default-image

মুঠোফোনটা ছেড়ে দিয়ে অনেকক্ষণ চুপ করে বসে থাকলাম। একটা বিষণ্ন ধূসরতায় ছেয়ে গেল মন। ফোন করেছিল সাবের। গুলশানে আমাদের বাড়ির উল্টো দিকে বনানী ১১ নম্বরের সেতু ঘেঁষে ছোট্ট একটি মনিহারি দোকান ছিল ওর। তেমন আহামরি কিছু নয়, ঢাকার পাড়ায় পাড়ায় যেমনটি থাকে, ঠিক তেমনটি। দেশে গেলে দরকারে-অদরকারে ওর দোকানে যেতাম। টুকটাক কেনার পরে গল্প হতো। ঠাট্টা করতাম ওর দোকানের কোনো নাম নেই বলে। ও স্মিত হেসে জবাব দিত, দোকান খুব বড় হলে বিরাট করে নাম টাঙাবে—‘জরিনা সুপার স্টোর’। জরিনা ওর ঘরনির নাম। বুঝতাম, ও স্বপ্ন দেখছে আরও ওপরে ওঠার।

‘আমার স্বপ্ন সব গুঁড়া গুঁড়া হইয়া গ্যালো স্যার’—কান্নাজড়ানো কণ্ঠে বলল সাবের। করোনার শুরু থেকেই দোকান বন্ধ ছিল তিন মাস। তারপর একটু-আধটু খুললেও তা না খোলারই শামিল। শেষে নামমাত্র দামে দোকানটা বিক্রি করে দিয়েছে সাবের। সে টাকায় দেনা মিটিয়েছে। ছয় মাস ধরে ওর আয় বন্ধ। কাজ খুঁজছে নানান জায়গায়। সঞ্চয় ভেঙে খেয়েছে। কিন্তু আর সে পারছে না। নিরুপায় হয়ে আমাকে লন্ডনে ফোন করেছে কিছু সাহায্যের আশায়।

বিজ্ঞাপন

লন্ডনের বাড়িতে আমার লেখার টেবিল থেকে একটি ঝাঁকড়া গাছ দেখা যায়। সেটির দিকে তাকিয়ে আছি। সাবেরের একটি কথা আমার করোটিতে ‘জলের মতো ঘুরে ঘুরে’ কথা কইতে লাগল, ‘আমার সব স্বপ্ন গুঁড়া গুঁড়া হইয়া গ্যালো, স্যার।’ কত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মানুষের স্বপ্ন গুঁড়িয়ে দিল করোনা! কত প্রান্তিক মানুষের জীবন লন্ডভন্ড করে দিল, কত নাজুক জনগোষ্ঠীকে আরও নাজুক করে দিল!

করোনাভাইরাসের প্রভাব প্রসঙ্গে আমাদের আলোচনা-পর্যালোচনায় অর্থনৈতিক মাত্রিকতার কথা উঠছে বটে। তবে আমাদের মূল নজরটি থাকছে কর্মসংস্থান, প্রবৃদ্ধি ও সম্পদের মতো কিছু শুদ্ধ অর্থনৈতিক বিষয়াবলির দিকে। এই যেমন আগামী বছর বিশ্বের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ২ শতাংশ কমবে।

এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু বড় মাপের মূল্যায়নে দারিদ্র্য আর অসমতার বৃদ্ধি ও বিস্তারের দিকগুলো আলাদা করে কমই গুরুত্ব পায়। কিন্তু দুর্যোগে একটি দেশের সব জনগোষ্ঠী সমভাবে পরাস্ত হয় না। যুদ্ধবিগ্রহ, ঘূর্ণিঝড়-প্লাবন অথবা দুর্ভিক্ষ-মহামারি, বেশির ভাগ দুর্যোগে অসমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় দরিদ্র ও প্রান্তিক গোষ্ঠীগুলো। এই কাতারে আছে নানান প্রতিবন্ধকতাসম্পন্ন মানুষেরা। আছে নৃতাত্ত্বিক জাতিসত্তাভিত্তিক সংখ্যালঘু মানুষেরা অথবা পরিবেশ শরণার্থীরা। করোনা-দুর্যোগেও তার ব্যত্যয় ঘটেনি। সব দেশেই করোনার এমন বিষম প্রভাব দেখা গেছে।

বিজ্ঞাপন

করোনার সংক্রমণ আর মৃত্যুর ধারার মধ্যেই তো একটা বৈষম্য আছে। যারা মারা যাচ্ছে, তাদের ৭০ শতাংশ পুরুষ আর ৩০ শতাংশ নারী। আক্রান্ত আর মৃতের মধ্যে বয়স্ক জনগোষ্ঠীর অনুপাত বেশি। উচ্চ রক্তচাপ, হৃদ্‌রোগ, প্রমেহ, হাঁপানি বা শ্বাসকষ্টজনিত অন্যান্য রোগে ভোগা মানুষজন করোনার বড় শিকার। বিভিন্ন দেশে নৃতাত্ত্বিক সংখ্যালঘু মানুষেরা অসম বা অনানুপাতিক হারে
করোনার শিকার হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে জনসংখ্যার মাত্র ১৩ শতাংশ কৃষ্ণাঙ্গ, কিন্তু করোনা-সংক্রমণে তাদের অনুপাত ২৫ শতাংশ।

যুক্তরাজ্যে প্রতি তিনজন করোনা-আক্রান্ত মানুষের একজন নৃতাত্ত্বিক সংখ্যালঘু। বলা হচ্ছে কৃষ্ণাঙ্গ ও দক্ষিণ এশীয় জনগোষ্ঠীর ব্যাপক অংশ করোনা-আক্রান্ত হতে পারে। এই জনগোষ্ঠীগুলোর উল্লেখযোগ্যসংখ্যক চিকিৎসক ও সেবিকা কোভিডে মারা গেছেন। এমনটা হওয়ার পেছনে নানান কারণ রয়েছে। কারণগুলোর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে দারিদ্র্য, বঞ্চনা ও অসমতা। দারিদ্র্যের কারণেই এই মানুষেরা একই বাড়িতে গাদাগাদি করে বসবাস করে। যৌথ নিরাপত্তার তাগিদ সে ব্যবস্থাকে উৎসাহিত করে।

এ পরিস্থিতিতে সঙ্গনিরোধ বাতুলতা কাজ ও আয়ের জন্য তাঁদের বাইরে আসতেই হয়। তাঁদের কাজগুলো এমন, যেখানে সামাজিক জনদূরত্ব কাজ করে না। নৃতাত্ত্বিক সংখ্যালঘুরা যেখানে বসবাস করে, সেখানে সামাজিক সেবার বিস্তৃতি ও মান দুটিই বড় সীমিত। সব মিলিয়ে করোনাকালে তাদের নিরাপত্তা বড়ই কম।

বিজ্ঞাপন

দরিদ্র মানুষের জন্যও এসব কথা খাটে। বাংলাদেশে অবশ্য জরিপকারী-গবেষণাকারীরা বলছেন, ঢাকার দরিদ্র-অধ্যুষিত বস্তিগুলোতে সংক্রমণ আর মৃত্যু দুটিই কম। তাঁরা অবশ্য এর সঠিক ব্যাখ্যা এখনো দিতে পারেননি। তবে সাবেরের কথার সূত্র ধরেই বলি, করোনা সংকটে অর্থনৈতিক দিক থেকে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ও হবে দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষেরা এবং নাজুক জনগোষ্ঠী। এই কাতারে থাকবে বিত্তহীন বঞ্চিত মানুষেরা, প্রান্তিক গৃহস্থালি, বৃদ্ধ ও প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠী এবং নারীরা।

বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে গত তিন দশকে চরম দারিদ্র্য হ্রাস করার ব্যাপারে যে অভূতপূর্ব অগ্রগতি হয়েছে, তা ব্যাহত হবে। গত তিরিশ বছরে বিশ্বে চরম দরিদ্রের সংখ্যা ১৯০ কোটি থেকে ৮৯ কোটিতে নেমে এসেছিল। অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন ২ লাখের বেশি মানুষ চরম দারিদ্র্যসীমার ওপরে উঠে আসছিল। এখন প্রাক্কলন বলছে, করোনার কারণে বিশ্বজুড়ে নতুন করে ৫০ কোটি মানুষ সীমাটির নিচে চলে যেতে পারে।

বাংলাদেশেও গত তিরিশ দশকে দারিদ্র্য ও চরম দারিদ্র্য অনেক কমে এসেছে। কিন্তু অনেক অর্থনীতিবিদই মনে করছেন যে করোনার ফলে দারিদ্র্য বেড়ে আবার ৪০ শতাংশ ছাড়াতে পারে। কিন্তু শুধু চরম দারিদ্র্যই নয়, করোনার কারণে বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে অসমতা বৃদ্ধি পেতে পারে। অসমতা বাড়বে বিত্তবান ও বিত্তহীনদের মধ্যে, বঞ্চিত ও সুবিধাভোগীদের মধ্যে এবং গ্রামাঞ্চল ও নগরের মধ্যে।

বিজ্ঞাপন

বৈষম্য বাড়বে শুধু ফলাফলে নয় (যেমন আয়ের ক্ষেত্রে)। অসমতা বাড়বে সুযোগের ক্ষেত্রেও (যেমন শিক্ষাসেবার ক্ষেত্রে)। সুযোগের ক্ষেত্রের অসমতা ফলাফলের অসমতা আরও বাড়াবে। কতগুলো নাজুক জনগোষ্ঠী (যেমন বৃদ্ধ জনগোষ্ঠী) এ অসমতা ও বৈষম্যের সবচেয়ে বড় শিকার হবেন।

করোনাকালে অর্থনৈতিকভাবে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন দিন এনে দিন খাওয়া মানুষেরা। ক্ষতিতে পড়েছেন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সাধারণ শ্রমিকেরা, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী, অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের কর্মীরা। করোনার অবরোধকালে এই মানুষদের কর্মসংস্থান নষ্ট হয়েছে, তাঁদের আয়ের পথ বন্ধ হয়েছে। করোনা থেকে উত্তরণের কালেও বিত্তবানেরা যত দ্রুত সংকট কাটিয়ে উঠতে পারবেন, দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষেরা তা পারবেন না। ফল দাঁড়াবে আয় ও ভোগের অসমতা বৃদ্ধি। বৈষম্য বাড়বে সেবার সুযোগেও।

আগামী দিনগুলোতে শিক্ষার সব পর্যায়ে পাঠদান চলবে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে। কিন্তু এ প্রযুক্তি ধনী গৃহস্থালিতে যতখানি সহজলভ্য, দরিদ্র গৃহস্থালিতে ততখানি নয়। শহরে যত সহজে পাওয়া যায়, গ্রামাঞ্চলে তত সহজে নয়। সুতরাং করোনার কারণে শিক্ষায় একটি অন্তর্নিহিত বৈষম্যের সৃষ্টি হবে। পরবর্তী পর্যায়ে কর্মসংস্থান ও আয়ের ক্ষেত্রেও অসমতার জন্ম হবে। অসমতার প্রকোপ বেশি করে পড়বে কতগুলো বিশেষ জনগোষ্ঠীর ওপরে। রাষ্ট্রের সম্পদ কমে আসবে। ফলে বৃদ্ধ ও প্রতিবন্ধীদের মতো নাজুক গোষ্ঠীগুলোকে প্রয়োজনীয় সাহায্য বা সামাজিক সুরক্ষা দেওয়া যাবে না।

বিজ্ঞাপন

নারীর প্রতি বৈষম্য নানা চেহারা নেবে। করোনাকালে নারীদের ওপর গৃহকর্ম ও সেবামূলক কাজের চাপ বেড়েছে। ঘরবন্দী জীবনে মতানৈক্য, সংঘাত, খিটিমিটি স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে গেছে। বেড়েছে নারীর প্রতি সহিংসতা। নারীদের একটি বড় অংশ কাজ করেন পোশাকশিল্পে ও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে। নারীরা তাই আর্থিক বিপত্তিতেও পড়বেন। অন্যদিকে, স্বাস্থ্য খাত ও সেবার মূল ঝোঁক থাকবে অতিমারি নিয়ন্ত্রণে। স্বাভাবিকভাবেই প্রজননস্বাস্থ্যসহ নারীর স্বাস্থ্যসেবা অগ্রাধিকার পাবে না।

সন্দেহ নেই যে বর্তমান বিশ্বও একটি অসম বিশ্ব। করোনা সেই অসাম্যের দেয়ালকে আরও পোক্ত করেছে। করোনার অভিঘাত বৈষম্যের নতুন দেয়াল সৃষ্টি করেছে, ভবিষ্যতেও করবে। সুতরাং করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ও মৃত্যুই শেষ কথা নয়। তার সৃষ্ট বিভাজিত পৃথিবীও এক বিরাট প্রশ্ন।

সেলিম জাহান: অর্থনীতিবিদ ও লেখক

মন্তব্য পড়ুন 0