বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

১৯০৪ সালে ‘মতিচূর’-এ বেগম রোকেয়ার এই লেখা ২০২১ সালে বাংলাদেশেও খুব প্রাসঙ্গিক। এখনো ‘ভালো পাত্র’ পেলেই অনেক মা-বাবা তাঁদের স্কুলপড়ুয়া মেয়েদের বিয়ের ব্যবস্থা করেন। দীর্ঘ দেড় বছর পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা হলে জানা গেল, সাতক্ষীরার একটি স্কুলের ৫০ ও টাঙ্গাইলের একটি স্কুলের অর্ধশতাধিক ছাত্রীর বিয়ে হয়ে গেছে। কুড়িগ্রামের একটি স্কুলের নবম শ্রেণির নয়জনের মধ্যে আটজনেরই বাল্যবিবাহ হয়ে যাওয়া খবরের শিরোনাম হয়েছে। কোভিড-১৯ মহামারির সময় কত মেয়ের বাল্যবিবাহ হয়ে গেছে, এর প্রকৃত সংখ্যা আমরা এখনো জানি না। তবে গণমাধ্যমের প্রতিবেদন ও মাঠপর্যায়ে কাজ করা বেসরকারি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, মহামারিতে বাল্যবিবাহ বেড়েছে। দুর্যোগে দারিদ্র্য মোকাবিলার কৌশল হিসেবে মেয়েদের বাল্যবিবাহের ব্যবস্থা করা হয়। বর্তমান মহামারিতে আফ্রিকা ও এশিয়ার অনেক দেশেই তা ঘটছে।

বাল্যবিবাহ শিশু অধিকারের ভয়াবহ লঙ্ঘন। এটি একধরনের যৌন নিপীড়ন। বিয়ের কারণে মেয়েদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তারা পারিবারিক সহিংসতার ঝুঁকিতে থাকে এবং তাদের সব সম্ভাবনা বিকাশের পথ রুদ্ধ হয়ে পড়ে। ২০২০ সালের অক্টোবরে ইউনিসেফ প্রকাশিত ‘এন্ডিং চাইল্ড ম্যারেজ: এ প্রোফাইল অব প্রোগ্রেস ইন বাংলাদেশ’ জানাচ্ছে, দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশে বাল্যবিবাহের হার সর্বাধিক এবং বিশ্বের যে ১০ দেশে বাল্যবিবাহ সবচেয়ে বেশি হয়, সেই তালিকায় বাংলাদেশ আছে। বর্তমানে ২০-২৪ বছর বয়সী ৫১ শতাংশ নারীই বাল্যবিবাহের শিকার হয়েছেন।

বাংলাদেশে বাল্যবিবাহের ক্ষেত্রে প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসবাসরত ও দারিদ্র্যসীমার নিচে বেড়ে ওঠা মেয়েরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে আছে। যারা অন্তত ১০ বছর স্কুলে যেতে সক্ষম হয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে বাল্যবিবাহের হার কিছুটা হলেও কম। যারা ১২ বছর স্কুলে যেতে পেরেছে, তাদের মধ্যে বাল্যবিবাহের হার ৫০ ভাগ কমে গেছে। তার মানে বাল্যবিবাহ রোধে শিক্ষার প্রত্যক্ষ ভূমিকা আছে।

বাংলাদেশে দারিদ্র্য, কিশোরীদের সামাজিক নিরাপত্তার অভাব, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, আইন প্রয়োগের সীমাবদ্ধতাসহ বাল্যবিবাহের অনেক কারণ আছে। মেয়েরা যদি যৌন নিপীড়ন ও নির্যাতনের শিকার হয় অথবা কোনো সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে পরিবারের ‘মর্যাদা’ ক্ষুণ্ন হবে—এই আশঙ্কায় অনেক মা-বাবা মেয়ের বাল্যবিবাহ দেন। বাংলাদেশের অসংখ্য পুরুষও বিয়ের সময় অল্প বয়সী মেয়ে খোঁজেন। বিয়ে, সন্তান ধারণ ও পালনকে মেয়েদের জীবনের কেন্দ্রীয় বিষয় বলে মনে করে পরিবার ও সমাজ এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তারা মেয়েদের পড়াশোনা ও পেশাগত অর্জনকে গুরুত্ব দেয় না।

মহামারির কারণে বাল্যবিবাহ বেড়ে যাওয়া এবং মেয়েদের স্কুল থেকে ঝরে পড়ার কারণে দীর্ঘমেয়াদি অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে যাবে। তা প্রতিরোধে সরকার ও বেসরকারি সংস্থা, গণমাধ্যম, শিক্ষক, মা-বাবাসহ সমাজের সবাইকে নিজের দায়িত্ব পালনে গতি আনতে হবে

যেসব মেয়ে স্কুলে আছে তাদের প্রয়োজন বুঝে যথাযথ সহায়তা দিতে হবে, যাতে তারা গত দেড় বছরের পড়াশোনার ঘাটতি পূরণ করতে পারে এবং ঝরে না যায়। যে মেয়েরা এখনো স্কুলে ফিরে আসেনি, তাদের দ্রুত শনাক্ত করে যে কারণে তারা পড়াশোনা করতে পারছে না, তা দূর করার ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। এ ক্ষেত্রে শিক্ষক, স্থানীয় নেতাসহ এলাকার সবাইকে ভূমিকা রাখতে হবে। মেয়েদের পড়াশোনার ওপর জোর দিয়ে ব্যাপক প্রচারণা প্রয়োজন।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার পরও যেসব মেয়ে দারিদ্র্যের কারণে বাল্যবিবাহের ঝুঁকিতে আছে, তাদের পরিবারকে সরকার সামাজিক সুরক্ষাবলয়ের ভেতর এনে আর্থিক সহায়তা দিতে পারে। এ ক্ষেত্রে মেয়েদের পড়াশোনা করার শর্ত দিতে হবে। বিবাহিত কিশোরীদের স্কুলে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন এবং যাতে তারা দ্রুত সন্তান জন্ম না দেয়, সে জন্য প্রজনন স্বাস্থ্যসেবায় গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। মেয়েদের জীবনসংক্রান্ত যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের মতামত জানতে হবে।

শিশু আইন-২০১৩-এর আলোকে সমাজভিত্তিক শিশু সুরক্ষাব্যবস্থা জোরদার করে মেয়েদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা দরকার। বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে স্থানীয় প্রশাসন ও ইউনিয়নভিত্তিক বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ কমিটিগুলোকে কার্যকরভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করতে হবে। বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন-২০১৭-এর প্রয়োগের পাশাপাশি জন্ম ও বিয়ে নিবন্ধন নিশ্চিত করা দরকার। খুব প্রয়োজন মা–বাবার দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন, যাতে তারা নিজেদের ‘কন্যাদায়গ্রস্ত’ বলে মনে না করেন এবং মেয়েদের শিক্ষা ও পেশাগত কাজকে গুরুত্ব দেন। বাল্যবিবাহকে সামাজিকভাবে অগ্রহণযোগ্য করা জরুরি। কারণ, সমাজ মেনে নিলে আইন থাকলেও কোনো ক্ষতিকর প্রথা দূর করা অসম্ভব হয়ে যায়। এ কারণেই মেয়ের বয়স বাড়িয়ে ও এক গ্রামে বাল্যবিবাহ বন্ধ করলে পাশের গ্রামে আত্মীয়ের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে বিয়ের ঘটনা হরহামেশা ঘটে।

মহামারির কারণে বাল্যবিবাহ বেড়ে যাওয়া এবং মেয়েদের স্কুল থেকে ঝরে পড়ার কারণে দীর্ঘমেয়াদি অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে যাবে। তা প্রতিরোধে সরকার ও বেসরকারি সংস্থা, গণমাধ্যম, শিক্ষক, মা-বাবাসহ সমাজের সবাইকে নিজের দায়িত্ব পালনে গতি আনতে হবে।

সুনামগঞ্জের হাওর থেকে শুরু করে খুলনার বস্তি পর্যন্ত অনেক কিশোরীর সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হয়েছে আমার। তারা পড়াশোনা করে নানা পেশায় যোগ দিতে আগ্রহী। তাদের মতো বাংলাদেশের কত মেয়ের স্বপ্ন ভেঙে গেল বাল্যবিবাহের কারণে। এসব ভেবে যখন মনটা ভার হয়ে আছে, তখন ম্যাগসাইসাই পুরস্কার বিজয়ী বিজ্ঞানী ড. ফেরদৌসী কাদরীর এক সাক্ষাৎকার পড়ে অনুপ্রাণিত হলাম। তিনি জানিয়েছেন, ‘আমার নানির চিন্তাধারা ছিল খুব আধুনিক। তখন আমার বোনদের বিয়ের প্রস্তাব আসত। নানি এগুলোর প্রশ্রয় দিতেন না। বরং বিয়ের প্রস্তাব আসলে তিনি রেগে যেতেন। পড়তে হবে, নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে; এটাই আমাদের বলতেন সব সময়।’

বেগম রোকেয়া এবং ড. কাদরীর নানির মতো নারীর সমানাধিকারে বিশ্বাস করতে সমাজের সবার আরও কত দিন লাগবে?

লায়লা খন্দকার উন্নয়নকর্মী

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন