বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

এক
প্রথমেই আসা যাক এ দেশে এলপি গ্যাসের বাজার তথা চাহিদা ও জোগান পরিসরের দিকে। বিইআরসির দেওয়া তথ্যমতে, এ দেশে এলপি গ্যাসের চাহিদা ক্রমবর্ধমান। ২০০৮ সালে এ দেশে এলপি গ্যাসের মোট ব্যবহার ছিল যেখানে মাত্র ৫০ হাজার মেট্রিক টন, ২০২০ সালে তা বেড়ে ১,০২০ হাজার মেট্রিক টনে দাঁড়িয়েছে। ২০০৮ সালে এ দেশে গৃহস্থালি রন্ধনকাজে মাথাপিছু এলপি গ্যাসের ব্যবহার ছিল ০.৩ কেজি, কিন্তু ২০২০ সালে তা ছিল ৫.৬৩ কেজিতে। গৃহস্থালি রন্ধনকাজে এ দেশে এলপি গ্যাসের ব্যবহার ক্রমবর্ধমান হলেও তা এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় যথেষ্ট পেছনে। যেমন জাপানে মাথাপিছু এলপি গ্যাসের ব্যবহার ৫৮ কেজি, মালয়েশিয়ায় ২১, ভারতে ১৬, ভিয়েতনামে ১৩ কেজি উল্লেখযোগ্য।

বিইআরসির প্রদত্ত তথ্যমতে, বাংলাদেশে বর্তমানে মোট জনগোষ্ঠীর প্রায় ১১ শতাংশ বা ৩৮ লাখ পরিবার এলপিজি ব্যবহারকারী। অন্যদিকে মোট জনগোষ্ঠীর প্রায় ১৩ শতাংশ রান্নায় প্রাকৃতিক গ্যাস বা এনজি ব্যবহারকারী। অবশিষ্ট প্রায় ৭৫ ভাগ জনগোষ্ঠী রান্নায় জ্বালানির জন্য বায়োমাসের ওপর নির্ভরশীল। এ দেশে বর্তমানে রন্ধনকাজের পাশাপাশি শিল্প, বাণিজ্য ও অটোমোবাইল খাতেও এলপি গ্যাসের চাহিদা রয়েছে।
সরবরাহ খাতে দেখা যায় বাংলাদেশে বর্তমানে ২৯টি সরকারি-বেসরকারি কোম্পানি এলপিজি আমদানি, মজুতকরণ, বিতরণ, সরবরাহের কাজে নিয়োজিত। এলপিজির ডিলার প্রায় ৩ হাজার, আমদানিকারী অপারেটর ২০টি এবং এলপিজি আমদানি টার্মিনাল রয়েছে ১৪টি। উল্লেখ্য, দেশে এলপি সরবরাহের সিংহভাগই (প্রায় ৯৮ শতাংশ) মেটানো হয় বেসরকারি খাতের মাধ্যমে। বাংলাদেশ মূলত কাতার, সংযুক্ত আরব-আমিরাত এবং সৌদি আরব থেকে এলপি জি আমদানি করে থাকে।

এলপি গ্যাসের ক্ষেত্রে খরচের সঠিক আন্দাজ করা দুরূহ। একদিকে এলপিজির বাজারমূল্য অস্থিতিশীল, যা এ মাসে ৯৫০ তো অন্য মাসে ১ হাজার ২০০ টাকা। আবার ১২ কেজির বোতলজাত গ্যাসে কখনো কখনো ১ মাসও যায় না। সে ক্ষেত্রে এলপিজি ব্যবহারকারী মাসে গড়ে ১ হাজার ৫০০ টাকার বেশি খরচ করে থাকে।

দুই
গণশুনানির প্রাথমিক ধাপে ব্যক্তিমালিকানাধীন একটি এলপিজি কোম্পানি, ব্যক্তিমালিকানাধীন এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (লোয়াব) এবং রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোম্পানি এলপি গ্যাস লিমিটেড বিইআরসিতে এলপিজির মূল্যহার পুনর্নির্ধারণের প্রস্তাব দাখিল করেছে। আরও দুটি বেসরকারি এলপিজি কোম্পানি কোনো প্রস্তাব পেশ করেনি। তারা লোয়াবের প্রস্তাবে অভিন্ন মত পোষণ করে পত্র দিয়েছে। অপর আরেকটি ব্যক্তিমালিকানাধীন এলপিজি কোম্পানি কোনো প্রস্তাব না দিয়ে সৌদিভিত্তিক এলপিজি উৎপাদক ও রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান আরামকো ঘোষিত এলপিজির মূল্যতালিকা পেশ করেছে। প্রস্তাবিত মূল্যতালিকায় ১২ কেজি ওজনের সিলিন্ডার/বোতলজাত গ্যাসে বেসরকারি প্রস্তাব সর্বচ্চ ১০৬০ টাকা এবং সরকারি কোম্পানি কর্তৃক পেশকৃত সর্বনিম্ন মূল্য ৬০০-৭০০ টাকা দেখা গেছে (তথ্যসূত্র: দৈনিক বণিক বার্তা, জানুয়ারি ১৪, ২০২১)।

মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন কর্তৃক গঠিত কারিগরি মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশমালার ৮ (১০) ক্রমে দেখা যায়, মোট ব্যয় নির্ধারণের ক্ষেত্রে তারা পেট্রোলিয়ামজাত পদার্থের ইমপোর্ট প্যারিটি প্রাইস, অভ্যন্তরীণ পরিবহন, ডিলারদের মার্জিন, পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় যেমন মজুত, বিপণন ও বিতরণ, সংশ্লিষ্ট অবচয় যেমন মজুত, বিপণন ও বিতরণ, আয়কর ও অন্যান্য মজুত, বিপণন ও বিতরণ সংশ্লিষ্ট কর অন্তর্ভুক্তের সুপারিশ করেছে।
পক্ষান্তরে বেসরকারি সরবরাহকারীদের সংগঠন লোয়াবের পেশকৃত মূল্যহারে অন্যান্য ব্যয়ের পাশাপাশি স্থায়ী ব্যয় উশুল, যা পক্ষান্তরে করিগরি কমিটির মূল্যায়নে অবচয় খাতে অন্তর্ভুক্তি দৃশ্যনীয়।

তিন
বাংলাদেশে গৃহস্থালি জ্বালানির বিকল্প উৎস হিসেবে প্রাকৃতিক গ্যাসের সংযোগ না দেওয়া এবং একমাত্র রাষ্ট্রীয় এলপিজি সরবরাহকারী কোম্পানি এলপি গ্যাস লিমিটেডকে সীমিত পরিসরে রাখা (যারা মাত্র ২ শতাংশ সরবরাহে সক্ষম) এলপি গ্যাসের বাজারে বেসরকারি উদ্যোগকে একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রদানের ইঙ্গিত বহন করে। যদিও এ দেশে বর্তমানে ২৯টি কোম্পানি এলপি গ্যাস আমদানি, বিতরণ ও বিপণনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অর্থশাস্ত্রে তা বহু-ফার্ম বলেই পরিগণিত। কিন্তু দৃশ্যত তারা তাদের কার্টেল (যেমন লোয়াব) গঠন করেছে বাজার নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে স্বীয় ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষায়।

অন্যদিকে ভোক্তা পর্যায়ে সাধারণ জনগণ খুবই অসহায়। জ্বালানির মূল্য উৎসভেদে ভিন্ন থাকায় ভোক্তারা অসমনীতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, প্রাকৃতিক গ্যাসের ব্যবহারে ঢাকা শহরে দুই চুলার জন্য মাসিক স্থায়ী খরচ বর্তমানে ৯৫০ টাকা। কিন্তু প্রাকৃতিক গ্যাস সঞ্চালনে যাঁরা প্রি-পেইড মিটার ব্যবহার করেন, তাঁদের খরচ যথেষ্ট কম। ব্যবহারকারী পর্যায়ে কথা বলে জানা যায়, ১ হাজার টাকা রিচার্জ করলে গড়পড়তা ৫ জনের পরিবারে প্রায় দেড় মাসের বেশি চলে। মিটারবিহীন সংযোগে ভোক্তারা মাসে পরিশোধ করছেন ৯৫০ টাকা। কিন্তু এলপি গ্যাসের ক্ষেত্রে খরচের সঠিক আন্দাজ করা দুরূহ। একদিকে এলপিজির বাজারমূল্য অস্থিতিশীল, যা এ মাসে ৯৫০ তো অন্য মাসে ১ হাজার ২০০ টাকা। আবার ১২ কেজির বোতলজাত গ্যাসে কখনো কখনো ১ মাসও যায় না। সে ক্ষেত্রে এলপিজি ব্যবহারকারী মাসে গড়ে ১ হাজার ৫০০ টাকার বেশি খরচ করে থাকে।

বাজার নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকারি সরবরাহকারী এলপি গ্যাস কোম্পানির সক্ষমতা শূন্যের কোঠায় বিধায় জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের ম্যাজিস্ট্রেটদের হিমশিম খেতে দেখা যায়। অনেক সময় দেখা যায় তাঁরা যে মূল্যতালিকা ঝুলিয়ে দেন, তা প্রতিপালিত হয় না।

উন্নত অনেক দেশ যেমন জাপানে প্রাকৃতিক গ্যাস সঞ্চালন লাইনের পাশাপাশি এলপিজি বিদ্যমান। কিন্তু আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণে বর্তমানে প্রাকৃতিক এবং এলপি গ্যাসের পরিবর্তে বিদ্যুতের ব্যবহারকে উৎসাহিত করা হচ্ছে। প্রতিবেশী দেশ ভারতে এলপিজি ব্যবহারকারী প্রতিটি পরিবার বছরে প্রথম ১২টি ১৪.২ কেজি ওজনের বোতল ভর্তুকিতে পেয়ে থাকে। কোনো পরিবার এর চেয়ে বেশি ব্যবহার করলে বাজারমূল্যে ব্যবহার করে থাকে। জাপানে এলপি গ্যাস সরবরাহকারী কোম্পানিগুলো দায়িত্বশীলতার সঙ্গে শীত-গ্রীষ্মে সঞ্চালনের প্রেশার পরীক্ষা করত রিফিলিং বা প্রতিস্থাপন নিজ দায়িত্ব করে থাকে। এলপিজি গ্রাহক প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহারকারী গ্রাহকের মতোই মাসিক বিল পরিশোধ করেন।

প্রতিবেশী দেশ ভারতেও এলপি গ্যাস সরবরাহ এবং ব্যবহার বেশ সহজতর। ইন্ডিয়ান অয়েল করপোরেশন লিমিটেড বা আইওসিএল-এর তথ্য ঘেঁটে দেখা যায়, প্রথমত নিয়ম মেনে ব্যবহারকারীকে নিবন্ধন করতে হয়। গ্রাহক বিভিন্ন মাধ্যম ব্যবহার করে এলপি গ্যাসের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ পেতে পারেন। যেমন, বিপণন এজেন্সি, অনলাইন অর্ডার, মোবাইল অ্যাপস, এসএমএস, আইভিআরএস বা ইন্টারঅ্যাকটিভ ভয়েস রেসপন্স সিস্টেম ব্যবহারের মাধ্যমে।

বাংলাদেশে এলপি গ্যস ব্যবহারকারী গ্রাহক এসবের তেমন কিছুই পান না। অনেক ক্ষেত্রে নিত্যপ্রয়োজনীয় এই জ্বালানি সংগ্রহ করতে বেশ বেগ পেতে হয়। অঞ্চলভেদে মূল্যের তারতম্য তো আছেই। বাজার নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকারি সরবরাহকারী এলপি গ্যাস কোম্পানির সক্ষমতা শূন্যের কোঠায় বিধায় জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের ম্যাজিস্ট্রেটদের হিমশিম খেতে দেখা যায়। অনেক সময় দেখা যায় তাঁরা যে মূল্যতালিকা ঝুলিয়ে দেন, তা প্রতিপালিত হয় না।

এখন আসা যাক মূল্য নির্ধারণে বাজারব্যবস্থা কী বলে? অর্থশাস্ত্রে ন্যাচারাল মনোপলি তত্ত্বে কিছু কিছু পণ্য উৎপাদন, বিতরণ ও বিপণনে একচেটিয়া ব্যবস্থা স্বীকার করে নেওয়া হয়। উদাহরণস্বরূপ, যেসব ক্ষেত্রে উৎপাদন, বিতরণ বা বিপণন খরচ এত বেশি, যা ব্যক্তি উদ্যোগে মেটানো সম্ভবপর হয় না। যেমন বিদ্যুৎ, গ্যাস সঞ্চালন ব্যবস্থা বা একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় অন্যতম। এ ক্ষেত্রে একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনে হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ হতে পারে, যা ছাত্রছাত্রীদের থেকে নেওয়া ফি দিয়ে কোনোভাবেই উশুল করা সম্ভব নয়। এ রকম বাজারব্যবস্থায় উৎপাদক বা সরবরাহকারী স্থায়ী ব্যয় ওঠানোর কথা ভাবেন না। সে ক্ষেত্রে পণ্যের ইউনিটপ্রতি মূল্য হবে চলমান উৎপাদন বা বিতরণ/বিপণন খরচের সমান।

আর পূর্ণ প্রতিযোগিতার বাজারে উৎপাদক বা বিতরণ/সরবরাহকারীকে বলা হয় মূল্য গ্রহীতা মাত্র। এ রকম বাজারে তাদের মূল্য নির্ধারণে সম্যক ভূমিকা থাকে না। তাঁরা প্রান্তিক খরচের সমান মূল্যে পণ্য সরবরাহ করেন। মাঝামাঝি পর্যায়ে একাধিক কিন্তু বহু ফার্ম নয়, এ রকম উৎপাদক, বিতরণ বা বিপণন ব্যবস্থায় গড় মূল্য প্রথা দৃশ্যমান। এ ক্ষেত্রে তাঁরা চলতি ব্যয়ের পাশাপাশি স্থায়ী খরচকে যোগ করে উৎপাদিত ইউনিট দিয়ে ভাগ করে ইউনিটপ্রতি বাজারমূল্য নির্ধারণ করেন। স্থায়ী ব্যয়ের অবচয় নির্ধারনে তাঁরা যাতে স্বচ্ছ থাকেন, সে ক্ষেত্রে রেগুলেটরি অথরিটি ভূমিকা রাখতে পারে। সার্বিক অর্থে এ ব্যবস্থাকে রেগুলেটরি প্রাইসও বলা হয়ে থাকে।

বাংলাদেশের এলপি গ্যাসের সরবরাহ খাত বিশ্লেষণে বলা যায়, সরবরাহকারী বহু হলেও তারা সংঘবদ্ধ আচরণ করে। যেমন গণশুনানিতে প্রায় সবাই মিলে একই মূল্য প্রস্তাব। এ রকম ব্যবস্থায় তারা প্রায় একচেটিয়া বাজার আধিপত্য দেখাতে সক্ষম। সে ক্ষেত্রে সুদীর্ঘকাল ব্যবসাকারী এসব প্রতিষ্ঠানের স্থায়ী ব্যয় উশুল প্রস্তাব যৌক্তিক মনে হয় না। সম্পূরক খাত এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহের সঙ্গে সার্ভিস গ্যাপ কমানো এবং সুদক্ষ সেবা নিশ্চিতকল্পে চলতি ব্যয়ের পাশাপাশি সর্বোচ্চ সুদক্ষতা ব্যয় (কস্ট ফর এক্সসেলেন্স) যোগ করে এলপি গ্যাসের ভোক্তা পর্যায়ে মূল্য নির্ধারণ যৌক্তিক বলে প্রতীয়মান হয়। আর তা নিশ্চিত করা গেলে এলপি গ্যাসের ভোক্তা সাধারণ সুলভ মূল্যের পাশাপাশি সুদক্ষ সেবায় গৃহস্থালি জ্বালানি হিসেবে এলপি গ্যাস ব্যবহারে উৎসাহিত হবেন। কোম্পানিগুলোও সে ক্ষেত্রে বেশি সরবরাহ বা বিক্রির মাধ্যমে বেশি মুনাফা করতে পারবে। সে ক্ষেত্রে বাজারে উইন-উইন অবস্থা বিরাজের মাধ্যমে সব পক্ষই লাভবান হবে।


ড. শহীদুল জাহীদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্সুরেন্স বিভাগের শিক্ষক।

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন