default-image

দেশে দেশে সমাজকে কঠোরভারে নিয়ন্ত্রণের মধ্য দিয়ে করোনাকে মোকবিলা করছেন কর্তৃত্ববাদীরা। বিরোধী মত, সংখ্যালঘু ও অভিবাসীরা চরম ডানপন্থী শাসকদের লক্ষ্যে পরিণত হয়েছে। বর্ণবাদ ছড়িয়ে যাচ্ছে সব জায়গাতেই। বিদেশিদের ভয় পাচ্ছেন স্থানীয় ব্যক্তিরা। আক্রান্তকে এড়িয়ে যাচ্ছে। মৃতের সৎকারে পরিবার–পরিজনও এগিয়ে আসছে না। করোনার বিস্তার, দমন, পীড়ন, সব মিলিয়ে এক ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। একদিকে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর ভয়। অপর দিকে দমন–নির্যাতনের শঙ্কা পিছু তাড়া করছে ভয়ার্ত জনসাধারণকে।

রাজনৈতিক কাঠামোর বিশাল ফুটো উদোম করে দিয়েছে করোনা সংকট। যুক্তরাষ্ট্রের মতো মহাশক্তিধর দেশ করোনা সামলাতে ব্যর্থ হয়েছে। জার্মানি, কানাডা, ভিয়েতনাম, নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়ার মতো হাতে গোনা দু–একটি দেশ বাদে সবার অবস্থা তথৈবচ। জোর আলাপ হচ্ছে এই ফুটো মেরামত করে জনগণবান্ধব সমাজব্যবস্থার দিকে রাষ্ট্রগুলো অগ্রসর হতে পারে। আবার এর বিপরীত মতামতও আছে। চিন্তকদের কেউ কেউ মনে করেন, করোনা–পরবর্তী বিশ্বে নতুন কোনো উদার, গণবান্ধব ব্যবস্থার উদ্ভব ঘটবে না। বর্তমান ব্যবস্থাই টিকে থাকবে। বরং কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থা করোনাকে পুঁজি করে সমাজে আরও গেঁড়ে বসবে। রাষ্ট্রগুলো জনসাধারণের ওপর অধিকতর নিয়ন্ত্রণ আরোপের চেষ্টা করবে। সাধারণের গতিবিধির ওপর নজরদারি বৃদ্ধি পাবে। সাধারণের মতপ্রকাশের পথে নিত্যনতুন বাধা সৃষ্টি করবে রাষ্ট্রগুলো।

জনগণকে রক্ষার থেকে দমনের দিকেই কর্তৃত্ববাদী শাসকদের মনোযোগ বেশি। বিভিন্ন দেশে সরকার সমালোচকদের আটক করা হয়েছে। এসব দেশে স্বাভাবিক রাজনৈতিক কার্যক্রম একরকম নিষিদ্ধই আছে। রাজনৈতিক দলগুলো নির্জীব হয়ে পড়েছে। রাজনৈতিক কার্যক্রম যেহেতু নেই, তাই কর্তৃত্ববাদী শাসকদের কোপানলে পড়ছেন গণমাধ্যমকর্মী ও সমালোচকেরা।

এ ক্ষেত্রে চীনের কথাই উল্লেখ করা যায়। করোনা নিয়ে সংবাদ প্রকাশের দায়ে তিন সাংবাদিককে আটক করেছিল চীন সরকার। এরপর আর ওই তিন সাংবাদিকের কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তাঁদের নিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে তেমন সংবাদও প্রকাশিত হয়েনি। চীন অত্যন্ত কঠোর হস্তে করোনা মোকাবিলা করেছে। রাস্তাঘাট সিলগালা করে দিয়েছে। রাস্তা থেকে জোর করে আফ্রিকান অভিবাসীদের ধরে নিয়ে করোনা পরীক্ষা করেছে। এর মধ্যে যাঁরাই সরকারি আচরণের সমালোচনা করেছেন, তাঁদের কপালে জুটেছে জেল। আর নির্যাতন তো আছেই। উত্তর কোরিয়া তো অনেক আগেই নিজেদের করোনামুক্ত ঘোষণা করেছে। সারা বিশ্ব যেখানে করোনা দমাতে হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে কোন জাদুবলে উত্তর কোরিয়া করোনা নির্মূল করল, তা পরিষ্কার না। উত্তর কোরিয়া সরাসরিই করোনার প্রকোপ নাকচ করে দিয়েছে। সেখানে কারোনা নিয়ে কোনো ধরনের কথাবার্তা বলাই নিষিদ্ধ। একই অবস্থা জারি করেছেন নিকারাগুয়ার শাসক দানিয়েল ওর্তেগাসহ বেলারুশ, তুর্কমেনিস্তানের স্বৈরশাসকেরা।

ওদিকে ব্রাজিলের চরম জাতীয়তাবাদী দক্ষিণপন্থী রাষ্ট্রপতি বোলসোনারো দেশটির স্বাস্থ্যমন্ত্রীকেই বাদ দিয়েছেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী লুইজ মেনদেতার অপরাধ ছিল, তিনি করোনা মোকাবিলায় সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার পক্ষে মতামত দিয়েছিলেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চিকিৎসা পদ্ধতির বিরোধিতা করে স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের কয়েকজন চাকরি হারিয়েছেন। স্পেনের চরম ডানপন্থী দল ভক্স পার্টির সমাবেশ থেকে অনেকেই আক্রান্ত হন করোনায়। পরে দলটির পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয় বিদেশিদের কারণে করোনার বিস্তার ঘটছে। তারা দাবি করে, তাদের দেহের অ্যান্টিবডি চৈনিক ভাইরাস প্রতিরোধ করবে। ট্রাম্পও করোনাকে চৈনিক ভাইরাস বলে মন্তব্য করেছেন। স্পেন থেকে আমেরিকা সব জায়গাতেই অভিবাসীদেরই দায়ী করা হচ্ছে করোনা বিস্তারের জন্য। ফ্যাসিবাদের আঁতুড়ঘর ইতালির ডানপন্থী দল লীগ পার্টির প্রধান মাতেও দাবি করেন, আফ্রিকানরা ইতালিতে করোনা ছড়াচ্ছে। অথচ তখন ইতালিতে ২২৯ জন আক্রান্ত হয়েছিল, আর পুরো আফ্রিকাতে মাত্র একজন আক্রান্ত হয়েছিল।এ ছাড়া সংখ্যালঘুরাও ফ্যাসিস্টদের প্রপাগান্ডার শিকার হচ্ছেন। ভারতে বিজেপির নেতা–কর্মীরা মুসলমানদের দায়ী করছে করোনা সংক্রমণের জন্য।

হঠাৎ করেই রাষ্ট্রগুলো এমন আচরণ করছে না। কিছু কিছু রাষ্ট্র তো এমনই ছিল। মহামারির সময়ে বরং মুখোশটা খসে পড়েছে কেবল। যেকোনো মহামারির পরই নতুন পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হয়। জনসাধারণের ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনে পরিবর্তন নিয়ে আসে মহামারিগুলো। নতুন অবস্থার সঙ্গে সবাইকে খাপ খাইয়ে নিতে হয়। করোনা মহামরি, বিশেষ করে আলোচনা চলছে এর রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব নিয়ে। কেমন হতে পারে করোনা–উত্তর নতুন পৃথিবী? রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোতে পরিবর্তন আসবে কি না, তা নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে বিস্তর আলাপ–আলোচনা হচ্ছে। অনেক বিশেষজ্ঞই ধারাণা করছেন, করোনার সংকট ও বিপর্যয়ের অভিজ্ঞতার আলোকে নতুন বিশ্বব্যবস্থা গড়ে উঠতে পারে। নিও লিবারেল বা নয়া উদার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা করোনা সামাল দিতে ব্যর্থ হয়েছে।

করোনা–পরবর্তী বিশ্ব নিয়ে দুই ধরনের মতামত ও আলোচনা হচ্ছে। যদি ইতিবাচক, উদার ও গণবান্ধব পরিবর্তন আসে, এর জন্য অপেক্ষা করতে হবে। কারণ পরিবর্তনটা আসবে কিছুটা সময় নিয়ে। হুট করেই বিদ্যমান কাঠামোর আগাগোড়া বদলে যাবে না। কিন্তু বিপরীত মতের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে দ্রুতই। ইতিমধ্যেই বিভিন্ন দেশের লোকরঞ্জনবাদী বা কর্তৃত্ববাদী শাসকদের পদক্ষেপগুলো দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। করোনাকে পুঁজি করে ক্ষমতার রাশ আরও শক্ত করার মহড়া তাঁরা শুরু করেছেন। এত দিন বিভিন্ন দেশে একধরনের কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থা ছিল। কারোনা সংকট কাজে লাগিয়ে তারা কার্যত ফ্যাসিবাদের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।

কর্তৃত্ববাদী শাসকদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এরা নিজের ছায়াকেও সন্দেহ করা এবং ব্যর্থতা আড়ালের জন্য দায় চাপানোর চেষ্টা করা। তথ্য গোপনের চেষ্টা হয়। অনেক দেশই আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা গোপন করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব থেকে জনসাধারণের দৃষ্টি অন্য দিকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য, সমাজে ভয়ের আবহ জারি রাখা হয়। এভাবেই দৈব দুর্বিপাককে ব্যবহার করে এক ঢিলে দুই পাখি মারে শাসকগোষ্ঠী। প্রথমত, ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করা, যেন প্রতিবাদী শক্তিগুলো আরও নির্জীব হয়ে যায়। দ্বিতীয়ত, নিজেদের ব্যর্থতা আড়াল করা। ব্রিটেনের গার্ডিয়ান পত্রিকায় গত মাসে প্রকাশিত এক নিবন্ধে জেমি ডওয়ার্ড লিখেছেন, কর্তৃত্ববাদী শাসকেরা করোনা সংকটকে একরকম অপহরণ করেছেন নিজেদের কঠোর, নির্মম নীতি ও কর্মসূচিগুলোকে বাস্তবায়ন ও ব্যর্থতাগুলো আড়ালের জন্য।

ড. মারুফ মল্লিক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন