কমলা কি বাইডেনের ভোট বাড়াবেন

বিজ্ঞাপন
default-image

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক পার্টির সম্ভাব্য প্রার্থী জো বাইডেন তাঁর রানিং মেট হিসেবে বেছে নিয়েছেন কমলা হ্যারিসকে। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রধান দুই দলের ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে এ নিয়ে তৃতীয়বারের মতো একজন নারীকে মনোনয়ন দেওয়া হলো। কমলা হ্যারিস হচ্ছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ এবং প্রথম দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত প্রার্থী। এ মনোনয়ন ঐতিহাসিক।

ক্যালিফোর্নিয়ার সিনেটর কমলা হ্যারিস প্রেসিডেন্ট পদের জন্য দলের মনোনয়নের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অংশ নিয়েছিলেন, কিন্তু প্রাথমিক পর্যায়ের নির্বাচন শুরুর আগেই তিনি প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেন। গত মার্চের মাঝামাঝি জো বাইডেন এ ঘোষণা দেন যে তিনি একজন নারীকে তাঁর রানিং মেট হিসেবে নেবেন। সেই থেকে আলোচনা হচ্ছিল কে ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে মনোনয়ন পেতে পারেন। জো বাইডেনের প্রার্থিতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সাউথ ক্যারোলাইনার প্রাইমারির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা, তাঁর প্রার্থিতার প্রতি দেশের কৃষ্ণাঙ্গদের ব্যাপক সমর্থন এবং জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যুর পরে সারা দেশে পুলিশি নির্যাতনের বিরুদ্ধে ও নাগরিকদের সমানাধিকার বিষয়ে যে আন্দোলন ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’-এর ব্যানারে গড়ে ওঠে, তার পরিপ্রেক্ষিতে এটা মনে করা হচ্ছিল বাইডেনের রানিং মেট হবেন একজন কৃষ্ণাঙ্গ নারী।

তৃণমূলের এ আন্দোলন স্মরণ করিয়ে দিয়েছিল যে অংশগ্রহণমূলক রাজনীতির জন্য এখন এ ধরনের পদক্ষেপ কেবল জরুরি নয়, এর বিকল্প নেই। এ নিয়ে কয়েক সপ্তাহ ধরেই আলোচনা এবং বিভিন্ন ধরনের আঁচ-অনুমান চলছিল। মঙ্গলবার বিকেলে বাইডেনের নির্বাচনী প্রচার কার্যালয় থেকে কমলা হ্যারিসের নাম ঘোষণা করা হয়।

ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রার্থী নিয়ে ব্যাপক আলোচনা এবং তার ঐতিহাসিক তাৎপর্যের কথা বলা হলেও এযাবৎ করা গবেষণাগুলোতে দেখা গেছে, ভাইস প্রেসিডেন্ট মনোনয়ন অতীতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রভাব ফেলেনি। কাইল সি কপকো ও ক্রিস্টোফার জে ডেভাইন তাঁদের দ্য ভিপি অ্যাডভান্টেজ; হাউ রানিং মেটস ইনফ্লুয়েন্স হোম স্টেট ভোটিং ইন প্রেসিডেনশিয়াল ইলেকশনস গ্রন্থে দেখান যে ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রার্থীরা সব সময় নিজেদের অঙ্গরাজ্যে নিজের দলের বিজয় নিশ্চিত করেছেন এমন নয়। তবে কিছু গবেষকের মধ্যে ভিন্নমতও আছে। তাঁরা মনে করেন, চারটি নির্বাচনে নিজস্ব রাজ্যে ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রার্থীর সামান্য হলেও প্রভাব ছিল। ভোটারদের মধ্যে জরিপে দেখা গেছে, মাত্র এক–পঞ্চমাংশ ভোটারের ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রার্থীর প্রভাব ছিল ২০০০ সালে ২১ শতাংশ, ২০০৪ সালে ১৬ শতাংশ। 

জন সাইডস ও লিন ভ্যাভরিক ২০১২ সালের নির্বাচন বিষয়ে তাঁদের গ্রন্থ গ্যাম্বল-এ দেখান যে সারাহ প্যালিনকে রানিং মেট করায় রিপাবলিকান প্রার্থী জন ম্যাককেইন অতিরিক্ত সুবিধা পাননি। প্রথম নারী ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হয়েছিলেন ১৯৮৪ সালে জেরালডিন ফেরারো—ডেমোক্রেটিক দলের ওয়াল্টার মোন্ডেলের সঙ্গে। তাঁরা বিজয়ী হননি। নারী হওয়ার কারণে তাঁরা নারী ভোটারদের অতিরিক্ত সমর্থন পেয়েছেন তা নয়। ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রার্থীরা বিশেষ কোনো বয়সের ভোটারদের আকর্ষণ করতে পারেন, এমন উদাহরণও নেই। 

ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রার্থী কোনো বিশেষ বর্ণের ভোটারদের কাছে অতিরিক্ত আবেদন রাখেন কি না, তা বোঝার সুযোগ হয়নি। কেননা, এখন পর্যন্ত ভিন্ন বর্ণের কেউ এ পদের প্রার্থী হননি। কমলা হ্যারিসকে মনোনয়নে এ বিবেচনা কাজ করেছে। ২০১৬ সালের নির্বাচনে উইসকনসিন, পেনসিলভানিয়া ও মিশিগানে কৃষ্ণাঙ্গদের এক বড় অংশের ভোট না দেওয়া হিলারি ক্লিনটনের পরাজয়ের একটি কারণ। 

অতীতে ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রার্থীরা প্রেসিডেন্টকে সাহায্য করেননি বলে এবারও তাই হবে, তা মনে করার কারণ নেই। এ নির্বাচনে ভিন্ন রকম উদাহরণ সৃষ্টির সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সমাজ ও রাজনীতি বড় ধরনের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ট্রাম্পের শাসনকাল ও করোনাভাইরাসের সময়ে ইতিহাস ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দেবে কি না, তা–ও প্রশ্নসাপেক্ষ। 

ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রার্থীরা প্রেসিডেন্ট প্রার্থীদের বিজয়ে সরাসরি সাহায্য করতে সক্ষম হন না, তা সত্ত্বেও প্রতিটি নির্বাচনের সময়েই এ বিষয়ে এত আলোচনা হয় কেন? এর কারণ হচ্ছে ভোটাররা এ সিদ্ধান্তকে দেখেন প্রেসিডেন্ট প্রার্থীর বিচার-বিবেচনা করার যোগ্যতার একটি মাপকাঠি হিসেবে। তিনি প্রেসিডেন্ট হিসেবে সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হবেন কি না এবং সেই সিদ্ধান্ত কী বিবেচনা দিয়ে নেবেন, ভাইস প্রেসিডেন্ট মনোনয়নের মধ্য দিয়ে তাই প্রতিফলিত হয়।

কমলা হ্যারিসকে বেছে নেওয়ার মাধ্যমে বাইডেন স্পষ্টত দেখাতে চেয়েছেন যে তিনি এমন একজনকে পছন্দ করলেন যাঁর ফেডারেল সরকার বিষয়ে সুস্পষ্ট ধারণা এবং আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগের অভিজ্ঞতা আছে এবং যিনি মধ্যপন্থী। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যেভাবে ডেমোক্র্যাটদের আইন ও বিচারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল নয় বলে দেখাতে চাইছেন, বাইডেন সেটা হতে দিতে নারাজ। কমলা হ্যারিস ক্যালিফোর্নিয়ার ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির দায়িত্ব পালন করেছেন এবং ওই রাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেল ছিলেন। 

ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা কমলা হ্যারিসকে যেমন সুবিধা দেবে, তেমনি দলের ভেতরকার বামপন্থীদের কাছে প্রশ্নেরও মুখোমুখি করবে। দেশের গোটা ফৌজদারি ব্যবস্থা নিয়ে ডেমোক্র্যাট দলের বামপন্থীদের সংগত কারণেই সমালোচনা আছে। কাঠামোগত কারণে এ ব্যবস্থা কৃষ্ণাঙ্গ ও অন্য সংখ্যালঘুদের প্রতি সুবিচার করে না। ক্যালিফোর্নিয়ার অ্যাটর্নি জেনারেল থাকার সময় হ্যারিসের কিছু সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন আছে, দলের উদার বামপন্থীরা সেই বিষয়ে তাঁর ব্যাখ্যা আশা করেন। 

৭৭ বছর বয়সী জো বাইডেন একাধিকবার নিজেকে ‘ট্রানজিশনাল ক্যান্ডিডেট’ বা ‘রূপান্তরকালীন প্রার্থী’ বলে বর্ণনা করায় ভবিষ্যতের বিবেচনায় কমলা হ্যারিস যে আরও বেশি নিরীক্ষার মুখোমুখি হবেন, তা অনুমেয়।

আলী রীয়াজ যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির সরকার ও রাজনীতি বিভাগের ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন