default-image

ঊনবিংশ শতকে ইউরোপে ‘জুইশ কোয়েশ্চেন’ বলে একটি টার্ম প্রচলিত ছিল। এই শব্দবন্ধের মাধ্যমে ইহুদিদের সমস্যা সৃষ্টিকারী জাতি হিসেবে নির্দেশ করা হতো এবং তাদের উপস্থিতি ইউরোপীয় সমাজের জন্য হুমকির কারণ কি না, সেই বিতর্ক তোলা হতো। ঠিক একই কায়দায় সেই ইউরোপে এখন ‘মুসলিম কোয়েশ্চেন’ টার্মটি দ্রুতগতিতে ছড়ানো হচ্ছে। পশ্চিমা বিশ্বে ইসলাম ধর্ম ও মুসলিম সম্প্রদায়কে এমন কায়দায় নেতিবাচকভাবে তুলে ধরা হচ্ছে যে সেখানে ধর্মীয় সহিষ্ণুতা, বহুত্ববাদ ও গণতন্ত্রের সীমা সংকুচিত হয়ে আসছে।

ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ সচেতনভাবে (তাঁর ভাষায়) ‘ইউরোপের আত্মাকে বাঁচাতে’ কথিত সেক্যুলার ক্রুসেডে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। কিন্তু তাঁর এ–সংক্রান্ত কাজকারবার উগ্রপন্থীদের আরও উসকে দিচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়ার অধ্যাপক অ্যানি নোরটন তাঁর অন দ্য মুসলিম কোয়েশ্চেন বইয়ে বলেছেন, উনিশ শতকে ইউরোপের সমাজে কতটা আলোকিত মূল্যবোধ, সহিষ্ণুতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সহাবস্থান প্রবণতার উপস্থিতি ছিল, তা মাপার প্রধান মাপকাঠি ছিল ‘জুইশ কোয়েশ্চেন’। সেখানকার সমাজে শতাব্দীর পর শতাব্দী ইহুদিদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করা হয়েছে। সেখানে আজ ইহুদি বঞ্চনার অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি হয়েছে এবং সেই দিক বিচার করলে বলা যায়, ইউরোপ যথার্থ সভ্য হয়ে উঠেছে। কিন্তু ইসলাম ও মুসলিম ইস্যুতে তাদের বিষয়ে একই কথা বলা যাচ্ছে না। যে পশ্চিমা দেশগুলো আজ নিজেদের গণতান্ত্রিক ও বহুত্ববাদী মূল্যবোধের ধারক বলে দাবি করে থাকে, সেই দেশগুলোতে আসলেই সে মূল্যবোধ যথাযথভাবে আছে কি না, তা পরীক্ষার লিটমাস টেস্ট হিসেবে ইসলাম ও মুসলিম সম্প্রদায়ের বিষয় সামনে আনা যেতে পারে।

গত কয়েক মাসে ইউরোপে আমরা কয়েকটি সহিংস ঘটনা ঘটতে দেখলাম। এসব ঘটনার সঙ্গে আমরা আধুনিক ধর্মীয় উগ্রবাদ ও ইহজাগতিকতাভিত্তিক উগ্রবাদের ইতিহাসের নতুন একটি অধ্যায় প্রত্যক্ষ করলাম। এ দুই পক্ষের রেষারেষির শিকার হচ্ছে সাধারণ মানুষ।

‘ইসলাম সারা বিশ্বে সংকট সৃষ্টি করছে’—এমন কথা বলে এবং বিতর্কিত ম্যাগাজিন শার্লি হেবদোর প্রকাশ করা মহানবী (সা.)-এর কার্টুন পুনর্মুদ্রণ সমর্থন করে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট মাখোঁ শুধু আইএস, আল–কায়েদা বা এ ধরনের জঙ্গিগোষ্ঠীকেই উসকানি দেননি, তিনি সমগ্র মুসলিম জগৎকে আহত করেছেন।

আপনি অন্যদের তাঁদের পালনীয় ধর্মীয় বিধিবিধান মানা ছেড়ে দিতে বলছেন কারণ, সেই সব ধর্মীয় অনুশাসন প্রতিপালনের কোনো ধর্মীয় দায় আপনার নেই—এ নীতি আপনার রাজনীতিকে আর ইনসাফনির্ভর ও পরমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে দেবে না। মুসলমানরা যে সমাজেই বাস করুক না কেন, তাঁরা তাঁদের মহানবী (সা.)-এর প্রতি একইভাবে সেই শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেন। তাঁদের এ বিষয়ের প্রতি সম্মান দেখানোর অর্থ সহিংস উগ্রবাদের সঙ্গে আপস করা নয় বরং এটি যেকোনো সরকারের নৈতিক ও রাজনৈতিক দায়িত্ব।

মাখোঁ হয়তো রাজনৈতিকভাবে সুবিধা নেওয়ার জন্য ইসলামের বিরুদ্ধে একটি নতুন ‘সেক্যুলার ক্রুসেড’–এ নেতৃত্ব দিচ্ছেন এবং পশ্চিমা দেশে থাকা মুসলমান সংখ্যালঘুদের ‘দ্য আদার’ বা ‘অন্যরা’ বলে আলাদা করছেন। কিন্তু এ উদ্যোগ তাঁর দেশ ও অন্য পশ্চিমা দেশগুলোকে সংকট থেকে মুক্তি দিতে সহায়তা করবে না।

মাখোঁ যা বলছেন তা যদি একান্তই তাঁর নিজস্ব চিন্তার প্রতিফলন হতো তাহলে হয়তো উদ্ভূত সংকট সহজে সমাধান করা যেত। কিন্তু এর শিকড় আরও গভীরে। মাখোঁর বাগাড়ম্বর ও শারীরিক ভাষার মধ্যে জাতীয়তাবাদী উগ্র গোষ্ঠীর সম্মিলিত কণ্ঠের দ্যোতনা স্পষ্ট। মাখোঁ তাঁর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য পূরণে সফল হতেও পারেন, না–ও পারেন। কিন্তু তিনি নিশ্চিতভাবে ইউরোপে মুসলিম বিদ্বেষের যে বিষবৃক্ষ রোপণ করলেন, তা বড় হয়ে ডালপালা বিস্তার করবে।

বিজ্ঞাপন

আইএস বা আল–কায়েদার মতো যেসব উগ্রপন্থী সংগঠন ইসলামের নামে সহিংস পথ বেছে নিয়েছে, সারা বিশ্বের সব মুসলিমপ্রধান দেশের সরকার তার নিন্দা করেছে। কিন্তু শার্লি হেবদোর সেই বিতর্কিত কার্টুন পুনরায় ছাপার বিষয়টিকে যখন ফ্রান্স সরকারের সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ লোক সমর্থন করেন, তখন সারা বিশ্বের মুসলমান আহত হন। এটি পশ্চিমা সমাজ ও ইসলামের মধ্যে বিভেদের দেয়াল তুলবে। এতে পারস্পরিক আস্থাহীনতা বাড়াবে।

যেকোনো সভ্য সমাজের রাজনৈতিক দায়িত্ব হলো যেকোনো উগ্রপন্থাকে প্রত্যাখ্যান করা, সে ধর্মীয়ই হোক বা সেক্যুলারই হোক। কারণ, হিংসা হিংসাকেই জন্ম দেয়। মাখোঁকে বুঝতে হবে, তাঁর কথিত সেক্যুলার ক্রুসেড ইউরোপে ‘মুসলিম কোয়েশ্চেন’ সমস্যার সমাধান আনতে পারবে না। স্থায়ী শান্তি আনতে রাজনীতিকদের আরও বিবেচক এবং অন্যের ধর্মবিশ্বাস ও রীতিনীতির প্রতি সত্যিকারের শ্রদ্ধাশীল হতে হবে।

আল–জাজিরা থেকে নেওয়া, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

ইব্রাহিম কালিন: তুরস্কের প্রেসিডেন্টের মুখপাত্র

মন্তব্য পড়ুন 0