বাংলাদেশ নামটার সঙ্গেই রয়েছে তারুণ্যের গভীর যোগসূত্র, দেশটা একদা স্বাধীন করেছিল একঝাঁক প্রাণবন্ত তরুণ-তরুণী। আজকে অর্ধশত বছর পার হওয়া দেশটির অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তিও এই তরুণসমাজ। ইউএনএফপিএর হিসাব অনুযায়ী, ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী জনগোষ্ঠী এ দেশের মোট জনসংখ্যার ২০ শতাংশ। এই তরুণসমাজের জন্য সঠিক উন্নয়ন ব্যবস্থাপনা এবং পরিকল্পনাই নির্ধারণ করে দেবে, এই বিপুল তারুণ্য আসলে দেশের শক্তি, সম্ভাবনা, নাকি বোঝা। আমরা যে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা জনমিতিক লভ্যাংশের কথা বলছি, এদের কাজে লাগাতে পারলেই আমরা সেই লভ্যাংশের যথাযথ সুবিধা ভোগ করতে পারব।

প্রশ্ন হচ্ছে এই বিপুল জনগোষ্ঠীর শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আমাদের প্রস্তুতি কী? বহু উন্নয়ন সূচকে বাংলাদেশ এগিয়েছে, কিন্তু প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়ে অগ্রগতি কতটা আশাব্যঞ্জক? ধরা যাক বাল্যবিবাহের কথা, আইন করেও কি এটা কমানো যাচ্ছে? না। বরং এই কোভিডকালে বাল্যবিবাহ উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। বাল্যবিবাহের সঙ্গে কিশোরীর প্রজনন স্বাস্থ্য অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। কিন্তু এটা গুরুত্ব পায় না। একেকটা বাল্যবিবাহ মানে একটা সম্ভাবনার মৃত্যু। এরপর যদি বলি মাসিক বা ঋতুস্রাবের কথা, এ যেন এক নিষিদ্ধ শব্দ।

বিজ্ঞাপন
default-image

‘ঋতু অনলাইন ডট ওআরজি’ নামের (rituonline.org) এক গবেষণা প্রকল্প বলছে, এখনো এদেশে স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহারকারী কিশোরী হার মাত্র ১৫ শতাংশ কিশোরী। উপযুক্ত মাসিক ব্যবস্থাপনার অভাবে কিশোরীরা বিভিন্ন কর্মোদ্যমে পিছিয়ে পড়ছে, আত্মবিশ্বাস হারাচ্ছে। আমরা তাহলে কীভাবে নিরোগ ও আত্মবিশ্বাসী নারী জনগোষ্ঠী পাব?

অধিকাংশ কিশোর-কিশোরীর বয়ঃসন্ধির ব্যাপারে যথেষ্ট ধারণা নেই। তারা জানেও না সঠিক ও প্রয়োজনীয় তথ্য ও সেবা তথ্য কোথায় পাওয়া যায়। স্কুলের বইতে শুধু একটি অধ্যায়েই কৈশোরকালীন শারীরিক অবস্থা নিয়ে আলোচনা রয়েছে, যা মাসিক ও বয়ঃসন্ধি নিয়ে নিতান্তই লঘু আলোচনাতেই সীমাবদ্ধ। খুব কমসংখ্যক স্কুলে মাসিকবান্ধব প্রক্ষালন সুবিধা আছে, কাগজে–কলমে সে সুবিধা থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে আছে কতটা, তা প্রশ্নসাপেক্ষ। ছেলেদের বয়ঃসন্ধকালীন শারীরিক পরিবর্তন নিয়েও আমরা নীরব। মনোদৈহিক পরিবর্তন ও প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনা বা জানার বিষয়টা তাদের জন্য সীমাবদ্ধ থাকে মূলত বন্ধুদের আলাপচারিতায় আর স্কুলের শারীরিক শিক্ষা বইয়ের একটি অধ্যায়ে।

বিভিন্ন গবেষণা কার্যক্রমে বারবারই উঠে আসছে কিশোর-কিশোরী ও তরুণসমাজের যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রমে সরবরাহের অপ্রতুলতার কথা। তাদের মধ্যে নিজেদের শরীর সম্বন্ধীয় পরিষ্কার ধারণারও ঘাটতি রয়েছে। নেই সচেতনতা সৃষ্টির পর্যাপ্ত প্রয়াস, কিংবা স্কুল ও স্কুলের শিক্ষকদের সে সম্পর্কিত যথাযথ উদ্যোগ। কিশোর–কিশোরীদের জন্য উন্নত স্বাস্থ্যসেবা কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়, বৈশ্বিক উন্নয়ন অভীষ্ট বা এসডিজি অর্জনের সঙ্গেও এটা ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

উন্নত প্রজনন স্বাস্থ্যসেবাকে অবহেলা এবং এ সম্পর্কিত সামগ্রিক অসচেতনতা সমাজে বয়ে এনেছে বাল্যবিবাহ, লিঙ্গ-অসমতা, নারীর প্রতি সহিংসতা, মানসিক বিকৃতি ইত্যাদি বিভিন্ন সামাজিক ব্যাধি। তাই কৈশোর ও তারুণ্যবান্ধব সামাজিক পরিবেশ সৃষ্টি করা প্রয়োজন। শুধু তাত্ত্বিকভাবে নয়, বাস্তবিক প্রাত্যহিক জীবনে এর প্রচার ও প্রস্তুতি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। যথাযথ সুবিধাভোগী পর্যায়ে বিশেষত ইউনিয়ন/গ্রাম পর্যায়ে এই সচেতনতা ও সেবা পৌঁছে দেওয়া প্রয়োজন। বিজ্ঞানসম্মতভাবে যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য অধিকার ও জ্ঞান নিয়ে কথা বলা, চর্চার পরিবেশ তৈরি করা সময়ের দাবি। এই সচেতনতার কার্যক্রম হতে হবে আনন্দময়।

আশার দিক হচ্ছে, সরকারি পর্যায়ে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং হচ্ছে। যেমন, শিগগিরই পাস হতে যাচ্ছে এডোলেসেন্ট হেলথ স্ট্র্যাটেজি ২০২০। তবে আইন ও নীতিমালা কতটুকু তৃণমূল ও প্রান্তিক পর্যায়ে পৌঁছতে সক্ষম হচ্ছে, সেটাও দেখার বিষয়। যেমন সরকারের পঞ্চবার্ষিক (২০১৬-২০) পরিকল্পনায় কিশোর বয়সী ছেলেদের ও অবিবাহিত কিশোরীদের জন্য কোনো নির্দিষ্ট স্বাস্থ্যসেবার নির্দেশনা নেই। জাতীয় কিশোর-কিশোরী স্বাস্থ্য নীতিমালা ২০১৭-৩০ (এনএসএএইচ)-এ তৃতীয় লিঙ্গ, মিশ্র লিঙ্গ ও পরিবর্তনশীল লিঙ্গের কিশোর বয়সীদের কথারও কোনো উল্লেখ নেই। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যখন সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও নেতৃত্ব প্রদানের ক্ষেত্রে যুবসমাজের আরও বেশি অন্তর্ভুক্তির কথা বলেন, তখন কিশোর–তরুণ জনগোষ্ঠীর মনোদৈহিক স্বাস্থ্যের বিষয়টিও বিশেষ গুরুত্ব দাবি করে।

উন্নত প্রজনন স্বাস্থ্যসেবাকে অবহেলা এবং এ সম্পর্কিত সামগ্রিক অসচেতনতা সমাজে বয়ে এনেছে বাল্যবিবাহ, লিঙ্গ-অসমতা, নারীর প্রতি সহিংসতা, মানসিক বিকৃতি ইত্যাদি বিভিন্ন সামাজিক ব্যাধি। তাই কৈশোর ও তারুণ্যবান্ধব সামাজিক পরিবেশ সৃষ্টি করা প্রয়োজন। শুধু তাত্ত্বিকভাবে নয়, বাস্তবিক প্রাত্যহিক জীবনে এর প্রচার ও প্রস্তুতি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বিজ্ঞাপন

সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন সরকারি–বেসরকারি সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান এই ক্ষেত্রে কাজ করছে। এরকম একটি প্ল্যাটফর্ম হচ্ছে শেয়ার-নেট বাংলাদেশ। নেদারল্যান্ডস সরকারের সহায়তায় রেড অরেঞ্জ নামের একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার উন্নয়ন কর্মের সঙ্গে একযোগে শেয়ার-নেট বাংলাদেশ দেশের বিভিন্ন সরকারি–বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে একটা কমন প্ল্যাটফর্মে এনে কিশোর–কিশোরীদের প্রজনন স্বাস্থ্যবিষয়ক সচেতনতার প্রসার ঘটাতে কাজ করছে। কৈশোর ও তারুণ্যবান্ধব যৌন-প্রজননস্বাস্থ্য বিষয়ে এই প্ল্যাটফর্ম আগামী ৬ ডিসেম্বর আয়োজন করছে বার্ষিক নলেজ ফেয়ার বা জ্ঞান মেলার। এই মেলায় অংশ নেবে বিভিন্ন সরকারি–বেসরকারি সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তিত্ব এবং কিশোর-কিশোরী ও তরুণ-তরুণীরা।

এই জ্ঞানের মেলায় কিশোর-কিশোরীরা যুক্ত হয়ে নিজেদের জানতে শিখবে বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে, গড়ে তুলবে সুস্থ ভবিষ্যৎ। বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে কথা বলবে; কিশোর–কিশোরীদের প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনা করবে, প্রতিবাদ করবে লিঙ্গ-অসমতার বিরুদ্ধে, জনমত গড়বে নারীর প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে।

মাসুমা বিল্লাহ্ ও ফারাহ নুসরাত : উন্নয়ন যোগাযোগ পেশাজীবী

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন