default-image

অসাধ্য সাধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। কাশ্মীরি রাজনীতিকদের তিনি এক ছাতার তলায় টেনে এনেছেন। এযাবৎ কখনো এমন হয়নি। এক দল ডান দিকে গেলে অন্য দল বাঁ দিকের পথিক হতো। ক্ষমতার হাতছানি অদ্ভুত ধরনের জোটবদ্ধতার তাগিদ দিত। সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ রদ ও রাজ্য দ্বিখণ্ডকরণ সেই চেনা চালচিত্র অবিশ্বাস্যভাবে বদলে দিয়েছে। অস্তিত্বের সংকট বাঘ ও গরুকে এক ঘাটে জড়ো করেছে। এই জোটবদ্ধতা মোদি সরকারের নবতম চ্যালেঞ্জ।

জম্মু-কাশ্মীরের নব অধ্যায়ের এ এক অভিনব রাজনৈতিক বিন্যাস। কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা প্রত্যাহার করা হয় ২০১৯ সালের ৫ আগস্ট। তার কিছুদিন আগে মোতায়েন হয় অর্ধ লাখ বাড়তি জওয়ান। বাতিল করা হয় অমরনাথ যাত্রা। পর্যটকদের বলা হয় দ্রুত উপত্যকা ছাড়তে। গুরুতর কিছু ঘটতে চলেছে আঁচ পেয়ে শ্রীনগর থেকে তড়িঘড়ি দিল্লি এসে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেন ফারুক আবদুল্লাহ ও ওমর আবদুল্লাহ। কী আশ্বাস নিয়ে তাঁরা ফিরেছিলেন পিতা ও পুত্রের কেউ আজও খোলাসা করেননি। কিন্তু দেখা গেল, উপত্যকায় প্রত্যাবর্তনের তিন দিন পর রাজ্য শুধু দ্বিখণ্ডিতই হলো না, খারিজ হয়ে গেল ৩৭০ অনুচ্ছেদও। সেদিনই বন্দী হলেন তিন সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ফারুক, ওমর, মেহবুবা মুফতিসহ সব রাজনৈতিক দলের কয়েক শ নেতা ও কর্মী। উপত্যকার জনজীবন স্তব্ধ হলো। বিচ্ছিন্ন হলো বহির্বিশ্বের সঙ্গে সব যোগাযোগ।

বিজ্ঞাপন

ঠিক তার আগের দিন, ৪ আগস্ট, ভিন্নমতের ছয় রাজনৈতিক দলের নেতারা শ্রীনগরের গুপকর রোডে ফারুক আবদুল্লাহর বাসভবনে মিলিত হয়ে রাজ্যের বিশেষ মর্যাদা রক্ষার অঙ্গীকার নিয়েছিলেন। সেটাই ছিল ‘গুপকর ঘোষণা’। চৌদ্দ মাস পর সেই ঘোষণাই এখন সব দলের একজোট হওয়ার অনুঘটক; রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের একমাত্র হাতিয়ার। ১৩ অক্টোবর মেহবুবা মুফতির মুক্তির পরদিন ফারুক ও ওমর যান তাঁর গৃহে। ১৫ অক্টোবর গুপকর রোডে ফারুকের বাসভবনে উপত্যকার নেতারা ‘গুপকর ঘোষণার’ বাস্তবায়নে শপথ নিলেন। ন্যাশনাল কনফারেন্সের ফারুক ও ওমরের পাশে দাঁড়ালেন পিডিপির মেহবুবা মুফতি, পিপলস কনফারেন্সের সাজ্জাদ লোন, পিপলস মুভমেন্ট নেতা জাভেদ মীর ও সিপিএমের মহম্মদ ইউসুফ তারিগামি। ফারুক বললেন, ‘আজ থেকে এই জোটের নাম হলো পিপলস অ্যালায়েন্স ফর গুপকর ডিক্লারেশন। আমাদের এই লড়াই সংবিধান রক্ষার, ছিনিয়ে নেওয়া সাংবিধানিক অধিকার ও মর্যাদা ফেরানোর।’ সেদিনই শুরু উপত্যকার নয়া উপাখ্যানের নবতম পর্ব।

উপত্যকায় এভাবে জোটবদ্ধতার নজির অভূতপূর্ব। ২০১৯ সালের ৪ আগস্টের ‘গুপকর ঘোষণায়’ দুই জাতীয় দল কংগ্রেস ও সিপিএমও সই করেছিল। ২০২০ সালের ১৫ অক্টোবর ‘গুপকর ঘোষণার’ বাস্তবায়নে শপথ নেওয়ার দিন কংগ্রেস উপস্থিত না থাকলেও প্রকারান্তরে এই উদ্যোগকে সমর্থন করেছে। কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির সিদ্ধান্তের কথা মনে করিয়ে দিয়ে শীর্ষ নেতা পি চিদাম্বরম জানিয়েছেন, ৩৭০ অনুচ্ছেদ ছিল কাশ্মীরের ভারতভুক্তির সাংবিধানিক স্বীকৃতি। সংবিধানের শর্ত মেনে সব মহলের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষেই তা রদ হতে পারে। বাস্তবে যা হয়নি। কংগ্রেস সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্ত জানার অপেক্ষায় রয়েছে।

কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের সাংবিধানিক বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টে বহু মামলা রুজু হয়েছে। মহামান্য আদালত কবে ফয়সালা করবেন এখনো অজানা। বিচারাধীন হলেও সিদ্ধান্ত রূপায়ণে কেন্দ্রীয় সরকার কিন্তু বসে নেই। মোকাবিলায় উপত্যকা জোটবদ্ধ। সেটাই কেন্দ্রের ললাটের নতুন আঁকিবুঁকি।

কাশ্মীরের রাজনীতি ছিল প্রধানত কংগ্রেস ও ন্যাশনাল কনফারেন্সের মধ্যে বিভাজিত। কংগ্রেস ছেড়ে মুফতি মহম্মদ সঈদ পিডিপির জন্ম দিলে লড়াই হয় ত্রিমুখী। বিজেপির ছাপ জম্মুর বাইরে কোনোকালেই ছিল না। আজও নেই। মেহবুবার হাত ধরে প্রথমবারের মতো ক্ষমতায় এলেও অঙ্গীকার পূরণের তাগিদ তাদের কুর্সিছাড়া করে। ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের দিন প্রধানমন্ত্রীর দৃপ্ত ঘোষণা ছিল কাশ্মীরকে ‘তিন পরিবারের কবজা থেকে মুক্ত করা’। সেই তিন পরিবার তো বটেই, নতুন জোটবদ্ধতা সরকারের বলিরেখা গাঢ় করেছে।

মোকাবিলায় কেন্দ্র আঁকড়ে ধরেছে বহু চেনা ছক। জোটের ঘোষণা মাত্র শুরু হয়েছে পুরোনো এক দুর্নীতি মামলার নতুন তদন্ত। রাজ্য ক্রিকেট সংস্থার সভাপতি থাকাকালীন ৪৩ কোটি টাকা তছরুপের অভিযোগে ৮৪ বছরের ফারুককে জেরা শুরু করেছে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)। দুই বছর আগে ফারুককে চার্জশিট দিয়েও সিবিআই এত দিন গা করেনি। এখন শুরু নতুন নড়াচড়া। মেহবুবাসহ নতুন জোটের সবাই কেন্দ্রীয় এই পদক্ষেপ ‘রাজনৈতিক দুরভিসন্ধি’ বলে বর্ণনা করেছেন। বলেছেন, ভয় দেখিয়ে তাঁদের লক্ষ্যচ্যুত করা যাবে না।

বিজ্ঞাপন

সরকার যদিও লক্ষ্যে অবিচল। সেদিন সরকারি পেয়াদারা দুটি সংবাদপত্রের অফিসে তালা ঝুলিয়ে দিল। দুটিই সরকারের সমালোচক। রাজনৈতিক নেতারা মুক্তি পেলেও রাজনীতির আবহ সৃষ্টি করা হচ্ছে না। বরং, রাজনীতির অবসানে পঞ্চায়েতিরাজ আইন সংশোধন করে জেলা উন্নয়ন পর্ষদ গঠনের তোড়জোড় চলছে। এটা হয়ে গেলে তৃণমূল স্তরের প্রশাসনিক অধিকার সরাসরি চলে যাবে কেন্দ্রের আওতায়। বিধানসভা নির্বাচনও ঠেকিয়ে রাখা যাবে অনির্দিষ্টকাল।

জম্মু-কাশ্মীর বিধানসভার আসনবিন্যাস অদ্ভুত। মোট ১১১টি আসনের মধ্যে লাদাখে রয়েছে ৪টি। রাজ্য দ্বিখণ্ডীকরণের ফলে মোট আসন কমে দাঁড়াচ্ছে ১০৭। এর মধ্যে উপত্যকার আসন ৪৬, জম্মুর ৩৭, ২ জন মনোনীত, বাকিগুলো পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরের, দেশভাগের পর যারা কোনো ভারতীয় নির্বাচনে অংশ নেয়নি। মোদি সরকার কেন্দ্র পুনর্গঠন করে সাতটি আসন বাড়াবে বলেছে। উদ্দেশ্য আসন বণ্টনে তারতম্য আনা, যাতে উপত্যকার প্রাধান্য খর্ব হয়।

১৪ মাস আগে কাশ্মীরে নব অধ্যায়ের সূচনা করেছে মোদি সরকার। উপত্যকার রাজনীতিকদের জোটবদ্ধতা সেই অধ্যায়ের একটা নতুন বাঁক। স্বাভাবিকতা এখনো দূর অস্ত। বরং জনপ্রিয় হিন্দি সিনেমার বুলি ধার করে বলা যায়, ‘পিকচার আভি বাকি হ্যায়, দোস্ত’।

সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়: প্রথম আলোর নয়াদিল্লি প্রতিনিধি

মন্তব্য পড়ুন 0