default-image

সকাল সোয়া নয়টা। লকডাউনের অবস্থা দেখার জন্য বাসার বাইরে বের হয়ে দেখি, সব রাস্তা প্রায় ফাঁকা। মনে পড়ে গেল সেই ১৯৫৩ সালের কথা। তখন আমরা ওয়ারীর বাসায় নতুন এসেছি। সেই সময়ের শান্ত, নিরিবিলি পরিবেশ প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম। আজ সকালে সেই স্মৃতি ফিরে পেলাম। হারিয়ে গেলাম সেই পঞ্চাশ–ষাটের দশকের ওয়ারী এলাকায়।

চণ্ডীচরণ বোস স্ট্রিটের শেষ প্রান্তে, ফোল্ডার স্ট্রিটের সংযোগস্থলে লকডাউন এলাকা থেকে বের হওয়ার একমাত্র গেটে একটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা একজন তরুণী শান্তভাবে স্বেচ্ছাসেবকদের সঙ্গে কথা বলছেন। তাঁর ব্যাংক থেকে জরুরি তলব এসেছে। যেতে হবে। কিন্তু পুলিশ ও কর্মীরা তাঁকে বোঝাচ্ছেন, বের হওয়া যাবে না। পরে বললেন, কোন ব্যাংক? নাম শুনে বললেন, এই ব্যাংক থেকে তো কোনো বিশেষ নির্দেশনা তাদের কাছে আসেনি। তরুণী কর্মকর্তা তাঁর বসকে ফোনে বললেন, লকডাউন ভেঙে আসতে দিচ্ছে না, বলছে ব্যাংকের অনুমোদন নেই, আর সরকার তো সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে। বস বললেন, তাহলে বাসায় থেকেই জরুরি কিছু কাজ করে দিন। তরুণী কর্মকর্তা ফিরে গেলেন।

অথচ দুদিন আগেও অবস্থাটা ছিল ভিন্ন। বাইরে যেতে না দিলে লোকজন তেড়ে আসতেন। জরুরি কাজের কথা বলে অনেকে একরকম জোর করেই বাইরে চলে যেতেন। কর্মীরা হাতজোড় করে বোঝাতেন, পুলিশ শান্তভাবে বলতেন, আইন মানুন, প্লিজ। তারপরও সেখানে ভিড় লেগে থাকত।

৪ জুলাই ওয়ারীতে লকডাউন শুরুর সময় দেখেছি সকালবেলা থেকেই রাস্তায় মানুষ আগের মতোই হাঁটছে। জিজ্ঞেস করলে বলতেন, আরে রাখেন তো আপনার লকডাউন, আগে ডায়াবেটিসটা লাইনে আনি। সুগার কমাই। না হলে তো হাসপাতালেও যাওয়া যাবে না। বলবে আগে ‘করোনা নেগেটিভ’ সনদ আনেন।

আমার ডায়াবেটিস নেই। কিন্তু প্রতিদিন সকালে রাস্তায় হাঁটতে বের হতাম। ওয়ারী এলাকার রাস্তাগুলো সব ছিমছাম, পরিষ্কার। প্রতিটি রাস্তা ২০ থেকে ৩০ ফুট চওড়া। বিশেষভাবে র‍্যাংকিন স্ট্রিট, লারমিনি স্ট্রিট, ওয়্যার স্ট্রিট, হেয়ার স্ট্রিট, নবাব স্ট্রিট। সেই ১৮৮৯ সালে ঢাকার প্রান্তে, ‘লাট ভবন’ এখন বঙ্গভবনের ঠিক দক্ষিণ পাশ ঘেঁষে এই অভিজাত এলাকা গড়ে তোলা হয়। সে যুগের গুলশান–বারিধারা! প্রতিটি রাস্তায় বাসার প্লটগুলো এক বা দুই বিঘা জমির। এক–একটা প্লটে একতলা বা দুইতলার বাসা। ভেতরের খালি জমিতে আম–জাম–কাঁঠাল–লিচুগাছ। রাস্তাগুলোর নামকরণ হয় ব্রিটিশ সাহেবদের নামে।

আজ অবশ্য সব বদলে গেছে। প্রতিটি রাস্তায় ১০ থেকে ২০ তলার বহুতল ভবন। যে দুই বিঘা প্লটে আগে ছিল একটা দেড়তলা বাড়ি, সেখানে এখন ছয়টা বা আটটা অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিংয়ে অন্তত তিন–চার শ ফ্ল্যাট! এলাকার বাসিন্দারা মোটামুটি অভিজাত। ব্যবসায়ী বা চাকরিজীবী। চিকিৎসক–অধ্যাপক, শিল্পী–সাহিত্যিক, আইনজীবী, উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাদের আবাস। আছেন অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তিরাও।
এই ওয়ারী নাকি করোনাভাইরাসের রেড জোন হয়ে গেছে। তাই লকডাউন। প্রথমে আমার তো বিশ্বাসই হয়নি যে আমাদের এই শান্তশিষ্ট এলাকাটি করোনাভাইরাসের আখড়া হয়ে উঠেছে। কিন্তু পরে দেখলাম আমাদের বাসার আশপাশেই বেশ কয়েকজনের নাকি করোনা হয়েছিল, আবার সুস্থও হয়ে গেছেন। অবশ্য লারমিনি স্ট্রিট, হেয়ার স্ট্রিট ও নবাব স্ট্রিটের কয়েকজনের করোনার কথা আগেই জেনেছি। দুজন মৃত্যুবরণও করেন। ব্যস, এরপর আর কিছু শোনা যায়নি। আসলে ঘরের কথা কেউ প্রচার করেননি। তাই আমরা ভাবতাম লকডাউন আবার কেন?

কিন্তু প্রতিদিন সকাল থেকে ওয়ার্ড কাউন্সিলরের উদ্যোগে স্বেচ্ছাসেবকেরা মাইকে প্রচার করে যাচ্ছেন, জরুরি কাজ ছাড়া কেউ যেন বাইরে বের না হন। এবং মুখে মাস্ক বাধ্যতামূলক। কিন্তু প্রথম দিকে কেউ পাত্তা দিত না।

কিন্তু ধীরে ধীরে অবস্থা বদলে যায়। ওয়ারীতে লকডাউনের যদি কোনো সুফল থাকে, তাহলে সেটা হলো মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি। এখন যে দু–চারজন বাইরে বেরোয়, মুখে মাস্ক থাকবেই। সামাজিক দূরত্ব রেখে চলাফেরা করে। করোনাভাইরাসের বিস্তার রোধে সচেতন ভূমিকা রাখে। এর ফলে হয়তো শিগগিরই ওয়ারীতে সংক্রমণের হার একেবারে নেমে আসবে। এলাকার প্রায় লাখখানেক মানুষ স্বস্তি পাবে।

ওয়ারীতে প্রতিদিন সকালে সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে দু–তিনটি মিনি ট্রাকে শাকসবজি, তরিতরকারি বিক্রি করা হয়। বাসার লোকজন লাইন ধরে যথাযথ দূরত্ব বজায় রেখেই কেনাকাটা করেন। স্বপ্ন, মিনাবাজার ও বিগবাজারের মতো কয়েকটি সুপার শপ খোলা থাকে। সেখান থেকে হোম সার্ভিসে জিনিসপত্র কেনা যায়। অথবা নিজে গিয়ে কিনতে পারেন। খুব বেশি ভিড় হয় না।

মুদি দোকান সব বন্ধ। শুধু ওষুধের দোকান খোলা। এটিএম বুথ ও দু–একটি ব্যাংকের ফাস্টট্র্যাক খোলা আছে। প্রয়োজনে মানুষ ক্যাশ টাকা তুলতে পারেন।

কিন্তু ১০ নম্বর বিপৎসংকেত দিচ্ছে মশার দল। তাদের এখন পোয়াবারো! আগে এক দিন পরপর রাস্তার দুই ধারে সিটি করপোরেশনের কর্মীরা ফগার মেশিনে মশা মারার ওষুধ ধোঁয়ার আকারে ছড়িয়ে দিয়ে যেতেন। এ পর্যন্ত আমরা মশা মারার এমন শক্তিশালী ওষুধ আর পাইনি। মাত্র তিন–চার দিনের অভিযানেই মশা প্রায় নির্বংশ হয়ে গিয়েছিল। আমরা ডেঙ্গুর ভয়ে ছিলাম। ভাবতাম এই করোনার মধ্যে ডেঙ্গু হলে আর রক্ষা নেই। সেই ভয়টা কেটে গিয়েছিল। কিন্তু ওয়ারীতে লকডাউন শুরুর পর থেকে আর ফগার মেশিনে মশার ওষুধ ছিটাতে কেউ আসেন না। ইতিমধ্যেই এলাকাবাসীর বাড়ি বাড়ি মশার উৎপাত শুরু হয়ে গেছে।

শপথ নেওয়ার সময় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র যখন তাঁর ভাষণে মশকনিধনকে অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হিসেবে বলেছিলেন, তখন খুব খুশি হয়েছিলাম। তারপর করপোরেশনের কর্মীদের ফগার মেশিন অভিযানে তো ভাবলাম, একেবারে হাতে হাতে ফল পেয়ে গেছি। মাননীয় মেয়র যা বলেন, তা করেই ছাড়েন।

কিন্তু এখন দেখছি লকডাউনের চোটে মশাদের রাজত্ব যেন জোরদার হয়ে উঠছে। আবার শুনছি, মশা মারতে নাকি অনলাইনে সিটি করপোরেশনে আবেদন করে দু–চার হাজার টাকা করে ফি দিয়ে তারপর অ্যাপার্টমেন্ট বা ফ্ল্যাটে মশা মারার ব্যবস্থা করতে হবে! এ পর্যন্ত নাকি অনলাইনে কয়েকটা দরখাস্ত পড়েছে। কিন্তু কেউ টাকা দেননি। তাই ফগার মেশিনওয়ালারাও আর আসেন না। নাকে তেল দিয়ে ঘুমানোর মোক্ষম সময় তাঁদের এসে গেছে।

মাননীয় মেয়র (ঢাকা দক্ষিণ), এদিকে একটু নজর দিন। লকডাউনে মানুষের সচেতনতা বাড়াতে গিয়ে যেন মশাদের চেতনা স্ফীত হয়ে না ওঠে। তাহলে করোনায় বাঁচলেও ডেঙ্গুতে না মরে উপায় থাকবে না।

আব্দুল কাইয়ুম, প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক
quayum.abdul@prothomalo.com

বিজ্ঞাপন
কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন