্মান, তাঁদের অর্থনৈতিক অবদানকে আরও দৃশ্যমান করা। চীনা বিচারককে ধন্যবাদ, ঠিক সেই কাজই তিনি করেছেন।

হাসান ফেরদৌস: প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন