default-image

সর্বনাশা করোনাভাইরাস মানুষকে মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে এটি যেমন সত্য, তার চেয়ে বেশি সত্য বিমানবিকীকরণের ভয়ংকর পরিণতি। ইতিমধ্যে ২৩ হাজার মানুষের জীবন কেড়ে নিয়েছে এই ভাইরাস। ১৭৫টি দেশে পাঁচ লাখের বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়েছে। তার চেয়েও উদ্বেগজনক হলো বিশ্বব্যবস্থাটি ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। জাতিসংঘ বলেছে, মানবজাতির জন্য বড় হুমকি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে, মহামারি।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় অনেক দেশ সম্পূর্ণ লকডাউন ঘোষণা করেছে। কোনো কোনো দেশ আংশিক। তাতেও অবস্থার উন্নতি কতটা হবে, বলা কঠিন। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, যেসব দেশ প্রাথমিক ধাক্কা কাটিয়ে উঠেছে, সেসব দেশে দ্বিতীয় দফা আক্রমণ হতে পারে। আমাদের আপাতত সান্ত্বনা হলো যে ১৫০টি দেশে ১০০ জনের কম আক্রান্ত হয়েছে, তার মধ্যে বাংলাদেশ আছে। এখনো আক্রান্তের সংখ্যা ৫০ পার হয়নি।

 ২৬ মার্চ থেকে বাংলাদেশেও অঘোষিত লকডাউন চলছে। সড়ক, ট্রেন, নৌযোগাযোগ বন্ধ। ছুটি ঘোষণার পর লাখ লাখ মানুষ ঢাকা ছেড়েছে। বিশেষ করে খেটে খাওয়া মানুষ, যঁারা দিনমজুরি করতেন, যাঁরা রিকশা–বেবিট্যাক্সি চালাতেন, রাইড শেয়ার করতেন, ফুটপাতে হকারি করতেন, ছোট দোকান বা রেস্তোরাঁয় কাজ করতেন, তাঁরা হঠাৎ করে বেকার হয়ে পড়েছেন। অনেকের ঢাকা শহরে থাকার জায়গাও নেই। টার্মিনাল, ফুটপাতে থাকতেন। তঁারা নিরাশ্রয় ও নিরুপায় হয়ে গেলেন। যে ঢাকা শহরে দিনরাত ভয়াবহ যানজট লেগে থাকত, সেই ঢাকা শহর এখন ফাঁকা। যাঁরা আছেন, তাঁরাও কার্যত ‘গৃহবন্দী’। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কেউ বাইরে বেরোচ্ছেন না।

 সরকার ১০ দিনের ছুটি ঘোষণা করেছে। এরপরও যদি পরিস্থিতির উন্নতি না হয়? মানুষ কত দিন ঘরে বন্দী থাকবে? লকডাউন মানে শিল্পকারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্য সবকিছু বন্ধ থাকা। করোনাভাইরাস বাংলাদেশের মতো দুর্বল অর্থনীতির দেশকে গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দেবে সন্দেহ নেই। দারিদ্র্য, বেকারত্ব, অপুষ্টির মাত্রা আরও বাড়বে। যেসব দেশে আমরা রপ্তানি করি, সেসব দেশ রপ্তানি বন্ধ করে দিলে কিংবা যেসব দেশ থেকে আমরা শিল্পের কাঁচামাল নিয়ে আসি, তারা রপ্তানি করতে না পারলে কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে যাবে। কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া মানে নতুন করে বেকার সৃষ্টি হবে। জিনিসপত্রের দাম বাড়বে।

বলা হয় যে স্বাভাবিক অবস্থায় মানুষের মধ্যে যে মানবিকতা বোধ থাকে, দুর্যোগ বা সংকটের সময় সেটি লোপ পায়। মানুষের মধ্যে আরও বেশি বিচ্ছিন্নতাবোধ তৈরি হয়। মানুষ অন্যকে ঠকিয়ে নিজে বাড়তি সুবিধা নিতে চায়। আবার মুক্তিযুদ্ধের সময় আমরা ভিন্ন চিত্রও দেখেছি। সে সময় মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অপরকে সহায়তা করেছে। মুক্তিযোদ্ধাকে বাড়িতে আশ্রয় দেওয়ার কারণে অনেকে পাকিস্তানিদের হাতে নিগৃহীত হয়েছেন। নিহত হয়েছেন।

১৯৮৮ সালের বন্যার সময়ও বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষ বন্যাদুর্গতদের সহায়তায় এগিয়ে এসেছিল। দুর্যোগের সময়ই সত্যিকার মানবিকতার পরীক্ষা হয়। এবার করোনাকালের শুরুতে একশ্রেণির ব্যবসায়ী বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে মাস্ক, হ্যান্ড স্যানিটাইজার, গ্লাভস প্রভৃতির দাম বাড়িয়ে দিয়েছিল। ওষুধেরও সংকট তৈরি হয়েছিল। এ সময় আমরা লক্ষ করলাম সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতি তাকিয়ে না থেকে অনেক ব্যক্তি, সংগঠন সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি এগিয়ে এসেছে ছাত্র-যুবকেরাও।

এই সংকটকালে যখন দেখি আমাদের চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়েও মানুষকে চিকিৎসাসেবা দিচ্ছেন, তখন আশা হারাই না। দুজন চিকিৎসক রোগীর সেবা দিতে গিয়ে করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। কয়েকজন কোয়ারেন্টিনে আছেন। অনেক সংগঠন নিজ উদ্যোগে হাতের গ্লাভস, মাস্ক, হ্যান্ড স্যানিটাইজার ইত্যাদি তৈরি করে দিচ্ছে। গতকাল ছাত্র ইউনিয়নের এক নেতা জানালেন, গত ১০ দিনে তঁারা ৩২ হাজার হ্যান্ড স্যানিটাইজার তৈরি করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে পাঠিয়েছেন। সত্যিই প্রশংসনীয় কাজ। একইভাবে ছাত্রলীগ, ছাত্র ফেডারেশন, ছাত্র মৈত্রী, ছাত্র সংহতি, যুব ইউনিয়নের নেতা-কর্মীরাও মাস্ক, হ্যান্ড স্যানিটাইজার তৈরির কাজে যুক্ত হয়েছেন। পরিচ্ছন্নতার কাজে নেমেছেন বাসদের নেতা-কর্মীরা। বুয়েটের প্রকৌশলীরা চিকিৎসকদের পিপিই তৈরিতে সহায়তা করেছেন। চীনে পড়ুয়া এক বাংলাদেশি ছাত্র তাঁর বৃত্তির টাকা বাঁচিয়ে ১০০ রোগ নির্ণয় কিট কিনে দেশে পাঠিয়েছেন। এই সংবাদ আমাদের যেমন উজ্জীবিত করে, তেমনি তরুণদের প্রতি আস্থা বাড়ায়। এই তরুণেরা কখনো হারতে পারেন না। একই সঙ্গে প্রশ্ন আসে, আমরা কী করছি। কী করছেন বড় রাজনৈতিক দলের নেতারা?

নড়াইলের সাংসদ ও ক্রিকেটার মাশরাফি বিন মুর্তজা নিজের অর্থায়নে ১ হাজার ২০০ দরিদ্র পরিবারকে খাদ্য সহায়তা করার ঘোষণা দিয়েছেন। জাতীয় সংসদে ৩৫০ জন সাংসদ আছেন, তাঁরা প্রত্যেকে এগিয়ে এলে লাখ লাখ দুস্থ ও গরিব পরিবার উপকৃত হবে। সাবেক ক্রিকেটার শাহরিয়ার আলম ওরফে তূর্যও যশোরের সাংস্কৃতিক কর্মীদের করোনা প্রতিরোধ কর্মসূচিতে ২০০ মাস্ক দেওয়ার কথা বলেছেন।

 আমরা যখন শুনি ঢাকার মিরপুর, জুরাইন ও সিলেটের বেশ কয়েকটি বাড়ির মালিক ঘোষণা দিয়েছেন, করোনার কারণে তাঁরা ভাড়াটেদের এক মাসের ভাড়া মওকুফ করে দেবেন, তখন তাঁদের প্রতি সমীহ বেড়ে যায়। বাড়ির মালিকেরা আগে কখনো এভাবে ভাড়া ছাড় দেননি। আমরা আশান্বিত হই যখন দেখতে পাই ওষুধ কোম্পানিগুলো বাজারে ওষুধের সরবরাহ নিশ্চিত করতে ঝুঁকি নিয়েও কারখানা খোলা রাখে; গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র স্বল্প মূল্যে রোগ নির্ণয়ের কিট তৈরি করার উদ্যোগ নেয়, ক্রিকেটাররা গরিব মানুষদের সহায়তা তহবিল করে। দুস্থ শিল্পীদের সহায়তায় এগিয়ে এসেছে শিল্পীসমাজও। যখন বাড়ির গৃহবধূরা, শিক্ষকেরা, ছোট দোকানদারেরা টেলিফোন করে জানতে চান তাঁরা শ্রমজীবী গরিব মানুষকে সহায়তা করতে চান, কোথায় কীভাবে করবেন, তখন মনে হয় এ সংকট কাটবেই।

 করোনাকালে মানবিকতার জয় হোক।

সোহরাব হাসান: প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক ও কবি
sohrabhassan55@gmail.com

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0