default-image

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ছবি দেখে চোখ আটকে গেল। ক্লাসে এক শিশু কোলে শিক্ষার্থীদের পড়াচ্ছেন এক অধ্যাপক। কৌতূহল জাগল। ইন্টারনেট ঘেঁটে জানা গেল, কোলের শিশুটি অধ্যাপকের ছাত্রীর। ছাত্রীটি টেক্সাস এঅ্যান্ডএম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী অ্যাশটন রবিনসন শিশুটির মা। শিশুসন্তান লালনে এমনিতেই কী যে ঝক্কি, এর মধ্যে আবার পড়াশোনার চাপ! দমে দমে প্রাণ আইঢাই!

সন্তানকে কারও কাছে রেখে যে ক্লাসে যাবেন, সে জো নেই। তাই ক্লাসে আসতে পারছেন না—জানিয়ে অধ্যাপক হেনরি মুসোমাকে ই-মেইল করেছিলেন অ্যাশটন। ফিরতি মেইলে তাঁকে অবাক করে দিয়ে অধ্যাপক লিখেছেন, ‘ছেলেকে নিয়েই ক্লাসে এসো।’ অধ্যাপকের কথা শুনে ছেলে ইমেতকে নিয়ে ক্লাসে যান তিনি। অধ্যাপক শিশুটিকে কোলে তুলে নেন। আর পুরো সময়টা তাকে কোলে রেখে শিক্ষার্থীদের পড়ান তিনি।

টেলিগ্রাফের খবর বলছে, অধ্যাপকের এমন উদারতায় মুগ্ধ শিক্ষার্থী মা অ্যাশটন। তিনি অধ্যাপকের কোলে সন্তানের ছবি ও ভিডিও ধারণ করে ফেসবুকে পোস্ট করেন। ৭ সেপ্টেম্বরের ওই পোস্টে এ পর্যন্ত প্রায় ৫০ হাজার মানুষ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। ব্যতিক্রমী এ বিষয়টি শেয়ার করেছেন প্রায় ১৫ হাজার ফেসবুক ব্যবহারকারী।

পোস্টে অধ্যাপককে নিয়ে অ্যাশটন লিখেছেন, ‘একা সন্তান মানুষ করা খুবই চ্যালেঞ্জের। কিন্তু অধ্যাপক হেনরি মুসোমার মতো মানুষ সেটাকে অনায়াসে সহজ করে দিতে পারেন। তিনি যা করলেন, আমি কোনো দিন ভুলব না। আমি আমার সন্তান ইমেতকে এটা জানাতে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি। ও বড় হলে আমি ওকে বলব, অধ্যাপক মুসোমার মতো মানুষের কারণে তোমার মা পৃথিবীর সেরা একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাঁর পড়াশোনা শেষ করতে পেরেছিল।’

অ্যাশটনের মতো যাঁরা কাজ ও সন্তানের দেখভালের দায়িত্ব একসঙ্গে পালন করেন, তাঁরা জানেন জীবন কত জটিল। লায়লা নীলার (ছদ্মনাম) কথাই ধরা যাক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে স্বামী-স্ত্রী দুজনই কর্মজীবনে প্রবেশ করেন। ভালো প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছিলেন নীলা। প্রথম সন্তানের জন্মের সময় চার মাসের মাতৃত্বকালীন ছুটি পান তিনি। ছুটি শেষ হয়। কিন্তু সন্তানকে রেখে কাজে যাবেন, এমন কাউকে পাননি তিনি। ছুটির মেয়াদ বাড়ানোর জন্য চেষ্টা করেছিলেন। তবে লাভ হয়নি। সন্তানের কথা চিন্তা করে চাকরিটা ছেড়ে দেন তিনি।

৬০ পার করেছেন আমেনা বেগম। বিয়ের পরপরই ভালো একটা চাকরি পান তিনি। মনের আনন্দে চাকরিটা করছিলেন। প্রথম সন্তানের জন্ম হলো। কার কাছে মেয়েকে রেখে চাকরিটা চালিয়ে যাবেন—সেই চিন্তায় অস্থির হলেন। চাকরি ছেড়ে দেওয়া ছাড়া আর কোনো সমাধান পেলেন না। চাকরিটা ছেড়ে দিলেন। এরপর কোলে এল আরেক মেয়ে। নিজের জীবনের আক্ষেপটা ঘোচাতে মন দিয়ে দুই মেয়েকে বড় করলেন। দুই মেয়েই ভালোভাবে পড়াশোনা শেষ করলেন। মা আশায় বুক বাঁধেন, মেয়েরা ভালো চাকরি করবে। তিনি যা করতে পারেননি, মেয়েরা পারবেন। এই দিনের জন্যই তো এতটা কষ্ট করেছেন তিনি! কিন্তু সেটা হয়নি। মেয়েদের বিয়ে হয়েছে, সন্তান হয়েছে। বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে সন্তানদের জন্য মায়ের মতো চাকরি ছাড়তে হয়েছে মেয়েদেরও।

বাংলাদেশে কতসংখ্যক কর্মজীবী নারী সন্তানের জন্মের পর পরিস্থিতির চাপে পড়ে চাকরি ছাড়েন, এর কোনো সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান নেই। তবে সংখ্যাটা কম নয় বলে জানালেন বেসরকারি সংস্থা কর্মজীবী নারীর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও সাংসদ শিরিন আখতার। তিনি বলেন, ‘আমাদের আশপাশের পরিবার ও প্রতিষ্ঠানগুলোতে একটু খোঁজ নিলেই এমন মায়ের দেখা মিলবে।’

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটেও যে এমন পরিসংখ্যান খুব বেশি আছে, তা নয়। বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৫ সালে ভারতের দিল্লি ও আশপাশের এক হাজার কর্মজীবী নারীর ওপর জরিপ চালানো হয়। এতে দেখা যায়, মাত্র ৩৪ শতাংশ বিবাহিত নারী সন্তানের জন্মের পর চাকরি চালিয়ে যেতে পেরেছেন। ২০১৪ সালে পিউ রিসার্চের এক জরিপে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষিত মায়েদের ১০ শতাংশ সন্তানের জন্য কাজ বাদ দিয়ে বাড়িতে থাকেন। ২০১৩ সালের একটি জরিপের উল্লেখ করে আটলান্টিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যোগ্য নারীদের ৪৩ শতাংশ সন্তানের কারণে চাকরি ছাড়েন।

চারপাশে যখন কর্মজীবী নারীদের এমন অবস্থা, তখন অধ্যাপক হেনরি মুসোমার মতো মানুষদের উদ্যোগ আশা জাগায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ফাতেমা রেজিনা পারভিন বলছিলেন, যৌথ পরিবার কর্মজীবী নারীদের এমন অবস্থা থেকে মুক্তি দিতে পারত। কিন্তু একক পরিবারই এখনকার প্রেক্ষাপটে বাস্তবতা। ডে-কেয়ারও পর্যাপ্ত নেই। সে ক্ষেত্রে মায়েরা কর্মক্ষেত্রে সন্তানকে নিয়ে যেতে পারেন। সহকর্মীরা যদি এগিয়ে আসেন, একটু সময় দিয়ে সহযোগিতা করেন, অ্যাশটন রবিনসনের মতো অনেক কর্মজীবী মায়ের জীবন সহজ হয়ে যাবে। সন্তান পালনের জন্য হয়তো চাকরিটা ছাড়তে হবে না!

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0