default-image

বাংলাদেশ, মিয়ানমার আর চীনের পররাষ্ট্রসচিবদের অংশগ্রহণে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে ত্রিপক্ষীয় সংলাপ অনুষ্ঠিত হলো ১৯ জানুয়ারি ২০২১। তিন সচিব নিজ নিজ রাজধানী থেকে দেড় ঘণ্টাব্যাপী আলোচনা করেন ভার্চ্যুয়াল মাধ্যমে। মূল আলোচনা হয় বাংলাদেশ আর মিয়ানমারের মধ্যে, চীন মূলত সহায়কের ভূমিকা পালন করে। রোহিঙ্গাদের ফেরত প্রক্রিয়া কীভাবে শুরু হতে পারে, আলোচনায় এ নিয়ে দুই পক্ষ তাদের মতামত উপস্থাপন করেছে। মহাপরিচালক পর্যায়ে ওয়ার্কিং গ্রুপের ভার্চ্যুয়াল বৈঠক হবে আগামী মাসে, এরপর আবার পররাষ্ট্রসচিব পর্যায়ে আলোচনা।

বাংলাদেশের দেওয়া ৮ লাখ ২৯ হাজার ৩৬ জন রোহিঙ্গার তালিকা থেকে মিয়ানমার এযাবৎ ৪২ হাজার ৪০ জনের যাচাই-বাছাই শেষ করেছে এবং তার মধ্যে ২৭ হাজার ৬৪০ জন ‘মিয়ানমারে বাস করতেন’ বলে নিশ্চিত করেছে। বছরের দ্বিতীয়ার্ধে এদের মধ্য থেকে পুনর্বাসন প্রক্রিয়া শুরুর প্রস্তাব দিয়েছে তারা। তালিকা পরীক্ষা করে বাংলাদেশ দেখেছে যে এটি একটি বিক্ষিপ্ত তালিকা। কারণ, ৮৪০ জন মানুষকে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে ১২টি গ্রাম থেকে। বাংলাদেশ প্রস্তাব দিয়েছে পুনর্বাসন তালিকা গ্রামভিত্তিক করার জন্য, যাতে পরস্পর পরিচিত লোকজন একসঙ্গে পুনর্বাসিত হতে পারে। এতে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের মধ্যে আস্থা সঞ্চারিত হবে এবং ফেরার ব্যাপারে তারা ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নিতে পারে। বাংলাদেশের এই বাস্তবসম্মত প্রস্তাবে মিয়ানমার সম্মতি জানায়নি। তিন মাসের মধ্যে পুনর্বাসন প্রক্রিয়া শুরু করতে চেয়েছিল বাংলাদেশ, মিয়ানমার বলেছে তাদের আরও সময় দরকার।

বিজ্ঞাপন
বাধ্য না হলে রোহিঙ্গাদের ফেরত নেবে না, মিয়ানমার শাসকদের এ অবস্থান সব সময় মনে রাখতে হবে আমাদের। আর প্রত্যাবাসন মার্চে না জুলাইয়ে শুরু হবে, এর চেয়ে ঢের বেশি গুরুত্বপূর্ণ এই আট লাখ মানুষের প্রত্যাবর্তনের রোডম্যাপ। এতে যদি পাঁচ বছরও লাগে, আমাদের নিশ্চয়তা দরকার যে পাঁচ বছরে তারা সবাই ফেরত যেতে পারবে।

সভা শেষে এর ফলাফল নিয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রসচিব তাঁর সতর্ক আশাবাদ প্রকাশ করেছেন। বস্তুত, সমস্যা সমাধানে আশাবাদী হওয়ার বিকল্পও তো নেই। তবে পর্যালোচনায় এটা পরিষ্কার যে সত্যিকারের কোনো অগ্রগতি হয়নি। দুই পক্ষ নিজ নিজ বক্তব্য উপস্থাপন করেছে শুধু, অনেকটা বধিরের সংলাপের মতো। এটা অবশ্য অপ্রত্যাশিত কিছু নয়। গ্রামভিত্তিক পুনর্বাসনে মিয়ানমারের জন্য রাজি হওয়া কঠিন। কারণ, তারা গ্রামগুলোকে ধ্বংস করে সেখানকার বাস্তবতা বদলে দিয়েছে। কোথাও সেনানিবাস গড়েছে, কোনো কোনো জায়গা শিল্প স্থাপনের জন্য বরাদ্দ দিয়েছে। আর বিলম্ব, সে তো তাদের মূল কৌশল শুরু থেকেই।

বাধ্য না হলে রোহিঙ্গাদের ফেরত নেবে না, মিয়ানমার শাসকদের এ অবস্থান সব সময় মনে রাখতে হবে আমাদের। আর প্রত্যাবাসন মার্চে না জুলাইয়ে শুরু হবে, এর চেয়ে ঢের বেশি গুরুত্বপূর্ণ এই আট লাখ মানুষের প্রত্যাবর্তনের রোডম্যাপ। এতে যদি পাঁচ বছরও লাগে, আমাদের নিশ্চয়তা দরকার যে পাঁচ বছরে তারা সবাই ফেরত যেতে পারবে। চীনের মুখ রক্ষার্থে ২ হাজার বা ১০ হাজার রোহিঙ্গাকে ফেরত নিয়ে আবার তিন বছর গড়িমসি করার যেন সুযোগ না থাকে, সেদিকে দৃষ্টি দিতে হবে।

মিয়ানমার সেনাদের সংঘটিত গণহত্যা থেকে জীবন রক্ষার্থে রোহিঙ্গারা পালিয়ে বাংলাদেশে এসেছিল। তাদের প্রত্যাবর্তনে তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে মিয়ানমারে তাদের জন্য নিরাপদ ও অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি। সভায় এ নিয়ে কোনো আলোচনা হয়েছে কি না, পত্রপত্রিকায় তার কোনো আভাস নেই। আজ পর্যন্ত মিয়ানমার এ লক্ষ্যে কোনো পদক্ষেপ নিয়েছে বলেও জানা যায়নি। মনে রাখতে হবে যে নিরাপদ পরিবেশ সৃষ্টি না হলে শরণার্থীরা ফিরে যেতে রাজি হবে না, আর তাদের জোর করে ফেরত পাঠানো আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। মিয়ানমারের শাসকদের দেওয়া কোনো প্রতিশ্রুতিতে সংগত কারণেই আশ্বস্ত হবে না রোহিঙ্গারা এবং এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সম্পৃক্ত করার কোনো বিকল্প নেই।

চীনের নতুন এই সহায়ক ভূমিকা এখানেই গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। রোহিঙ্গা সংকটে এযাবৎ চীনের অবস্থান হতাশাব্যঞ্জক। দুই দেশের সঙ্গেই যেহেতু চীনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বিরাজমান, উদীয়মান পরাশক্তি হিসেবে তাই এ গুরুতর সমস্যা সমাধানে তাদের আরও সক্রিয় ভূমিকা প্রত্যাশিত ছিল। তা না করে চীন সম্পূর্ণ একতরফাভাবে মিয়ানমারের পাশে শক্ত অবস্থান নিয়েছে। এর ফলে তার ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, বিশেষ করে বাংলাদেশে। চীনের এ সাম্প্রতিক উদ্যোগ হৃত ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যেও হতে পারে। এ ছাড়া নিজ স্বার্থেই চীন এ সংকট নিরসনে ভূমিকা রাখতে পারে। দীর্ঘ মেয়াদে চলমান রোহিঙ্গা সমস্যা আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি সৃষ্টি করবে, যা চীনের স্বার্থের অনুকূল হবে না।

বিজ্ঞাপন
সমস্যা সমাধানে তাই বাংলাদেশকে শুধু চীনের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। ক্ষমতার অন্য সব বলয়কেও পাশে পাওয়ার চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। আর সক্ষমতা বাড়াতে হবে নিজেদের।

মিয়ানমার এবং সে দেশের শাসকচক্রের ব্যাপক চীননির্ভরতা রয়েছে। এ জন্য অনেকে মনে করেন যে চীন চাইলেই এ সমস্যার সমাধান করে দিতে পারে। আমার মনে হয়, এ ধারণা বাস্তবানুগ নয়। বিশ্বে প্রভাব বিস্তারে চীনের বিআরআই প্রকল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ মিয়ানমার। ভারত মহাসাগরে মিয়ানমার হচ্ছে চীনের প্রবেশদ্বার। রাখাইন-ইউনান গ্যাস পাইপলাইন ছাড়াও মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করা তেল পরিবহনের জন্য পাইপলাইন আছে একই পথে। আছে চীনের তৈরি গভীর সমুদ্রবন্দর এবং নির্মাণাধীন রেল ও সড়ক সংযোগ। আফ্রিকা, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে চীনের বাণিজ্যে এ পথের গুরুত্ব শুধু বাড়বেই। সম্ভাব্য কোনো সংঘাতময় পরিবেশে মালাক্কা প্রণালি এড়িয়ে চীনা অর্থনীতির লাইফলাইন হয়ে উঠতে পারে এই প্রবেশদ্বার। মিয়ানমার অবশ্যই চীনের ওপর নির্ভরশীল, কিন্তু চীনও মিয়ানমারের ওপর নির্ভরশীল। আর মিয়ানমারের শাসকেরা তাঁদের এ সুবিধাকে কাজে লাগাতে জানেন। সমস্যা সমাধানে তাই বাংলাদেশকে শুধু চীনের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। ক্ষমতার অন্য সব বলয়কেও পাশে পাওয়ার চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। আর সক্ষমতা বাড়াতে হবে নিজেদের।

রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান সাততাড়াতাড়ি হয়ে যাবে, এমন সম্ভাবনা সুদূরপরাহত। আমাদের কূটনীতির অন্যতম লক্ষ্য হবে তাই বিশ্ব সম্প্রদায়ের দৃষ্টি থেকে বিষয়টি যেন আড়ালে চলে না যায়, তার নিশ্চয়তা বিধান করা। আর এ জন্য দরকার সমন্বিত এবং সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা। অনেকেই মনে করেন, বিশ্বের বিভিন্ন শহরে এ নিয়ে সেমিনার, সিম্পোজিয়ামের আয়োজন করা যেতে পারে। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে রোহিঙ্গা ডায়াসপোরা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে, তাদের যুক্ত করা যেতে পারে। অর্থ ও লজিস্টিক সমর্থন দিয়ে বাংলাদেশ তাদের সহায়তা করতে পারে। বিশ্ব সম্প্রদায়কে আরেকটি কথাও বারবার স্মরণ করিয়ে দিতে হবে যে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সুযোগ-সুবিধা নিয়ে বিভিন্ন সময় তারা বাংলাদেশের ওপর অযাচিত চাপ সৃষ্টি করেছে, কিন্তু এ ক্ষেত্রে যে দেশটি প্রকৃত অপরাধী, তার বিষয়ে তারা মোটেই সোচ্চার হয়নি।

আজকের বিশ্বে তথ্য প্রচারে ইন্টারনেটের ভূমিকা ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই। দুঃখজনকভাবে এই প্রচারণায় মিয়ানমার অনেকটা এগিয়ে। সাইবার জগতে মিয়ানমারের প্রচারকামীরা অনেক বেশি সক্রিয় এবং গোয়েবলসীয় দক্ষতায় তারা এ সমস্যা নিয়ে যাবতীয় মিথ্যাকে সত্যে পরিণত করার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। তাদের হ্যাকাররা বিভিন্ন সময় বাংলাদেশের বিভিন্ন ওয়েবসাইটেও আক্রমণ চালিয়েছে। এ যুদ্ধে মিয়ানমারকে পরাজিত করার মতো মানবসম্পদ বাংলাদেশের আছে। আমাদের কাজটা অনেক সহজ। কারণ, আমাদের শুধু সত্যটুকু তুলে ধরতে হবে। আরেকটি কাজ করতে হবে। ডিজিটাল বাংলাদেশ নিয়ে অনেক চেঁচামেচি করি আমরা, কিন্তু মিয়ানমারে ইন্টারনেট স্পিড বাংলাদেশের প্রায় দ্বিগুণ। নেপালের অবস্থানও বাংলাদেশের ওপরে, ভারতের কথা তো বাদই দিলাম। এ তথ্য লজ্জার এবং এর আশু নিরসন প্রয়োজন।

আপাতদৃষ্টে যদিও সম্পর্কহীন মনে হতে পারে, তবু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ক্ষমতার পালাবদল এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিদায় রোহিঙ্গা প্রশ্নে কিছু সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। বাইডেন প্রশাসন আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে মানবাধিকারকে অধিক গুরুত্ব দেবে, এমন ইঙ্গিত আছে। আর রোহিঙ্গা সমস্যা তো মূলত মানবাধিকার লঙ্ঘনেরই একটি ভয়ংকর ঘটনা। একটি জাতিগোষ্ঠীর প্রায় সবাইকে চরম নির্যাতনের মাধ্যমে তাদের বাসভূমি থেকে জোরপূর্বক বিতাড়ন করা হয়েছে। এ জন্য পূর্ববর্তী প্রশাসন কয়েকজন জ্যেষ্ঠ সেনা কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞাও আরোপ করেছে। কিন্তু এ জাতিগত নিধন শুধু কয়েকজন সেনা কর্মকর্তার কাজ নয়। মিয়ানমার রাষ্ট্র পরিকল্পিতভাবে এ অপরাধ সংঘটন করেছে। আমাদের প্রয়াস থাকতে হবে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রশাসন যেন এ সত্য বিবেচনায় নিয়ে মিয়ানমার রাষ্ট্র এবং এর পরিচালনাকারীদের বিরুদ্ধে যথাযথ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়।


মো. তৌহিদ হোসেন: সাবেক পররাষ্ট্রসচিব

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন