default-image

মেয়েদের জন্য ‘বাড়ি থেকে কাজ’ নতুন এক ধারণা বটে, তবে ‘বাড়ির কাজ’ বিষয়টা প্রাচীনকালেও যা ছিল, এখনো তাই। করোনা নিয়ে সংকটের এই কালে মেয়েদের জন্য বস্তুত বাড়ির যাবতীয় কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাড়ি থেকে কাজও। বাড়ি থেকে কাজ করবে বলে তারা ঘরের কাজকে এক দিনের জন্যও বিদায় বলতে পারেনি।

মেয়েদের বাড়ির কাজ হচ্ছে সেই কাজ যা যুগের পর যুগ আমৃত্যু তারা করে যাচ্ছে, তবু তাকে উৎপাদনশীল খাতের আওতায় আনতে পারেনি। মার্কিন অর্থনীতিবিদেরা অবশ্য ২০১৯ সালে হিসেব করে বের করেছিলেন, শুধু সন্তান উৎপাদনে নারী ওই বছর যে পরিমাণ শ্রম নিয়োগ করেছিল তার পরিমাণ ১০.৯ ট্রিলিয়ন ডলার। তার সঙ্গে তুলনা করে তারা এ-ও মনে করিয়ে দিয়েছিলেন যে, পৃথিবীর দশটি সবচেয়ে বিখ্যাত ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ২০১৮ সালে একত্রিতভাবে যা আয় করেছিল, সন্তান উৎপাদনে নারীর শ্রমের মূল্যটি তার চেয়ে বড়। অথচ বাস্তবতা এই যে সন্তান উৎপাদন তো নস্যি ব্যাপার, অহর্নিশি কাজ করেও দাপ্তরিক কাজে নিয়োজিত না হলে নারী নিজেও ‘কাজ করেন কি না’ প্রশ্নের উত্তরে ‘কাজ করি না’ বলতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন।

সামাজিক নিয়মানুযায়ী, উদয়াস্ত সংসারের প্রতিটি প্রাণীর জন্য নারীর অক্লান্ত ছোটাছুটি যেন পরিবারের সদস্যদের এমনিতেই পাওনা। যেন এই সেবা পাবে বলেই একজন দায়িত্বশীল নারীকে ঘিরে একটি সফল পরিবার গড়ে ওঠে যার প্রতিদানে তাকে কিছু দিতে হয় না। বরং বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তার জীবনের যাবতীয় সম্ভাবনা আর সময় কেড়ে নেওয়া হয়। প্রতিদানে, ‘মাতৃমূর্তি’ কিংবা ‘নিষ্ঠাবান স্ত্রী’-এর তকমায় নারী খুশি থাকে। কিন্তু সেসব স্বাভাবিক সময়ের জানা কথা। এখন এই করোনাকালে যখন বাড়িতে অন্তরীণ থাকার ব্যবস্থা হলো, সংসারের যে মেয়েটি অফিসে সাধারণ থেকে শুরু করে কোনো বিশেষ দায়িত্বপ্রাপ্ত সে তার কাজের জায়গা থেকে সরে আসতে পারে না। অন্যদিকে বাড়ির কাজ থেকেও তার এক দিনের জন্য ছুটি নেই। বেশির ভাগ বাড়িতে সাংসারিক সাহায্যের জন্য নিয়োজিত কর্মীকেও দূরে রাখতে হচ্ছে সামাজিক দূরত্বের কথা ভেবে। এই সমস্ত পরিস্থিতি বিবেচনায় সংসারে নারী এখন বহুবিধ কাজে নিয়োজিত। সময়টি তার জন্য যতটা প্রলম্বিত হচ্ছে, উতরানো ততই কঠিন হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

এই ব্যবস্থা হয়তো অনেকের ক্ষেত্রে অত্যন্ত ইতিবাচক অনেক দিক দিয়ে। ভারী দায়িত্বের বোঝা এবং সংসারের খুঁটিনাটি বিষয়ের চিন্তা মাথায় নিয়ে প্রতিদিন ভিড় ঠেলে, রাস্তায় জীবনের প্রচুর ঘণ্টা উড়িয়ে দিয়ে একদিকে ক্লান্ত শরীরে অফিস করা, অন্যদিকে ততোধিক ক্লান্ত শরীরে ফিরে এসে রান্না, ঘরদোর পরিষ্কার, বাচ্চা সামলানোর মতো কাজে নিয়োজিত হওয়ার জায়গায় অন্তত প্রতিদিন তৈরি হয়ে বেরোনোর ধকল কমেছে। বহুকাল হয়তো এত শত চাপে বারান্দার গ্রিল ধরে দাঁড়ানো হয়নি, ভালোমতো তাকানো হয়নি বেয়ে ওঠা ছোট্ট নীল অপরাজিতার দিকে। এখন সেটুকু অন্তত হচ্ছে। এটুকুতেই খুশি অনেক মেয়ে। এই যেন বহুকাল পরে পরম প্রাপ্তি!

তবে একটি বিষয় ছিল লক্ষ্য করার মতো, আগে অফিসের উদ্দেশে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলে তাকে আর প্রতি মুহূর্তে সংসারের ঝুট ঝামেলা পোহাতে হতো না। এখন অবস্থা অন্যরকম। এখন সে অফিসেও আছে আবার বাড়িতেও আছে একই সঙ্গে, একই সময়ে। বাড়ির কনিষ্ঠ সদস্য মানতে চাচ্ছে না যে মা তার বায়না মেটানোর জন্য বাড়িতে বসে নেই, সঙ্গী অনেক সময় মনোযোগ দাবি করছেন, বয়স্ক সদস্য কখনো অবহেলিত বোধ করছেন। আগে যে মেয়েটি বাড়ি থেকে বেরোলে তার মাথায় থাকত সিংহভাগ অফিসের কাজের চিন্তা, এখন ক্রমাগত কাজে বিরতি দিয়ে তাকে এর-ওর দাবি মেটাতে হচ্ছে। এভাবে বেশির ভাগ সংসারে নারী যেন সত্যিকারের দুর্গা হয়ে উঠতে আর দেরি নেই।

পরিচিত কয়েকজনের সঙ্গে প্রায়ই করোনাকালের জীবন নিয়ে কথা হয়। অফিসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাও ভেবে নিচ্ছেন বাড়িতে থাকার কারণে কর্মীর হাতে প্রচুর সময় তাই বাড়তি কাজের বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছেন। বাস্তবতা হলো, ওদিকে অফিসের জুম মিটিং শুরু হতে যাচ্ছে, এদিকে বাচ্চা তারস্বরে কাঁদছে, তখনই তার মায়ের আদর লাগবে বা মায়ের হাত ছাড়া খাবে না। আগে বাচ্চা মাকে বাড়িতে যেটুকু পেত নিজের করে পেত, নির্দিষ্ট সময়ে তার সুখে-দুঃখে মায়ের উপস্থিতি স্বাভাবিক ছিল। এখন মা বাড়িতেই আছে কিন্তু তাকে উপেক্ষা করে হয়তোবা দরজা আটকে অফিসের কাজ করছে, এ কী করে মেনে নেওয়া যায়! তারপর অফিসের মিটিং করতে করতেই রান্নাঘরে ঢুঁ মারা, তরকারির লবণ দেখা কী চুলোর আগুন কমিয়ে দেওয়া, কেউ ডাকছে শুনে তার আহ্বানে সাড়া দেওয়া, কলিং বেল বাজছে শুনে দরজায় ছুটে যাওয়া, তার ওপর সারা দিন বাড়ির সদস্যদের ভাইরাস-সংক্রমণ থেকে বাঁচানোর যুদ্ধ তো আছেই।

আসলে সত্যি কথা বলতে কী, মেয়েদের অফিসের কাজের সময়ে অন্তত বাড়ির আটপৌরে জীবনটা উটকো ঝামেলার মতো প্রতি মুহূর্তে ঢুকে পড়েনি কখনো। অনেকে নিজের মতো করে কাজের সময়সূচি তৈরি করছেন যেন ঘরের কাজ তাতে অপ্রত্যাশিত বাগড়া না বাজায়। কিন্তু সেই সময়-সুযোগ বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ঠেকছে সন্তান বা বাড়ির অন্য সদস্যের ঘুমের পর। তাই নির্ঘুম রাত কাটানোর ফলে মেয়েদের শারীরিক নানান সমস্যাও দেখা দিচ্ছে।

বাড়ির ছোট্ট সদস্যরা শুধু নারীর দাপ্তরিক ব্যস্ততা বোঝে না, তা নয়। অনেক ক্ষেত্রে বড়রাও বুঝতে অপারগ। পরিচিত একজনের বয়স্কা আত্মীয় একই বিল্ডিঙের ওপরের তলায় থাকেন। লকডাউনে একাকী থাকার কারণে প্রতিদিন দুপুরের পরই তিনি চলে আসেন গল্প করতে। বয়স্কা আত্মীয়কে মুখের ওপরে অনেক সময় বলে দেওয়াও যায় না যে ওটা তার অফিসের কাজের সময়। মেয়েরা বহু মানুষের মন জুগিয়ে চলতে চলতে আজ যেন একসঙ্গে প্রত্যেকের সামনে প্রতি মুহূর্তে একাধারে উপস্থিত। এখন কেবল সেই বাল্যকালে শোনা গল্পের মতো মাকড়সার শরীরে আটকানো রশিতে চতুর্দিক থেকে টান পড়ছে। তাই পরিচিত প্রায় মেয়েরই গলায় একই কথা শুনতে পাই আজকাল কাজ তো আর শেষ হয় না!

বাড়ি আর অফিস মিলেমিশে এ যেন অনন্ত কাজের বোঝা। তবে মানুষমাত্রেরই যেমন পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার অদ্ভুত ক্ষমতা থাকে, নারীও নিশ্চয় একদিন নিজের মতো করে গুছিয়ে নিতে পারবে, যতটুকু প্রয়োজন শুধু ততটুকুই করবে আর নজর দেবে নিজের প্রতি, নিজের ছোট ছোট আনন্দকে সম্মান করতে শিখবে, প্রশান্তি পেতে অহেতুক অন্যের জন্য জীবন উৎসর্গ করার চেতনা থেকেও বেরিয়ে আসবে। তবে তার আগে তাকে করোনাকালের এই দমবন্ধ সময়টাও পার করতে হবে যখন কিনা সারা পৃথিবীতে বাড়ির ভিতরে নারীর ওপরে অত্যাচার তীব্রভাবে বেড়ে গেছে। উন্নত দেশগুলোতে পুলিশের হাতে অন্য সমস্ত অপরাধকে ছাপিয়ে নারীর ওপরে অত্যাচারের তালিকা দীর্ঘ হচ্ছে। তাই করোনাকালে বাড়িতে বন্দিত্ব এবং পরবর্তী কালের পরিবর্তিত অজানা পরিবেশ নারীর জন্য, বিশেষ করে দাপ্তরিক কাজে নিয়োজিত নারীর জন্য বিশেষ চ্যালেঞ্জ হয়ে আসবে।

আফসানা বেগম: কথাসাহিত্যিক

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0