default-image

ইউরোপে আবারও করোনা বাড়ছে। এই সংক্রমণকে বলা হচ্ছে তৃতীয় ঢেউ। ইস্টার ছুটির আগে জার্মানিসহ ইউরোপের অনেক দেশেই নতুন করে কড়া লকডাউন জারি হয়েছে। খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির সুপার মার্কেট, ওষুধের দোকান, স্যানিটারিজ, সেলুন, পেট্রলপাম্প, ব্যাংক, ডাকঘর, বইয়ের দোকান ছাড়া সব দোকানপাট দীর্ঘদিন থেকে বন্ধ রয়েছে। রেস্তোরাঁ, উপাসনালয়গুলোও বন্ধ রয়েছে। এ ছাড়া সমস্ত বার, ক্লাব, থিয়েটার, চিড়িয়াখানা, পাবলিক সুইমিং পুল, শিশুদের খেলার স্থানগুলোও বন্ধ রয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোও অনিয়মিতভাবে চলছে।

টিকা নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতা, অব্যবস্থা ও দীর্ঘসূত্রতা এবং টিকার অপ্রতুলতা ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) ২৭ দেশের জনগণের মধ্যে ক্রমেই হতাশা, বিভ্রান্তি আর ক্ষোভের জন্ম দিচ্ছে। ইইউ দেশগুলোয় সম্মিলিতভাবে টিকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। কিন্তু প্রতিশ্রুতির চেয়ে কম আসায় টিকা প্রদানে ধীর গতির সৃষ্টি হয়েছে।

টিকা প্রদানের মন্থরগতির কারণে সমালোচনার মুখে পড়েছেন ইউরোপীয় কমিশনের সভাপতি উরসুলা ভন ডের লেইন। ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টের সদস্যরা বিলম্বের কারণ জানতে তাকে প্রশ্নবাণে জর্জরিত করেন। কৌশলগত কিছু ভ্রান্তি স্বীকার করে ভন ডের লেইন বলেছেন, ‘টিকার অনুমোদন দিতে বেশি সময় নেওয়া হয়েছে, ফলে অর্ডার দিতেও দেরি হয়েছে, তার থেকেই এই বিপত্তি। টিকার ব্যাপক উৎপাদন নিয়ে খুব আশাবাদী ছিলাম আমরা, কার্যত তা হয়নি বলেই এই বিলম্ব ঘটছে।’
ইউরোপে টিকা প্রদান কার্যক্রম শুরু হয় ২৮ ডিসেম্বর। সেই সময় ইউরোপীয় কমিশনের সভাপতি উরসুলা ভন ডের লেন বলেছিলেন, ‘ধীরে ধীরে টিকা আমাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে সহায়তা করবে।’ আর জার্মানির স্বাস্থ্যমন্ত্রী ইয়ান স্পান বলেছিলেন, মহামারিকে পরাস্ত করার মূল চাবিকাঠি এই টিকা। অথচ গত তিন মাসে ইউরোপের ৮০ বছর বয়স্ক নাগরিকদের টিকাদান কার্যক্রমই সমাপ্ত হয়নি।

বিজ্ঞাপন

জার্মানির পত্রিকা দ্য সাইট জানিয়েছে, করোনাভাইরাসের তৃতীয় তরঙ্গ সংক্রমিত হওয়ার মুখে ইউরোপের ছোট-বড় সব দেশেই টিকা প্রদানের হার খুবই হতাশাব্যঞ্জক। ৮ কোটি ৩০ লাখ জনসংখ্যা-অধ্যুষিত জার্মানিতে মাত্র সাড়ে ৯ শতাংশ, ৬ কোটি ৭০ লাখ জনসংখ্যার ফ্রান্সে ৯ শতাংশ, ৪ কোটি ৬৯ লাখ জনসংখ্যার স্পেনের মোটে ৯ শতাংশ মানুষ টিকা নিতে পেরেছে।

অথচ ইউরোপের মূল ভূখণ্ডে জার্মানির প্রতিষ্ঠান বিওনটেক ও মার্কিন ফার্মাসিউটিক্যাল প্রস্তুতকারক ফাইজার বিশ্বের প্রথম কার্যকর করোনা টিকা উদ্ভাবন করে। পরে সুইডেন ও যুক্তরাজ্যর অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা উদ্ভাবিত হয়েছে। অথচ সিদ্ধান্তহীনতা, ইউরোপীয় মেডিসিন এজেন্সির সময়ক্ষেপণ এবং ইইউ-র জটিল আমলাতন্ত্র টিকা কর্মসূচির দ্রুত বাস্তবায়ন পরিকল্পনাকে প্রলম্বিত করে। এ মুহূর্তে ইউরোপে বিওনটেক/ফাইজার, অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকা, মডার্না ও জনসন অ্যান্ড জনসন—এই চার কোম্পানির টিকা অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। আরও কিছু কোম্পানি যেমন কুরিভ্যাক, নোভাভ্যাক্স, স্পুতনিক, সেনোফির টিকা যাচাই করে দেখছে ইউরোপীয় মেডিসিন এজেন্সি। প্রায় ৪৫ কোটি জনসংখ্যার ইইউর জন্য এখন পর্যন্ত মাত্র সাত কোটি ডোজ টিকা সংরক্ষিত হয়েছে। প্রায় পাঁচ কোটি মানুষকে এটা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যেই নতুন করে সংক্রমণ বাড়ায় ইউরোপীয় জনগণ আতঙ্কিত বোধ করছেন।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে করোনাকে পুঁজি করে কিছু রাজনীতিকের অসাধুতা। এই সব রাজনীতিকের কারণে জার্মানির ক্ষমতাসীন কোয়ালিশন সরকারের সবচেয়ে বড় দল চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা ম্যার্কেলের ক্রিশ্চিয়ান গণতান্ত্রিক ইউনিয়ন পার্টির জনপ্রিয়তা হ্রাস পেয়েছে। জার্মানির আইনসভা বুন্ডেশটাগের দুই সাংসদের বিরুদ্ধে এফএফপি টু মাস্ক ক্রয়ে কমিশন গ্রহণের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পর দুটি রাজ্য সরকার নির্বাচনে দলটির ভোটের সংখ্যা তলানিতে এসে ঠেকেছে। অক্টোবরে অনুষ্ঠেয় জার্মানির ২০তম সাধারণ নির্বাচনেও এই প্রভাব থাকবে বলে জার্মানির রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন। জার্মানির সরকারি কৌশলীরা জানিয়েছেন, ছোট, বড় বা মধ্যম শ্রেণির বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে সাহায্য করতে যে জরুরি আর্থিক প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে, সেখানেও প্রায় ২৫ হাজার জালিয়াতির ঘটনা খুঁজে পাওয়া গেছে।

জার্মানিসহ ইউরোপের আরও কিছু দেশে অ্যাস্ট্রাজেনেকা টিকার প্রয়োগ বন্ধ করে পরে আবার চালু করার বিষয়টিও বিভ্রান্তি ছড়িয়েছে। বিভিন্ন দেশের স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও রাজনীতিকেরা প্রায় প্রতিদিনই অচিরেই সবাইকে টিকা প্রদানের আশ্বাস দিয়েও কথা রাখতে পারছেন না। তবে আগামী গ্রীষ্মকালের মধ্যেই সদস্য সব দেশের টিকা প্রদানের লক্ষ্য পূরণ হবে বলে জানিয়েছে ইইউ।

সরাফ আহমেদ প্রথম আলোর জার্মানি প্রতিনিধি
[email protected]

বিজ্ঞাপন
কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন