এ মুহূর্তে বাইডেনকে তাঁর পূর্বসূরি যেসব প্রেসিডেন্ট একই বিপর্যয় ভোগ করেছেন, তঁাদের দিকে পেছনে ফিরে তাকানো উচিত। ১৯৮৩ সালে বৈরুতে ভয়াবহ ট্রাকবোমা হামলায় ২৪১ জন আমেরিকান নিহত হন। ইরান সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী সেই হামলায় জড়িত ছিল বলে মনে করা হয়। দেশবাসীর সামনে এ ঘটনার ব্যাখ্যা দিতে হয়েছিল রোনাল্ড রিগ্যানকে।

বাইডেনের মতোই রিগ্যানকে দোষের ভাগী হতে হয়েছিল। বৈরুত বিমানবন্দরের কাছে ব্যারাকে মার্কিন নাগরিকদের পর্যাপ্ত নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছিল তঁার প্রশাসন। এর ফলে রিগ্যান প্রশাসন লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহার করে নিয়েছিল। এ ঘটনার পর রিগ্যান বলেছিলেন, তিনি আর মধ্যপ্রাচ্যে স্থলসেনা পাঠাবেন না।

ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ বাইডেনের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ক্ষমার অযোগ্য একটা দুর্ভাগ্যের দিন ডেকে এনেছে। এটা পশ্চিমা মিত্রদের জন্যও খুব খারাপ একটা দিন। এখন যে প্রশ্নটা সামনে আসছে, সেটা হলো দীর্ঘ ইতিহাসের সঙ্গে মিলিয়ে বর্তমান ঘটনায় বাইডেন কীভাবে সাড়া দেবেন? ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্ক এবং ওয়াশিংটনে আল-কায়েদার সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা তঁাকে বিবেচনায় নিতে হবে। আমেরিকার মাটিতে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রাণক্ষয়ী হামলা ছিল সেটা। সেই হামলার ২০তম বার্ষিকীতে আবার আমেরিকানদের স্মৃতিতে নাড়া দেওয়া আরেকটি দিন ফিরে এল।

আমেরিকা ও দেশটির প্রেসিডেন্ট হিসেবে বাইডেনের গ্রহণযোগ্যতা আফগানিস্তানের ঘটনায় পরিষ্কারভাবে খর্ব হয়েছে। আফগানিস্তান থেকে সেনা ও নাগরিকদের প্রত্যাহারের একটা সুশৃঙ্খল কর্মপরিকল্পনা তারা নিশ্চিত করতে পারেনি।

আফগানিস্তানে শৃঙ্খলা ফেরাতে আমেরিকার দুই দশকের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। সেখানে অবাধ্য লোকদের শাসনের শৃঙ্খলায় আনতে হাজার বছর ধরে বিদেশিরা ব্যর্থ হয়েছেন। ইরাকে একটা যুদ্ধের দিকে ধাবিত হয়েছে আমেরিকা। ঐতিহ্যগতভাবে অস্থিতিশীল মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার বদলে যুদ্ধকেই বেছে নিয়েছিল তারা। যেটা পরে ওই অঞ্চলকে আরও বিশৃঙ্খলার মধ্যে নিয়ে গেছে। এসব কিছুর জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে প্রচুর অর্থ এবং রক্ত দিতে হয়েছে।

আমেরিকা ও দেশটির প্রেসিডেন্ট হিসেবে বাইডেনের গ্রহণযোগ্যতা আফগানিস্তানের ঘটনায় পরিষ্কারভাবে খর্ব হয়েছে। আফগানিস্তান থেকে সেনা ও নাগরিকদের প্রত্যাহারের একটা সুশৃঙ্খল কর্মপরিকল্পনা তারা নিশ্চিত করতে পারেনি।

কাবুল বিমানবন্দরে হামলার পর বাইডেন আবেগঘন বক্তব্য দিয়েছেন। সেই বক্তব্যের শব্দচয়ন ও আবেগ সুপারপাওয়ার যখন সন্ত্রাসী হামলার শিকার হয় তখন যে ট্রমা তৈরি হয়, তারই প্রকাশ। তিনি বলেছেন, ‘আমরা ক্ষমা করব না। আমরা ভুলে যাব না। আমরা তোমাদেরকে খুঁজে বের করব। এর জন্য তোমাদের মূল্য দিতে হবে।’ এ পরিস্থিতিতে এ ধরনের বক্তব্যই আশা করা যায়। এ ধরনের ট্রমার মুহূর্তে অন্য কোনো মার্কিন নেতা একই কাজটা করতেন।

গত রোববার বাইডেনের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জেইক সুলিভ্যান, ইসলামিক স্টেট খোরাসানের হুমকিকে তীব্র এবং দীর্ঘমেয়াদি বলে বর্ণনা করেছেন। এ বক্তব্যে কাবুল বিমানবন্দরে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি সামনে চলে আসে। যদিও এরই মধ্যে বাইডেনের বলা ‘আমেরিকার জন্য পরীক্ষা’র দিন শেষ হয়ে আসছে। আফগানিস্তান থেকে নিজেদের লোকজন সরিয়ে আনার কাজ শেষ হচ্ছে। যদিও তিক্ততার মুহূর্তগুলো তাদের পিছু ছাড়ছে না। আফগান যুদ্ধে ২ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ডলারের বিশাল ব্যয় আর ২ হাজার ৪৪২ জন আমেরিকানের মৃত্যু হয়েছে। আহত আর অন্য ক্ষয়ক্ষতির হিসাব এখানে নাই–বা বললাম।

আফগানিস্তানে আমেরিকা কখনো জয়ী হতে পারেনি। তারা সেখানে এমন এক যুদ্ধের ফাঁদে আটকে পড়েছিল, যেটা অজেয়। ২০১৯ সালে ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকায় সুরক্ষিত নথির বরাতে সংবাদ প্রকাশিত হয়। সেই সংবাদে উঠে আসে, আফগানিস্তানে অবস্থানরত সামরিক কমান্ডাররা জানিয়েছেন, তাঁরা সেখানে পরাজিত হওয়ার অবস্থানে রয়েছেন। আফগানিস্তানের পরবর্তী অধ্যায়টি হবে ইয়েমেনের মতো। গৃহযুদ্ধ দেশটিকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাবে। দারিদ্র্য জনজীবনকে খাদের কিনারায় নিয়ে যাবে।

এশিয়া টাইমস থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত

টনি ওয়াকার মেলবোর্নের লা টরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর’স ফেলো

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন