করোনায় জীবন যাচ্ছে, তার ওপর এখন ডেঙ্গু

ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে দুই ভাই–বোন ওম ও দেবী রাজধানীর শিশু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। ওমের অবস্থা কিছুটা ভালো হলেও দেবীর অবস্থার তেমন উন্নতি নেই। ২৭ জুলাই তোলা।
ছবি: দীপু মালাকার

ডেঙ্গু ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার সব আলামতই স্পষ্ট হচ্ছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রীও বলেছেন, ‘দেশে করোনাভাইরাসের প্রকোপের মধ্যে নতুন সংকট তৈরি করেছে ডেঙ্গু।’ চলতি বছর গত ১ জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত দেশে সরকারি হিসাবে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৪৬২। আর এবারও ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা নিয়ে রাখঢাক আছে। রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) জানিয়েছে, দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে তারা মাত্র চারজনের ডেঙ্গুতে মারা যাওয়ার তথ্য পেয়েছে, তবে এখনো এর কোনোটিরই পর্যালোচনা পাওয়া যায়নি।

সরকারিভাবে আক্রান্ত আর ঘোষিত মৃতের সংখ্যার পাশাপাশি ডেঙ্গু পরিস্থিতির গভীরতা সম্পর্কে ধারণা মিলবে প্লাটিলেটের চাহিদা দেখলে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) ট্রান্সফিউশন মেডিসিন বিভাগ জানাচ্ছে, জুন থেকেই চাহিদা বাড়তে শুরু করেছে। আগে ১০ থেকে ১২টি লাগত, এখন লাগছে ২০ থেকে ২৫টি। বেশির ভাগই নেওয়া হচ্ছে ডেঙ্গু রোগীর জন্য। পুলিশ হাসপাতালের ব্লাড ব্যাংকে যেখানে মে মাসে দৈনিক গড়ে একটি প্লাটিলেটের চাহিদা থাকত, জুনে সেটি হয় সাত থেকে আটটি। জুলাইয়ে প্লাটিলেটের চাহিদা এখন মেটানো যাচ্ছে না। দৈনিক ১৫ থেকে ২০টি দেওয়া যাচ্ছে। অন্যদের ফিরিয়ে দিতে হচ্ছে।

আগে কি টের পাওয়া যায়নি

কীট বিশেষজ্ঞরা অনেক আগেই সতর্ক করছিলেন। জানিয়েছিলেন, ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় এডিসের ঘনত্ব আগের বছরের চেয়ে অনেক বেশি। এবার জুন মাসে বৃষ্টির খরা কেটে যায়। ফলে জুনের শুরুতে এডিস মশার ঘনত্ব ধরা পড়ে। এ সময় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি দল ঢাকার বিভিন্ন ওয়ার্ডে জরিপ চালায়। জরিপে দেখা যায়, গত বছরের চেয়ে এডিস মশার ঘনত্ব প্রায় ২০ গুণ বেশি। তাঁরা জানিয়েছিলেন, ঢাকার এমন কোনো এলাকা নেই, যেটি ডেঙ্গুর উচ্চ ঝুঁকিতে নেই। তাড়াতাড়ি ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে।

ডেঙ্গুর পাশাপাশি রাজধানীর কাছের গুটিকয় জেলায় দেখা দিয়েছে কালাজ্বর। প্রতিবছর বর্ষাকালে গাজীপুর ও ময়মনসিংহের বিভিন্ন এলাকায় কালাজ্বর বেড়ে যায়। করোনাকাল শুরুর আগে থেকেই প্রায় দুই বছর হলো কালাজ্বরের বাহক বেলে মাছি নিধনে নেই কোনো কার্যক্রম।

সময়মতো ব্যবস্থা নেওয়া হলো না কেন

সময়মতো ব্যবস্থা নেওয়া হলো না কেন—এ প্রশ্ন করার লোক দেশে কম। তবে বিএসএমএমইউর সাবেক উপাচার্য (ভাইরোলজিস্ট) অধ্যাপক নজরুল ইসলাম একটা কারণ জানিয়েছেন। তাঁর মনে হয়েছে, এ বছর (২০২১) কোভিড-১৯ নিয়ে সবাই চিন্তিত ছিল, তাই অন্যান্য রোগের বিষয়ে তেমন আলোচনা হয়নি। এটি ডেঙ্গু বাড়ার একটা বড় কারণ। অর্থাৎ সেই একচক্ষু হরিণের গল্প। বাঘের দিকে নজর দেবে, না কুমিরের দিকে তাকিয়ে থাকবে, নাকি ঘাস খাবে? কিন্তু এটা তো ঠিক, ডেঙ্গু-চিকুনগুনিয়া আমাদের ‘নলেজের’ মধ্যেই ছিল। তার গতিবিধি পর্যবেক্ষণের কলকাঠি আমাদের হাতেই ছিল। তাহলে কেন ব্যবস্থা নেওয়া হলো না? কেন এত গাফিলতি?

শুধু কি ডেঙ্গু আর এডিস মশা

ডেঙ্গুর পাশাপাশি রাজধানীর কাছের গুটিকয় জেলায় দেখা দিয়েছে কালাজ্বর। প্রতিবছর বর্ষাকালে গাজীপুর ও ময়মনসিংহের বিভিন্ন এলাকায় কালাজ্বর বেড়ে যায়। করোনাকাল শুরুর আগে থেকেই প্রায় দুই বছর হলো কালাজ্বরের বাহক বেলে মাছি নিধনে নেই কোনো কার্যক্রম। পত্রিকান্তরে জানা গেছে, এবারও নাকি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দুই শাখার ঠেলাঠেলিতে কেনা হয়নি প্রয়োজনীয় কীটনাশক ডেলটামেথ্রিন। এ কারণে রোগনিয়ন্ত্রণ শাখা ৫০ হাজার লিটারের চাহিদা দিয়েও কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের কাছ থেকে সময় আর চাহিদামতো কীটনাশক পায়নি।

শিশু রোগীর সংখ্যা বাড়ছেই

ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত মানুষের একটি বড় অংশই শিশু। শিশুরা সাধারণত তাদের শারীরিক পরিস্থিতি সম্পর্কে সচেতন বা সতর্ক না হওয়ায় তাদের ওপর এ রোগের প্রভাব ভয়াবহ হওয়ার আশঙ্কা থাকে। হাসপাতালে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি শিশুর সংখ্যা বাড়ছে, তার সঙ্গে এর চিকিৎসায় প্রয়োজনীয় রক্তের প্লাটিলেটের চাহিদাও বাড়ছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা। গত শুক্রবার বাংলাদেশের হাসপাতালগুলোর মধ্যে এক দিনে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয় ঢাকা শিশু হাসপাতালে। সেই মিছিল এখনো চলছে।

জ্বরের উপসর্গ থাকলেই করোনার পাশাপাশি ডেঙ্গু টেস্ট করাও জরুরি। এখন অনেকেই জ্বর মানেই মনে করেন কোভিড-১৯। তাই ডেঙ্গু পরীক্ষা না করে বাসায় বসে থাকেন। অনেকে করোনা পরীক্ষা করালেও ডেঙ্গুরটা করাচ্ছেন না।

শিশুরা কেন বেশি আক্রান্ত হচ্ছে

এডিস পরিষ্কার পানির মশা, ঘরের মশা, দিনে কামড়ানো মশা। করোনাকালে শিশুরা এখন ২৪ ঘণ্টা ঘরবন্দী। নিজেদের ঘর-বারান্দা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকলেও পাশের খালি ফ্ল্যাট আর সেটির বারান্দায় ফেলে দেওয়া টবে বৃষ্টির পানি জমে এডিসের বংশবিস্তার হচ্ছে। শিশুদের বাড়ির পোশাক এই গরমে গেঞ্জি, হাফপ্যান্ট। ফলে এডিস মশার সহজ শিকার হচ্ছে শিশুরা। বিএসএমএমইউর মেডিসিন বিভাগের সাবেক ডিন এ বি এম আবদুল্লাহ বলেন, শিশুদের খুবই সাবধানে রাখতে হবে। তারা যেন ফুলহাতা শার্ট পরে হাত দুটো ঢেকে রাখে। শিশুরা দিনে ঘুমালেও মশারি টাঙিয়ে দিতে হবে। আরেকটি সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হতে পারে মশানিরোধক ক্রিম ব্যবহার। মশার কামড় থেকে দূরে রাখতে গ্রামে এখন অনেকে শিশুর হাত-পায়ে নিশিন্দাপাতার রস লাগিয়ে দেয়। এর কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই।

এখনই করণীয়

জ্বরের উপসর্গ থাকলেই করোনার পাশাপাশি ডেঙ্গু টেস্ট করাও জরুরি। এখন অনেকেই জ্বর মানেই মনে করেন কোভিড-১৯। তাই ডেঙ্গু পরীক্ষা না করে বাসায় বসে থাকেন। অনেকে করোনা পরীক্ষা করালেও ডেঙ্গুরটা করাচ্ছেন না।

আবার অনেকে কোভিড-১৯ ভেবে চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ ছাড়াই ওষুধ খাচ্ছেন। এতে ডেঙ্গু রোগীদের ঝুঁকি বেড়ে যাচ্ছে। দেরিতে পরীক্ষার কারণে ডেঙ্গু শনাক্ত হওয়ার পরপরই প্লাটিলেটের মাত্রা পাওয়া যাচ্ছে অনেক কম। এ পরিস্থিতিতে জ্বর হলেই কোভিডের পাশাপাশি ডেঙ্গুও পরীক্ষা করিয়ে নিতে হবে। তার জন্য প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। পর্যাপ্ত ডেঙ্গু কীটের সরবরাহ নিশ্চিত করা।

শনাক্ত রোগীর বাসার ৪০০ মিটারের মধ্যে এডিস অনুসন্ধান অভিযান পরিচালনা জরুরি। তবে শহরে কোভিড সংকটে বাসাবদলের হিড়িকে খালি-পরিত্যক্ত ফ্ল্যাটকে বিশেষ নজরদারির মধ্যে রাখতে হবে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেছেন, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, টঙ্গীর শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার জেনারেল হাসপাতাল, লালকুঠি হাসপাতাল, রেলওয়ে হাসপাতালসহ আরও কয়েকটি হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসা হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে বিষয়টি খোলাসা করে সবাইকে জানিয়ে দেওয়া জরুরি। রেডিও-টেলিভিশনে সেগুলো ঘন ঘন প্রচার করলে মানুষের ভোগান্তি কমে।

গওহার নঈম ওয়ারা লেখক ও গবেষক

[email protected]