default-image

বাংলাদেশে ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কত? বাংলাদেশ ব্যাংক হিসাব দেবে, ৫০ হাজার কোটি টাকার সামান্য বেশি। আমি বলব, এটা অসত্য হিসাব। এটা শুধুই ক্লাসিফায়েড ঋণের হিসাব। এই হিসাবে অবলোপন বা রাইট অফ করা মন্দ ঋণ সুদাসলে বেড়ে ২০০২ সাল থেকে গত ১৩ বছরে কত দাঁড়িয়েছে, তার হিসাব অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। রাইট অফ করা ঋণের ২০১৫ সালের সুদাসলে স্থিতি যোগ করা হলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ নিঃসন্দেহে দুই লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে।
এখন বাংলাদেশ ব্যাংককে যদি প্রশ্ন করি, অবলোপন করা মন্দ ঋণ কি খেলাপি ঋণ নয়? তারা এই প্রশ্নের কী উত্তর দেবে জানি না। কিন্তু এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর হলো অবলোপন করা মন্দ ঋণ অবশ্যই খেলাপি ঋণ। ঋণ রাইট অফ করা মানে ঋণ মাফ করে দেওয়া নয়। ক্লাসিফায়েড ঋণের হিসাব অন্য আরেকটি লেজারে ট্রান্সফার করাই রাইট অফ করা। তাহলে এই হিসাবটা গোপন
করা হচ্ছে কেন? কারণ, অবলোপন করা খেলাপি ঋণ মোটেই আদায় করা যাচ্ছে না। বেশির ভাগ ব্যাংকই ৫ শতাংশ রাইট অফ করা মন্দ ঋণও গত ১৩ বছরে আদায় করতে পারেনি। বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকার এই মারাত্মক দুঃসংবাদটা জনগণ থেকে লুকাতে চাইছে বলেই তারা এই প্রতারণার আশ্রয় নিচ্ছে। রাঘববোয়াল ঋণখেলাপিদের গণরোষ থেকে আড়াল করাও এই তথ্য প্রকাশ না করার উদ্দেশ্য বলে মনে হয়।
ব্যাপারটা আরেকটু খোলাসা করা যাক। ২০০২ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে ব্যাংকারদের দীর্ঘদিনের দাবি পূরণ করে পাঁচ বছর বা তার চেয়েও বেশি সময়ের মন্দ ঋণ অবলোপন বা ‘রাইট অফ’ করার নীতি প্রবর্তিত হয়। ওই সময়ে খেলাপি ঋণ ব্যাংকিং খাতের মোট ঋণের প্রায় ৫০ শতাংশে পৌঁছে যাওয়ার কারণে রাঘববোয়াল ঋণখেলাপি এবং তাঁদের সঙ্গে যোগসাজশকারী ব্যাংকারদের বিরুদ্ধে সারা দেশে প্রবল জনমত সৃষ্টি হয়েছিল। বিনিয়োগপ্রবাহে স্থবিরতা কাটাতে না পারায় উন্নয়নের পথে খেলাপি ঋণকে প্রধান প্রতিবন্ধক হিসেবে বিবেচনা করা শুরু হয়েছিল ওই পর্যায়েই। তাই নব্বইয়ের দশকজুড়ে মন্দ ঋণ রাইট অফ করার নীতি প্রণয়নের জন্য ব্যাংকারদের অনেকেই সরকারের কাছে দেনদরবার করছিল। যত দিন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাসীন ছিল, তত দিন এই আবদার মেনে নেয়নি সরকার। কিন্তু ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর তদানীন্তন অর্থমন্ত্রী প্রয়াত সাইফুর রহমান উন্নত বিশ্বের দোহাই দিয়ে ঋণখেলাপিদের তদবিরে সাড়া দিয়ে রাইট অফ ব্যবস্থা চালু করেছিলেন।
এ পর্যায়ে বোঝার চেষ্টা করা যাক রাইট অফ করার মানে কী। ব্যাংকের খেলাপি ঋণ শ্রেণীকরণে সাধারণত তিনটি ক্যাটাগরি ব্যবহৃত হয়ে থাকে: সাব স্ট্যান্ডার্ড, ডাউটফুল এবং মন্দ ঋণ। নির্ধারিত মেয়াদ পার হওয়ার এক বছর বা তার বেশি সময় যে ঋণ পরিশোধ করা হয় না, ওই ঋণকে মন্দ ঋণ বা লস ক্যাটাগরিতে অন্তর্ভুক্ত করার নিয়ম রয়েছে। মন্দ ঋণের মধ্যে যেসব ঋণ পাঁচ বছর বা তারও বেশি সময় ধরে পরিশোধ করা হয়নি, সেগুলোকে অবলোপন বা ‘রাইট অফ’ করার মানে হলো ব্যাংকের মূল ব্যালান্স শিট থেকে ওই ঋণকে অন্য আরেকটি লেজারে সরিয়ে নেওয়া। এর প্রত্যক্ষ ফল হলো ক্লাসিফায়েড ঋণের পরিমাণ কম দেখানো যাবে। আর, এভাবে রাইট অফ করার জন্য অবশ্যপালনীয় শর্ত হলো ওই অবলোপন করা ঋণের শতভাগ প্রভিশনিং (সঞ্চিতি) করতে হবে, মানে ওই পরিমাণ অর্থ আর ঋণ দেওয়ার জন্য ব্যবহার করা যাবে না।
২০০২ সালে যখন রাইট অফ করার রীতি প্রবর্তিত হয়েছিল, তখন থেকে বেশ কিছু বছর ব্যাংকগুলো ‘প্রভিশনিং শর্টফল’ সমস্যায় ভুগেছিল, মানে রাইট অফ করা ঋণের শতভাগ প্রভিশনিং করলে ওসব ব্যাংকের ঋণ প্রদানের ক্ষমতা মারাত্মকভাবে সংকুচিত হয়ে যাচ্ছিল। তাই, যত মন্দ ঋণ রাইট অফ করা প্রয়োজন ছিল, ততটুকু ওসব ব্যাংক করতে পারেনি। এর মূল কারণ ছিল, শ্রেণীকৃত ঋণের প্রায় ৮৫-৮৭ শতাংশই ওই সময়ে ছিল মন্দ ঋণ এবং ওই মন্দ ঋণের ৮০ শতাংশই ছিল পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে খেলাপি মন্দ ঋণ। ১৯৯৭ সালে প্রকাশিত তালিকাভুক্ত বেশির ভাগ মন্দ ঋণ ছিল সত্তর ও আশির দশকে জিয়াউর রহমান ও এরশাদের আমলে রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রদত্ত ঋণ।
১৯৯৮ সালে আমি বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) মহাপরিচালক হিসেবে ডেপুটেশনে যোগদানের পর এ বিষয়ে একটি গবেষণা প্রকল্প শুরু করার পর সমস্যার গভীরে যাওয়ার সুযোগ পাই। আমাদের গবেষণা প্রকল্পের জরিপের ফলাফল ১৯৯৯ সালে একটি জাতীয় সেমিনারে উপস্থাপনের পর রিপোর্টে উল্লিখিত কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য-উপাত্ত নিয়ে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। ১৯ মের বিবিসি সান্ধ্য খবরে যখন ৭৭ শতাংশ ঋণখেলাপি রাজনীতিকে ব্যবহার করে ঋণ পাওয়ার খবরটা ফাঁস হয়ে যায়, তখন এটা নিয়ে খোদ সংসদে জোরালো বিতর্কের অবতারণা করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর ফলে আমাদের গবেষণা ভণ্ডুল করার জন্য তোড়জোড় শুরু হয়ে যায়। বহু বাধাবিঘ্ন অতিক্রম করে শেষ পর্যন্ত ২০০৭ সালে গবেষণাটি সম্পন্ন করতে সমর্থ হয়েছি আমরা। কীভাবে এ দেশে রাজনীতিকে ব্যবহার করে এই রাঘববোয়াল ঋণখেলাপিরা মোটা দাগের ঋণ বাগিয়ে তা আর পরিশোধ না করার ‘কালচার’ সৃষ্টি করেছেন, তার প্রামাণ্য দলিল আমার ও মহিউদ্দিন সিদ্দিকীর রচিত ২০১০ সালে প্রকাশিত এ প্রোফাইল অব ব্যাংক লোন ডিফল্ট ইন দ্য প্রাইভেট সেক্টর ইন বাংলাদেশ বইটি। বইয়ে বাংলাদেশের ১২৫টি শীর্ষ ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানের প্রোফাইল উদ্ঘাটিত হয়েছে। বইয়ের সপ্তম অধ্যায়ে দেশের ৩১ জন ‘স্টার ঋণখেলাপির’ কেস স্টাডি বর্ণিত হয়েছে, যেখানে দেশের বাঘা বাঘা ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ ও শিল্পপতিদের বিশাল বিশাল ব্যাংকঋণ হজম করে ফেলার চাঞ্চল্যকর কাহিনি বিবৃত হয়েছে। বিএনপি, জাতীয় পার্টি ও আওয়ামী লীগের অনেক নেতার এবং তাঁদের পৃষ্ঠপোষকতা-ধন্য অনেক ব্যবসায়ীর আসল চেহারাটা উন্মোচিত হয়েছে এসব কেস স্টাডিতে।
১৯৯৮ সালে বিআইবিএম আয়োজিত প্রথম নুরুল মতিন স্মারক বক্তব্য প্রদান করেছিলেন তদানীন্তন মহামান্য রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ। তাঁর বক্তৃতায় তিনি প্রতিটি ব্যাংকের শীর্ষ ১০ ঋণখেলাপিকে দ্রুত বিচারের আওতায় আনার জন্য ঋণখেলাপি ট্রাইব্যুনাল গঠনের আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু সরকার তাতে কর্ণপাত করেনি। ১৯৯৯ সালে আবার একই প্রস্তাব করেছিলেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান, সরকার সাড়া দেয়নি। বরং একটি সেমিনারে আমার এ-সংক্রান্ত বক্তব্যের জবাবে তদানীন্তন অর্থমন্ত্রী শাহ কিবরিয়া আমাকে আশ্বস্ত করেছিলেন যে অদূর ভবিষ্যতে দেশে দেউলিয়া আদালত প্রতিষ্ঠা করা হলে এই সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। এরপর দেউলিয়া আদালত আইন পাস হলো। প্রথম দেউলিয়া ঘোষিত হলেন এরশাদ সরকারের এককালীন প্রধানমন্ত্রী মিজানুর রহমান চৌধুরী। তিনি তড়িঘড়ি করে তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করে আবার আওয়ামী লীগে ফিরে আসার ঘোষণা দেওয়ায় ওই সম্পর্কে ২০০২ সালে তাঁর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কোনো তৎপরতা দেখা যায়নি। আরও দুর্ভাগ্য, খালেদা জিয়া ২০০১ সালে ক্ষমতাসীন হওয়ার পর দেউলিয়া আদালতে আর কোনো মামলার রায়ও ঘোষিত হয়নি। ১৪ বছর ধরে ওই আদালত ঘুমিয়ে আছে!
২০০১ সালের সংসদ নির্বাচন ঘনিয়ে আসার পর্যায়ে খেলাপি ব্যাংক ঋণ ক্লাসিফিকেশন এবং ঋণ পুনঃতফসিলীকরণের নিয়মকানুন বদলে ফেলা হলো। অবাক হয়ে দেখলাম, নিয়মকানুনের ফাঁকফোকর গলিয়ে সব ঋণখেলাপি সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হয়ে গেলেন। বেশির ভাগ নির্বাচিতও হয়ে গেলেন বিএনপি, আওয়ামী লীগ বা জাতীয় পার্টির টিকিটে। এরপর অনেকে বিভিন্ন ব্যাংকের পরিচালক হয়ে গেলেন। আমার জানামতে, তিনজন ব্যাংকের চেয়ারম্যানও হয়েছিলেন। এরপর এল ২০০২ সালের রাইট অফ ব্যবস্থা। পরের দুই বছর ড. ফখরুদ্দীন আহমদ বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর থাকাকালীন প্রতি তিন মাস অন্তর বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত ক্লাসিফায়েড লোনের তথ্যের সঙ্গে নিয়মিতভাবে রাইট অফ করা মন্দ ঋণের তথ্য প্রকাশ করা হতো। এর ফলে রাইট অফ করা ঋণ যে মোটেও আদায় করা যাচ্ছে না তা-ও বোঝা যাচ্ছিল। ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের সময় ২০০৫ সালে রাইট অফ করা মন্দ ঋণের তথ্য প্রকাশ রহস্যজনকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হলো। তার পর থেকে আমি বলে আসছি, এভাবে সমস্যাটাকে কার্পেটের তলায় লুকিয়ে ফেলার মানে হলো হাজার হাজার কোটি টাকার মন্দ ঋণ কয়েক শ লুটেরা পুঁজিপতিকে হজম করে ফেলার সুবন্দোবস্ত করা। জনগণের রাজনীতির কথা বলব, ইনক্লুসিভ ব্যাংকিং সম্পর্কে গলাবাজি করব আর এভাবে আমানতকারীদের অর্থ চিহ্নিত ‘রবার ব্যারন’দের লুটপাটে সহায়তা করব—এটি ভণ্ডামির নামান্তর।
সম্প্রতি ৫০০ কোটি টাকার বেশি ঋণখেলাপিদের ঋণ আদায়ের সুবিধার্থে ঋণ পুনর্গঠনের যে ব্যবস্থা গৃহীত হয়েছে, তার সাফল্য সম্পর্কে আমি তেমন আশাবাদী নই। এঁদের প্রায় প্রত্যেকের মোটা অঙ্কের রাইট অফ করা মন্দ ঋণ রয়েছে। ওই ঋণের তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছে না কেন? একই সঙ্গে সব রাইট অফ করা মন্দ ঋণের সুদাসলে স্থিতি নিয়মিতভাবে প্রকাশের দাবি জানাচ্ছি। ২০০২-০৪ পর্বে এই তথ্য প্রকাশ করা গেলে এখন যাবে না কেন? কোনো সাংসদ যদি রাইট অফ করা মন্দ ঋণের পুরো তালিকাসহ চিত্রটা অর্থমন্ত্রীর কাছে জানতে চান, তাহলে তিনি দিতে বাধ্য হবেন। কেউ কি সাড়া দেবেন?
ড. মইনুল ইসলাম: অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

বিজ্ঞাপন
কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন