বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশে নারী ও কন্যাশিশুর নিরাপত্তাহীনতার ধরনও বহুবিধ। গর্ভে থাকতে মেয়েশিশুর ভ্রূণ হত্যা, গর্ভপাতে বাধ্য করা, জন্মের পর মেয়েশিশু হত্যা, অবহেলা, মানসিক–শারীরিক পীড়ন ও দুর্ব্যবহার, খাদ্য ও চিকিৎসা প্রদানে বৈষম্য প্রভৃতি যেন চিরাচরিত। বাল্যবিবাহ, পরিবার বা আশপাশের লোকজনের দ্বারা যৌন নিপীড়ন; প্রেমের নামে প্রতারণা করে অবৈধ দৈহিক সম্পর্ক স্থাপন ও গর্ভপাতে বাধ্য করা; পরিণত বয়সে যৌন নিপীড়ন, ধর্ষণ, পাচার, কর্মস্থলে পুরুষ সঙ্গী দ্বারা নিপীড়ন; বিবাহিত জীবনে স্বামী কর্তৃক ধর্ষণ, যৌতুকের জন্য নির্যাতন ও হত্যা, অবৈধ গর্ভপাত, পতিতাবৃত্তি, তালাক এবং বৃদ্ধ বা প্রবীণ বয়সে বৈধব্যের কারণে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন যেন প্রচলিত পুরুষতান্ত্রিক সমাজের সাধারণ বিষয়। তার ওপর সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট, সম্পদহীনতাসহ বিভিন্ন কারণ নারী ও কন্যাশিশুর নিরাপত্তাকে আরও বেশি ভঙ্গুর করে। ফলে কন্যাশিশু অসহায়, মানসিকভাবে বিপর্যস্ত, সামাজিকভাবে দুর্বল হয়। বাংলাদেশের নারীরা ধর্মীয় আইনের অপব্যবহারের কারণেও লিঙ্গবৈষম্যের শিকার হয়।

পুরুষতান্ত্রিক সমাজের দোর্দণ্ড প্রতাপে পুরুষেরা ভুলে যান, কন্যাশিশুরা তাঁদেরই সন্তান। তাই আজকের কন্যাশিশুকে যথাযথভাবে গড়ে তুলতে হলে শুধু আইন নয়, নির্দিষ্ট কোনো দিবস নয়, সব দিবস-ক্ষণে সব নারী-পুরুষকে মানবিক ও সচেতন থাকা প্রয়োজন। তাহলেই কন্যাশিশু আগামীর যোগ্য নাগরিক হবে।

নানা প্রতিকূলতার মধ্যেই বাংলাদেশে কন্যাশিশুরা বেড়ে ওঠে এবং সমাজ ও রাষ্ট্রের উন্নয়নে অবদান রাখে। বিবিএস খানা জরিপ অনুসারে, নারীশিক্ষায় মাধ্যমিক স্তরে ছাত্র-ছাত্রীর অনুপাত ২০১৭ সালে ৪৬ দশমিক ২: ৫৩ দশমিক ৮-এ দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে অনুপাত দাঁড়িয়েছে ৫১: ৪৯, যা লিঙ্গসমতা বিধানের কাছাকাছি। নতুন নারী উদ্যোক্তার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ বিশ্বের বিকাশমান দেশগুলোর ক্ষেত্রে সম্মানজনক অবস্থায় পৌঁছেছে।

ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম প্রণীত জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্ট ২০১৭-এ বাংলাদেশের অবস্থান দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে শীর্ষে এবং ১৪৪টি দেশের মধ্যে ৪৭তম। জেন্ডার ও বাজেট প্রতিবেদন ২০১৮-১৯–এ বর্ণিত তথ্যানুযায়ী নারী উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে সরকার প্রতিবছর গড়ে জিডিপির প্রায় ৫ শতাংশ ব্যয় করছে। নারী ও কন্যাশিশুর ওপর নির্যাতন রোধকল্পে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়, মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তর এবং জাতীয় মহিলা সংস্থায় নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ সেল গঠন করা হয়েছে। জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন পর্যায়ে নারী নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটির ব্যবস্থা করা হয়েছে। আইনজীবীর ফি ও অন্যান্য খরচ বহনে সহায়তা প্রদানের উদ্দেশ্যে জেলা ও সেশন জজের অধীন নির্যাতিত নারীদের জন্য তহবিল গঠিত হয়েছে।

নারী ও কন্যাশিশুর উন্নয়নের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও প্রিয় বাংলাদেশ আজ বিশ্বের রোলমডেল। কিন্তু বাস্তবতা হলো, নারী ও কন্যাশিশুর যথাযথ অধিকার প্রদানে সামাজিকভাবে সচেতন ও দায়বদ্ধ মানুষেরাও অনেক সময় শুধু পুরুষ বনে যান, নারী ও কন্যাশিশুর অধিকার ও বঞ্চনার বিষয়টি গুলিয়ে ফেলেন। তাঁরাও অভিযুক্ত হন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের দায়ে। গোপনে-নিভৃতে, সময়ে-সুযোগে বারবার রচিত হয় পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার বিকৃত ইতিহাস। কতিপয় ভ্রষ্ট পুরুষের প্রকাশ্য বর্বরতার কারণে নারী ও কন্যাশিশুর অধিকারগুলো সামনে আসে, ইস্যুও হয়। কিন্তু যথারীতি আবার থেমেও যায়। বাল্যবিবাহসহ নারী ও শিশু নির্যাতনের হার না কমার সূত্রও আড়ালে পড়ে যায়। পুরুষতান্ত্রিক সমাজের দোর্দণ্ড প্রতাপে পুরুষেরাও ভুলে যান, কন্যাশিশুরা তাঁদেরই সন্তান। তাই আজকের কন্যাশিশুকে যথাযথভাবে গড়ে তুলতে হলে শুধু আইন নয়, নির্দিষ্ট কোনো দিবস নয়, সব দিবস-ক্ষণে সব নারী-পুরুষকে মানবিক ও সচেতন থাকা প্রয়োজন। তাহলেই কন্যাশিশু আগামীর যোগ্য নাগরিক হবে। শুধু মা-বাবার নয়, তারা দায়িত্ব নেবে সমৃদ্ধ ও মানবিক বাংলাদেশ বিনির্মাণের।

মুহম্মদ মনিরুল হক শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক
[email protected]

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন