কিছুদিন আগে এক দিশেহারা মা তাঁর মাদকসেবী ছেলেকে নিয়ে এসেছিলেন আমার কাছে সাইকোথেরাপি নেওয়ার জন্য। কিছুদিনের মধ্যেই ছেলেটি বিদেশে যাবে পড়াশোনা করতে। মেডিকেল চেকআপের সময় জানা যায়, সে মাদক নেয়। স্বভাবতই ছেলেটি মাদক নেওয়ার ব্যাপারটি অস্বীকার করতে থাকে এবং সেশন নিতে আপত্তি জানায়। তবু মা তাকে জোর করে আমার কাছে নিয়ে আসেন।

সেশন চলাকালে আমি যখন ছেলেটির ছোটবেলার ইতিহাস জানতে শুরু করি, তখন জানতে পারি, তার ড্রাগ নেওয়া শুরু হয় একটি ঘটনার পর থেকে। অষ্টম শ্রেণিতে সে নতুন একটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে ভর্তি হয় এবং প্রথম দিনই শারীরিক ও মানসিকভাবে বুলিংয়ের শিকার হয়। সেদিন থেকেই সে স্কুলে যেতে ভয় পেত। বিষয়টি তার স্কুলের শিক্ষকদের কাছে অভিযোগ করেও কোনো রকম সমাধান না পেয়ে ধীরে ধীরে স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দেয়। স্কুলের উদ্দেশে বের হলেও স্কুলে না গিয়ে সে এলাকার ছেলেদের সঙ্গে ঘুরে বেড়াত এবং তাদের কাছ থেকেই প্রথমে গাঁজা খাওয়া শুরু করে।

আমাদের সমাজে বুলিং এবং এর নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে সচেতনতা নেই বললেই চলে। হয়তো অনেকেই এই শব্দটা প্রথম শুনে থাকতে পারেন।

বুলিং কী?
সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের মতে, বুলিং হলো অপ্রত্যাশিত এবং আক্রমণাত্মক আচরণ, যা স্কুলে যাওয়া বাচ্চাদের মধ্যে সাধারণত দেখা যায়। এ আচরণের মাধ্যমে দুই পক্ষের মধ্যে ক্ষমতার অসামঞ্জস্য প্রকাশ পায়। এই আচরণ আক্রান্ত শিশু বা কিশোরের ওপর ক্রমাগত চলতে থাকে। তবে এ আচরণ সাধারণত স্কুলে যাওয়া শিশু-কিশোরদের মধ্যে দেখা গেলেও যেকোনো বয়সের ব্যক্তির মধ্যেও দেখা যেতে পারে। যেমন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী বা অফিসের সহকর্মীদের মধ্যেও এমন আচরণ দেখা যায়।

বুলিংয়ের সংজ্ঞা থেকে যে বিষয়গুলো স্পষ্ট হয়, তা হলো—
১. বুলিংয়ের শিকার ব্যক্তি বুলিং আচরণকে মেনে নিতে পারে না।
২. যে বুলি করছে এবং যে বুলির শিকার হচ্ছে, উভয়ই বুঝতে পারে এই ধরনের পরিস্থিতিতে বুলি করা ব্যক্তির ক্ষমতা বেশি।
৩. যিনি বুলির শিকার হন তিনি বারবারই হতে থাকেন।

কিন্তু এই সংজ্ঞা হয়তো বুলি আচরণকে সম্পূর্ণরূপে ব্যাখ্যা করতে পারে না।

ন্যাশনাল বুলিং প্রিভেনশন সেন্টারের মতে, কিছু বুলিং শারীরিকভাবে শনাক্ত করা গেলেও এটি কখনো কখনো নীরবে বা মানসিকভাবেও চলতে পারে। যেমন কোনো গুজব বা ইন্টারনেটে কোনো মিথ্যা কথা ছড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে বুলিং হওয়া ব্যক্তির মানসিকভাবে ক্ষতি করা। বুলিং আচরণের অন্যতম প্রধান বিষয় হলো, এই আচরণের ফলে আক্রান্ত ব্যক্তি মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

বিভিন্ন অবস্থানের ভিত্তিতে বুলিং হতে পারে। যেমন শারীরিক বা মানসিক আঘাতের মাধ্যমে, অপমানের মাধ্যমে, কোনো তথ্যের মাধ্যমে, শারীরিক বা মানসিক হয়রানির মাধ্যমে।
বুলিং হওয়ার পেছনে বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। যেমন জাতিগত বৈষম্য, নারী-পুরুষ বৈষম্য, শারীরিক বা যৌন হয়রানিমূলক কারণে বুলিংয়ের শিকার হতে পারে।

কারা বুলিংয়ের শিকার হয়?
কারা বুলিংয়ের শিকার হবে তা আগে থেকে অনুমান করা অনেকটাই অসম্ভব। তবে গবেষণায় দেখা গেছে, যারা বুলিংয়ের শিকার হয়, তাদের কিছু বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। এরা সাধারণত ভীত, লাজুক, আত্মমুখী, কম আত্মবিশ্বাসী, অসুখী এবং দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে থাকে। তাদের সাধারণত কোনো বড় নেটওয়ার্ক বা খুব বেশি বন্ধুবান্ধব থাকে না। এসব মানুষ নিজের চেয়ে বয়সে বড়দের সঙ্গে মিশতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। শারীরিকভাবে তারা ক্ষীণদেহের অধিকারী এবং দুর্বল প্রকৃতির হতে দেখা যায়। তবে ছেলেদের চেয়ে মেয়েদের বুলিং হওয়ার হার বেশি (টিজিং বা ইমোশনাল আক্রমণাত্মক আচরণের মাধ্যমে)।

বুলিংয়ের ফলে কী ক্ষতি হয়?
যে বুলিংয়ের শিকার হচ্ছে এবং যে বুলিং আচরণ করছে উভয়ের পরিবারই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আমরা যদি একটু গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করি তাহলে দেখব বুলিংয়ের কারণে দীর্ঘমেয়াদি কিছু সমস্যা ব্যক্তির মধ্যে দেখা যায়, যেটা সামগ্রিকভাবে তাদের পরিবার ও সমাজে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। যখন কোনো শিশু বুলিংয়ের অভিজ্ঞতা প্রত্যক্ষ করে, সে হৃদয়গতভাবে নিজেকে একা করে ফেলে। সে আরও বেশি চুপচাপ হয়ে নিজেকে নিয়ে থাকা শুরু করে এবং সমবয়সীদের সঙ্গে মিশতে সমস্যা হয়। ক্রমাগত বুলিংয়ের সম্মুখীন হতে থাকলে সে সমাজ থেকে নিজেকে আলাদা করতে থাকবে এবং একসময় সে তার নিজের জগতের মধ্যে ডুবে থাকবে। মাত্রাতিরিক্ত বুলিংয়ের সম্মুখীন হতে থাকলে সে আত্মহত্যার চিন্তা বা চেষ্টাও করে ফেলতে পারে।

যে বুলিং করছে 
যে শিশু বা ব্যক্তি বুলিং করছে তারাও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যারা অন্যদের বুলিং করে, বন্ধুবান্ধব বা সহকর্মীরা তাকে এড়িয়ে চলে, ভয় পেতে শুরু করে। সাধারণত একটি বড় দল বা নেটওয়ার্ক থাকলেও সত্যিকার অর্থে তার কোনো বন্ধুবান্ধব বা সহকর্মী থাকে না, যার সঙ্গে সে মিশতে পারে বা কথা বলতে পারে। তাদের মধ্যে আবেগজনিত কিছু সমস্যা দেখা যায়। তারা নিজেদের সব সময় শক্তিশালী বা ক্ষমতাধর মনে করতে পছন্দ করার ফলে সহজে অন্যের কাছে এমনকি কাছের মানুষের কাছেও তাদের আবেগ প্রকাশ করতে পারে না। তাদের মনের কথা প্রকাশ করতে গিয়ে বা আবেগকে প্রকাশ করতে গিয়ে অনেক সময় আক্রমণাত্মক আচরণ করে ফেলে। গবেষণায় দেখা গেছে, বুলিং করা শিশু বা কিশোর বড় হয়ে বিভিন্ন মাদকে আসক্ত বা মদ্যপানের নেশায় আসক্ত হয়ে পড়ে। এ কারণে তাদের স্কুল বা প্রতিষ্ঠান থেকে বের করে দেওয়া হয়।

বুলিং আচরণকে অন্য প্রত্যক্ষদর্শীরা কীভাবে দেখে 
যেসব শিশু বা কিশোর বুলিং আচরণকে সরাসরি প্রত্যক্ষ করে, তখন বা পরবর্তী সময়ে তাদেরও দীর্ঘমেয়াদি সমস্যার সম্মুখীন হতে দেখা যায়। বেশির ভাগ সময় তারা প্রতিবাদ করে না বা ঘটনাটিকে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। যেসব কারণে তারা এড়িয়ে যায় তা হলো ১. তারা ভয় পায় প্রতিবাদ করতে। তারা মনে করে প্রতিবাদ করে কোনো লাভ হবে না বা করলে তাদেরও বুলিং করা হবে। ২. তারা বিশ্বাস করে, এটা তাদের নিজেদের কোনো বিষয় নয়।

আমরা কীভাবে ভিকটিমকে সাহায্য করব 
অভিভাবক ও শিক্ষক উভয়কেই বুলিং ঘটনা নিয়ে সচেতন থাকতে হবে। তাঁরা এসব ঘটনাকে প্রশ্রয় দেবেন না, এই ধারণাটা ভিকটিম এবং বুলিং আচরণকারী উভয়ের মধ্যে থাকতে হবে। এমন একটা পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে, যেখানে ভিকটিম নিজেকে অসহায় এবং একা মনে করবে না। অভিভাবক ও শিক্ষক বা প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা তাদের পাশে আছেন, এই ধারণা নিশ্চিত করতে হবে। ছোট শিশুরা যখন বুলির শিকার হয়, তখন তাদের আত্মসম্মান এবং নিজের প্রতি ইতিবাচক ধারণা ভেঙে যায়। এই ক্ষতি থেকে উত্তরণ করতে ভিকটিমকে নিজস্ব শক্তিশালী এবং প্রতিবাদী সত্তা তৈরিতে সাহায্য করতে হবে, যাতে তার নিজের জীবনে কোনো বাধাবিপত্তি এলে তা নিজেই মোকাবিলা করতে পারে।

বুলিং আচরণটি কীভাবে আমরা প্রতিরোধ করতে পারি
বুলিং আচরণটি আমাদের সমাজে ততটা গুরুত্ব পায় না। তবে এর কারণে ভিকটিম এবং বুলিং আচরণকারী উভয়ের জীবনেই একটি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে, যেটা অনেক সময় তাদের সারা জীবন বয়ে নিয়ে চলতে হয়। নিচের ব্যবস্থাগুলো গ্রহণ করেও এই আচরণকে প্রতিরোধ করা যেতে পারে:
১. ভিকটিমকে নিজের সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা ভাঙতে অভিভাবকদেরই এগিয়ে আসতে হবে। সন্তানদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে।
২. বুলিংয়ের শিকার ছেলে বা মেয়ে উভয়ের ঘটনাকেই সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। 
৩. কোনো সাইবার বুলিংয়ের ঘটনা ঘটে থাকলে এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে এবং সঙ্গে সঙ্গে এর প্রচার করা বন্ধ করতে পদক্ষেপ নিতে হবে।
৪. অনেক অভিভাবক মনে করেন, বাচ্চাদের ঝামেলা বাচ্চারাই মিটিয়ে ফেলবে। এই ভেবে বড়রা কোনো পদক্ষেপ নিতে চান না। এই ধারণা থেকে ভিকটিম বাচ্চারা নিজেদের একা ও অসহায় মনে করে। তাই অভিভাবকদের এ ব্যাপারে সরাসরি পদক্ষেপ নিতে হবে। 
৫. আপনার শিশুর আচরণ লক্ষ করুন। সে হঠাৎ যদি চুপচাপ থাকে, মন খারাপ করে থাকে, একা একা থাকতে পছন্দ করে এবং স্কুলে যেতে অনীহা প্রকাশ করলে তাকে কারণ জিজ্ঞেস করুন।
৬. বুলিং আচরণ করা শিশু বা কিশোরকে একজন শিশু মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলতে সুযোগ করে দিতে হবে। যাতে সে তার এই আচরণকে পরিত্যাগ করতে পারে।

আমাদের একটি কথা মনে রাখা প্রয়োজন, শিশুদের অনেক সময় নিজেদের কথা বলার জন্য কণ্ঠস্বর থাকে না বা তারা বুঝতে পারে না, তাদের সঙ্গে কী হচ্ছে, তখন আমাদের তাদের কণ্ঠস্বর হতে হবে। বুলিং অতি জরুরি একটি সামাজিক সমস্যা, যা আমাদের সবার সচেতনতা এবং সামান্য পদক্ষেপের মাধ্যমে প্রতিরোধ করা সম্ভব।

লেখক: ডেপুটি ম্যানেজার, কাউন্সেলিং, ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন