বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

এই এতগুলো বছরের যুদ্ধে বিপুলসংখ্যক প্রাণহানি এবং কোটি কোটি ডলার ব্যয়ের বিনিময়ে আমেরিকান বাহিনী আসলে আফগান জনগণের জন্য, এমনকি মার্কিন জনগণের জন্য কী ফল বয়ে আনতে পেরেছে, তা এখন বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সেই দখলদারি অভিযান কতটা গ্রহণযোগ্য ও যৌক্তিক ছিল, এখন সেটাই খতিয়ে দেখার সময় এসেছে। যৌক্তিক বিবেচনায় দেখা যাবে, নাইন–ইলেভেনের সন্ত্রাসী হামলার অতি প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে হামলা চালিয়েছিল, যে সন্ত্রাসী হামলায় না আফগানিস্তানের তৎকালীন ক্ষমতাসীন তালেবান সরকারের সরাসরি কোনো সংশ্লিষ্টতা ছিল, না কোনো আফগান নাগরিক তাতে জড়িত ছিল। সন্ত্রাসী হামলায় দায়ী আল–কায়েদাকে অন্য কোনো উপায়ে সাজা দেওয়া যেত।

মার্কিন অভিযানের অনৈতিক দিকগুলোর দিকে যুক্তরাষ্ট্র নজর না দিয়ে আফগানিস্তানে তারা ত্রুটিপূর্ণ রণকৌশল অনুসরণ করেছিল। তারা আফগান জনগণের ওপর নিজেদের পছন্দের সরকার চাপিয়ে দিয়েছে। তারা আফগান উপজাতি ও জাতিগত গোষ্ঠীগুলোর ভিন্নতার সম্ভাব্য প্রভাবকে একেবারে পাত্তা দেয়নি। তারা রাজনৈতিক পথকে পাশ কাটিয়ে সামরিক পন্থাকেই বেছে নিয়েছিল। কট্টর বিশুদ্ধতাবাদে বিশ্বাসী ইসলামি রক্ষণশীল আফগান সমাজে পশ্চিমা সংস্কৃতি এমনভাবে বিস্তার করতে চেয়েছে, যা সাধারণ আফগান নাগরিকদের প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ করেছে।

এ কারণে মার্কিন নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা বাহিনী এবং তাদের সমর্থনপুষ্ট আফগান সরকারগুলো আফগানিস্তানের, বিশেষ করে প্রান্তবর্তী মানুষের হৃদয় জয় করতে ব্যর্থ হয়েছে। সর্বোপরি, কাবুলের সরকারকে বাইরে থেকে আসা দখলদার শক্তি গায়ের জোরে বসিয়ে দিয়েছে—এ কলঙ্ক সরকারগুলোর গায়ে স্থায়ীভাবে বসে গেছে। আফগানিস্তানের ইতিহাস জানে এমন ব্যক্তিমাত্রেই সব সময় ভবিষ্যদ্বাণী করে এসেছে, হানাদার বাহিনী ফিরে যাওয়ার পর এই সরকারের পক্ষে টিকে থাকা সম্ভব হবে না। সেই ভবিষ্যদ্বাণী এখন সত্য হতে যাচ্ছে।

আফগানিস্তানে যাতে পুরোদস্তুর গৃহযুদ্ধ লেগে না যায়, সে জন্য দেশটির সংঘাতরত বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে একটি শান্তিচুক্তি করার প্রস্তাব দিয়েছে পাকিস্তান। পাকিস্তানের এ প্রস্তাব যথেষ্ট যৌক্তিক। কারণ, আফগানিস্তানের সর্বত্র গৃহযুদ্ধ লেগে গেলে তার প্রভাব পাকিস্তানসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপরে পড়বে। এটি আঞ্চলিক অস্থিরতারও সৃষ্টি করবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত মনে হচ্ছে সব মার্কিন সেনা প্রত্যাহার হয়ে গেলে তালেবান আরও অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠবে এবং তাদের শর্তের বাইরে তারা কোনো চুক্তিই মানবে না।

কাবুল সরকার যাতে শান্তিপূর্ণভাবে আত্মসমর্পণ করে, সে জন্য তালেবান শিগগিরই একটি শান্তি পরিকল্পনার কথা প্রকাশ করবে বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। সে কারণে পাকিস্তান অদূর ভবিষ্যতের সম্ভাব্য তালেবান সরকারের সঙ্গে কীভাবে কূটনৈতিক সম্পর্ক রাখবে, তার আগাম প্রস্তুতি নিতে হবে।

আশার কথা, ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকার সময় তালেবান যেসব অন্তর্ঘাত করে চরম ক্ষতির মুখে পড়েছিল, সেটি থেকে তারা শিক্ষা নিয়েছে বলে মনে হয়। এবার নিজেরাই নিজেদের কল্যাণের কথা মাথায় রেখে তাদের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতিতে আধুনিকতার মিশেল দেবে বলে মনে হচ্ছে। অভ্যন্তরীণ নীতিতে তালেবানের বাইরে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের সরকারে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত হবে। এর মাধ্যমে বিশ্বকে তারা এ বার্তা দিতে পারবে যে তারা কোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠী নয়, তারাও মূলধারার রাজনৈতিক দলে রূপান্তরিত হতে পেরেছে। একই সঙ্গে মানবাধিকার ও নারী শিক্ষার বিষয়ে তারা উদার হতে পারে। এসব বিষয় নিশ্চিত করতে পারলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তাদের স্বীকৃতি পাওয়া সম্ভব হতে পারে।

যেহেতু এখনো আফগানিস্তানে তুমুল গৃহযুদ্ধ লাগার আশঙ্কা রয়েছে, সেহেতু ইসলামাবাদকে আফগানিস্তান থেকে পালিয়ে আসা শরণার্থীদের জায়গা দেওয়ার মতো প্রস্তুতি রাখতে হবে।

ডন থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত

জাভেদ হুসেইন পাকিস্তান সরকারের সাবেক কূটনীতিক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন