বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
কমিশনসহ গোটা নির্বাচনব্যবস্থা আস্থার সংকটে পড়েছে। আর সে সংকট হচ্ছে গভীর থেকে গভীরতর। নির্বাচন নামের ব্যবস্থাটির সঙ্গে এর মূল অংশীজন ভোটারদের সংযোগ ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হচ্ছে। ফলে গণতান্ত্রিক সমাজের প্রথম ধাপ নির্বাচনই এখন বড় প্রশ্নের মুখোমুখি।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে প্রতিনিয়ত আমরা বহু আলোচনা শুনি। এগুলো অমূলকও নয়। তবে আমাদের প্রজন্মটি মুক্তিযুদ্ধের ইঙ্গিত পেতে শুরু করি ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা প্রস্তাব পেশের পর। এর প্রথম দফাটাই ছিল সর্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে সংসদীয় পদ্ধতির সরকারব্যবস্থা। ছয় দফা কর্মসূচি ক্রমে জাতিকে মুক্তিযুদ্ধের দিকে টেনে নেয়। আর এর প্রথম দফাটি অবশ্যই মুক্তিযুদ্ধের মৌলিক চেতনা বললে অত্যুক্তি হবে না। অবশ্য সেদিকে নজর রেখেই প্রণীত হয়েছে আমাদের সংবিধান। কিন্তু সময়ে সময়ে এর প্রয়োগে ঘটে চলেছে বিকৃতি। দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন পক্ষপাতদুষ্ট হয়, এ অভিযোগে আওয়ামী লীগের লাগাতার আন্দোলনে বিএনপি ক্ষমতাচ্যুত হয়। অবশ্য ক্ষমতা ছাড়ার আগে তারা আন্দোলনের দাবির প্রতি নজর দিয়ে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার বিধান করে যায়।

আবার সেই তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থাও ২০০৬ সালে তাদের দ্বারা বিতর্কিত হয়। একজন বিশেষ ব্যক্তিকে প্রধান উপদেষ্টা করার জেদাজেদি নিয়ে দেশে নিয়ন্ত্রণহীন অরাজকতা শুরু হয়। দেশে আসে নন্দিত ও নিন্দিত এক-এগারো। চালু হয় ভিন্নধর্মী আরেকটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার। সে সরকারের সময়ে গঠিত নির্বাচন কমিশন দেশে প্রথমবারের মতো সব ভোটারের ছবিযুক্ত ভোটার তালিকা তৈরি করে। দেওয়া হয় ভোটার পরিচয়পত্র। ২০০৮ সালের ডিসেম্বরের শেষে এক নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট বড় ধরনের জয়লাভ করে। ২০০৯ সালের শুরুতে তারা গঠন করে সরকার। আর এ সরকারের সময়কালেই সুপ্রিম কোর্টের একটি বিভক্ত রায়কে ভিত্তি করে সংসদের মাধ্যমে বাতিল করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা। এরপর ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিএনপির বর্জনের মুখে অধিকাংশ সাংসদ নির্বাচিত হন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। অন্য নির্বাচনগুলোতেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল অনেকটাই লোকদেখানো।

আর এর পরের দফায় ২০১৮ সালের নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল সব দল। কিন্তু সরকারি দল তাদের বিরোধীদের কোনো ছাড় দিতে প্রস্তুত ছিল না। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে অবজ্ঞা করে তারা বিরোধী দলের প্রার্থীদের কোনো ধরনের প্রচার-প্রচারণাই করতে দেয়নি। জেলে পুরেছে কিংবা এলাকাছাড়া করেছে সরকারবিরোধী প্রার্থীদের নেতৃস্থানীয় কর্মীদের। এজেন্ট দেওয়ার সুযোগও পাননি তাঁরা। এমনকি সরকার সমর্থকদেরও এখানে ভোট দেওয়ার প্রয়োজন হয়নি। এর দায়িত্ব নিয়ে নেয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয় প্রশাসন। এ বক্তব্য বহুল আলোচিত ও সবার জানা। মধ্যরাতের নির্বাচন বলেও এর একটি পরিচিতি রয়েছে।

ভোটারবিহীন এ ধরনের একটি নির্বাচন করেও তারা সরকার চালাচ্ছে। এর প্রধান কারণ বিরোধী দলের কর্মী-সমর্থকেরা অনেকটাই নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছেন। ধারণা করা হয়, কেউ কেউ তঁাদের আগের সরকারের সময়ে অর্জিত বিপুল অর্থ আরাম-আয়েশে ঝুঁকিমুক্তভাবে ভোগে আগ্রহী। এমন অবস্থায় তাঁদের নেতৃত্ব দিয়ে একটি আন্দোলন গড়ে তোলার পরিবেশও অনুপস্থিত। এ বিষয়ে সরকার সফল হলেও তাদের রাজনৈতিক হাতিয়ার দুর্বল হয়ে পড়ছে। এ ধরনের নির্বাচনী বিজয়ে যারা কারিগরের ভূমিকা পালন করেছে বলে ব্যাপকভাবে ধারণা করা হয়, সেই প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা নিজেদের ত্রাতা হিসেবে বিবেচনা করছেন। ফলে এ ব্যবস্থায় নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের আইনি বৈধতা যতই থাকুক, রাজনৈতিক ভিত একেবারেই দুর্বল। তাই প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা তাঁদের তাচ্ছিল্য করছেন বলে তাঁরাই সংসদের মতো স্থানে অভিযোগ করেন।

শুধু দেশের মাটিতে নয়, বিদেশেও, বিশেষত পাশ্চাত্যে আমরা ভাবমূর্তি-সংকটে আছি। এগুলো কারও অজানা থাকার কথা নয় যে আমাদের মন্ত্রী পর্যায়ের ব্যক্তিরাও ওই সব দেশে সম্মানের সঙ্গে আদৃত হন না।

এ ধরনের একটি শাসনব্যবস্থার উপকারিতা নিয়ে কেউ কেউ বলে থাকেন। তাঁদের মতে ধারাবাহিক স্থিতিশীলতা উন্নয়ন ও অগ্রগতির জন্য সহায়ক। গত ১৩ বছরে দেশে অনেক অগ্রগতি হয়েছে, এমনটাই বলছেন তাঁরা। অবকাঠামোসহ সামাজিক খাতের অগ্রগতিগুলো অস্বীকার করার মতো নয়, বরং প্রশংসনীয় বলতে হবে। তবে তার জন্য জনগণকে বাদ দিয়ে এ ধরনের স্থিতিশীলতা কতটুকু উপযোগী, সে প্রশ্নও অনেকে করেন। স্বাধীন ভারতে জওহরলাল নেহরু টানা ১৭ বছর শাসন করেছেন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায়। তাঁর মেয়ে ইন্দিরা গান্ধী মাঝের দুই বছর বাদ দিয়ে শাসন করেছেন প্রায় ১৫ বছর। তিনি একপর্যায়ে এ ধরনের বিভ্রান্তির আশ্রয় নিয়েছিলেন। আর এর শাস্তিও ভারতবাসী তাঁকে দিয়েছিল। তিনি নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন একপর্যায়ে। আবার ভারতবাসী তাঁকে মাথায় ওঠায়। আমৃত্যু ছিলেন ক্ষমতায়।

আওয়ামী লীগ বর্তমানে রাজনৈতিক দল হিসেবে একরকম অপ্রতিদ্বন্দ্বী। তবে জনগণের কাছে তাদের প্রকৃত গ্রহণযোগ্যতা নির্বাচনের মাধ্যমেই যাচাই করতে হবে। তারা তো আগেও ১৯৯৬ সালের জুন এবং ২০০৮ সালে ভোট পেয়েই সরকার গঠন করেছিল। জনসম্পর্কহীন নির্বাচন দলটিকে ক্লীব করে ফেলতে পারে। এমন অবস্থায় যাঁদের সাহায্যে এমনটা ঘটানো হয়, তাঁরা হয়ে পড়েন আরও বেপরোয়া। বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গুমের মতো চরম বিতর্কিত ঘটনাও এসব সময়েই হয়। শুধু দেশের মাটিতে নয়, বিদেশেও, বিশেষত পাশ্চাত্যে আমরা ভাবমূর্তি-সংকটে আছি। এগুলো কারও অজানা থাকার কথা নয় যে আমাদের মন্ত্রী পর্যায়ের ব্যক্তিরাও ওই সব দেশে সম্মানের সঙ্গে আদৃত হন না। এটা অবশ্যই তাঁদের ব্যক্তিগত কোনো অযোগ্যতা নয়। দেশের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এর প্রতিনিধিদের মর্যাদাকে খাটো করে ফেলছে।

এসব দিক দেখা ও বিবেচনা করা মূলত সরকারের কাজ। আমাদের এককেন্দ্রিক সরকারব্যবস্থায় রাষ্ট্রক্ষমতাও একই বৃত্তে বন্দী। আর এটাকে আরও দৃঢ় করতে অতি সক্রিয় রয়েছেন গণবিচ্ছিন্ন, রাজনীতির বাইরে থেকে আসা গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন ব্যক্তিরা। নির্বাচনকে আমি কোনো বিশেষণ দিয়ে বিশেষায়িত করি না। কারণ, এ শব্দটার মধ্যেই রয়েছে জনগণের অংশগ্রহণমূলক, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ প্রচার-প্রচারণা, ভোট গ্রহণ, গণনা ও ফলাফল প্রকাশ ইত্যাদি। সে নির্বাচনে সরকারের সদিচ্ছাই সবচেয়ে বড় নিয়ামক। জাতির সর্বতো বিকাশের জন্য এ ধরনের নির্বাচন অতি প্রয়োজন। এর অনুপস্থিতিতে বিভিন্ন ধরনের সংকট প্রকট হয়ে উঠছে। নির্বাচিত নেতৃত্বের সামনে অন্য দেশের প্রতিনিধিরাও আমাদের স্বার্থের প্রতিকূলে বক্তব্য দিতে পারবেন না। আর এ ধরনের দুর্বলতার জন্য রোহিঙ্গা সমস্যার মতো বিষয় নিয়ে জাতিসংঘে পশ্চিমা বিশ্ব যখন সোচ্চার, ভোট দেয় আমাদের পক্ষে, তখন চীন ও রাশিয়া একত্রে ভেটো দেয়। ভারত থাকে ভোটদানে বিরত। তাই সব কথার শেষ কথা—নির্বাচন কমিশন অবশ্যই গঠন করতে হবে। তবে এ কমিশনের উদ্দেশ্যটা যেন হয় দেশে একটি প্রকৃত নির্বাচন পরিচালনা, সেটার দায়িত্ব অনেকটাই সরকারের।

আলী ইমাম মজুমদার সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব

[email protected]

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন