বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

একপর্যায়ে চীন বিশ্বকে জানায়, ভাইরাসটি আটকানোর ক্ষেত্রে বড্ড দেরি হয়ে গেছে। এরপরও সিপিসির শিক্ষা হয়নি। এই মহামারির পর নতুন আরও মহামারির ধাক্কা সামাল দেওয়ার জন্য ভালোভাবে বোঝা দরকার ভাইরাসটি কি প্রাকৃতিকভাবে জন্ম নিয়েছে, নাকি সেটি কোনো গবেষণাগার থেকে দুর্ঘটনাবশত বেরিয়ে এসেছে। কিন্তু এটি খতিয়ে দেখার জন্য নিরপেক্ষ তদন্তে সিপিসি প্রথম থেকেই বাধা দিয়ে আসছে।

সিপিসি প্রথমে একটি ‘তদন্ত’ অনুমোদন করেছিল। চীনের উদ্যোগেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সঙ্গে সিপিসি ‘যৌথ গবেষণা’ শুরু করেছিল। কিন্তু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক তেদরোস আধানোম গ্রেব্রেয়াসুস সম্প্রতি গবেষণার দ্বিতীয় পর্যায়ে চীনের সি-ফুড মার্কেট এবং গবেষণাগারে, বিশেষ করে উহান শহরের অণুজীব গবেষণাগার উহান ইনস্টিটিউট অব ভাইরোলজিতে (ডব্লিউআইভি) গবেষণাসংক্রান্ত দলকে তদন্তের জন্য পাঠানোর প্রস্তাব করলেন, ঠিক তখন চীন সে প্রস্তাবে বেঁকে বসল। যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ঘোষণা করলেন কোভিড-১৯–এর উৎসের খোঁজে একটি নতুন গোয়েন্দা অনুসন্ধানের ঘোষণা দিলেন, চীনের নেতারা আমেরিকার এই অনুসন্ধানকে ‘উৎস সন্ধানের রাজনীতিকরণ’ বলে আখ্যা দিলেন এবং এর নিন্দা জানালেন।

কোভিড-১৯–এর উৎপত্তি যে ডব্লিউআইভি থেকেই হয়েছে, তা কোনোভাবে প্রমাণিত হোক অথবা উহানে করোনা ছড়ানোর পর চীনের তৈরি করা উপাত্তভিত্তি ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র কোনো কৃতিত্ব নিতে পারুক, তা চীন কোনোভাবে চায় না।

এখন কথা হলো, চীনের সহযোগিতা ছাড়া কোভিড-১৯–এর আদি উৎস খুঁজে বের করা দৃশ্যত অসম্ভব। আমরা জেনেছি, ডব্লিউআইভি করোনাভাইরাসগুলোর জেনেটিক কাঠামো বিন্যাসসংক্রান্ত একটি রেকর্ড প্রকাশ করেছে, যেখানে কিছু করোনাভাইরাসের সঙ্গে কোভিড-১৯ রোগের সংক্রমণের জন্য দায়ী সার্স কোভ-২ ভাইরাসের মিল রয়েছে। ওই রেকর্ড থেকে আরও জানা যাচ্ছে, ২০১৭ সাল থেকে ডব্লিউআইভি একটি গোপন প্রকল্প বাস্তবায়নের সুবাদে চীনা সামরিক বাহিনীর সঙ্গে কাজ করেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনের একেবারে শেষ দিনগুলোতে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রকাশ করা একটি প্রতিবেদনে এসব তথ্য সন্নিবেশিত ছিল।

কোভিড-১৯–এর উৎপত্তি যে ডব্লিউআইভি থেকেই হয়েছে, তা কোনোভাবে প্রমাণিত হোক অথবা উহানে করোনা ছড়ানোর পর চীনের তৈরি করা উপাত্তভিত্তি ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র কোনো কৃতিত্ব নিতে পারুক, তা চীন কোনোভাবে চায় না। যুক্তরাষ্ট্রকে এ বিষয়ে কোনো ধরনের অনুসন্ধানে যেতে হলে অবশ্যই চীনের অভ্যন্তরে অনুসন্ধানের অনুমতি লাগবে।

ট্রাম্পের অদূরদর্শিতার কারণে গবেষণাগার থেকে করোনাভাইরাস ছড়ানোর তত্ত্বটি শেষ পর্যন্ত ষড়যন্ত্রতত্ত্বে পরিণত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে যখন করোনা মহামারি শুরু হয়, তখন তিনি সেই মহামারি মোকাবিলায় মনোযোগ দেওয়ার চেয়ে চীনকে এই রোগ ছড়ানোর জন্য দোষারোপ করায় বেশি মনোযোগী হন। অথচ তাঁর এই অভিযোগের পক্ষে তেমন কোনো জোরালো প্রমাণ ছিল না। এতে বিরোধীরা এটিকে আরেকটি ‘ট্রাম্পিয়ান চালাকি’ বলে চালিয়ে দেওয়ার সুযোগ পেয়ে যায়। নিতান্ত সংকীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থে করোনাভাইরাসের উদ্ভবের পেছনে উহানের গবেষণাগার থেকে করোনাভাইরাস দুর্ঘটনাজনিত অবমুক্তি প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতাসীন ও বিরোধীরা দুই ভাগ হয়ে গেছে।

এমনকি ডেমোক্রেটিক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন করোনাভাইরাস ছড়ানোর জন্য চীনের গবেষণাগার–দুর্ঘটনা দায়ী থাকলেও থাকতে পারে বলে বিষয়টিকে হালকা করেছেন। অন্যদিকে রিপাবলিকান নেতারা ডেমোক্রেটিক বাইডেন প্রশাসন চীনের গবেষণাগার থেকে ভাইরাস ছড়ানোর অভিযোগকে ধামাচাপা দিতে সহায়তা করছে বলে অভিযোগ করেছেন। সম্প্রতি রিপাবলিকান দলের নিজস্ব অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, চীন মানুষের দেহে করোনাভাইরাসের নিয়ন্ত্রিত সংক্রমণ ঘটানোর জন্য গবেষণাগারে গবেষণা চালাচ্ছিল। কিন্তু দুর্ঘটনাবশত ভাইরাসটি অবমুক্ত হয়ে পড়ে। বাইডেন যদি একই উপসংহার টেনে গোয়েন্দাদের প্রতিবেদন প্রকাশ করার আদেশ দিতেন, তাহলে হয়তো এত দিনে চীন-আমেরিকা সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যেত।

তবে শেষ পর্যন্ত একটি প্রশ্ন রয়েই যাচ্ছে সেটি হলো, এই ভাইরাস চীনের উহানের গবেষণাগার থেকে ছড়িয়েছে কি না, তা কি আমরা কোনো দিন জানতে পারব? সিআইএর পরিচালক উইলিয়াম বার্নস বলেছেন, ‘আমরা হয়তো কোনো দিনই তা জানতে পারব না। কিন্তু এত মৃত্যুর জন্য যে চীন দায়ী, এ বিষয়ে আমাদের মধ্যে কোনো বিভ্রান্তি থাকা উচিত হবে না। কারণ, চীন উহান থেকে ছড়ানো করোনাভাইরাস ছড়ানো ঠেকাতে তো পারেইনি, তার ওপর এই ভাইরাসের আদি উৎস অনুসন্ধানের পথেও মহাপ্রাচীর তুলে রেখেছে।


ইংরেজি থেকে অনূদিত, স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট

ব্রহ্ম চেলানি নয়াদিল্লিভিত্তিক সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চের স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ বিষয়ের অধ্যাপক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন