বিজ্ঞাপন

ভবিষ্যতের ডিজিটাল শিক্ষাব্যবস্থা কোনো দেশ বা গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। করোনা-পরবর্তী সময়ে শিক্ষাব্যবস্থা না হবে পুরোপুরি অনলাইন, না থাকবে ট্র্যাডিশনাল। বরং অনেকাংশে ফিজিটাল (ফিজিক্যাল+ডিজিটাল) হতে পারে। চিরায়ত শিক্ষাব্যবস্থা থেকে নতুন পদ্ধতিতে বদলে যাওয়া কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্যই সহজ নয় এবং দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের দেশের বেশির ভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে অনেকাংশে ব্যর্থ হয়েছে। আনলার্নিং শিখতে না পারা, নিম্নগতির ইন্টারনেট, মানুষের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি, আর্থসামাজিক অবস্থা, দক্ষ জনবলের অভাব, জবাবদিহির প্রতি অনীহা, অবকাঠামোগত সমস্যা, পেশাদারি দক্ষতা বাড়াতে শিক্ষকদের অনাগ্রহ এবং পরিশেষে এই বিষয়ে প্রয়োজনীয় পলিসির এবং তার প্রয়োগের অভাব—এই ব্যর্থতার কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম।

‘ডিজিটাল বাংলাদেশ ও উচ্চশিক্ষা রূপকল্প’ আমাদের জন্য একটি বিরাট সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে পারে। এখন রূপকল্পটির বিভিন্ন দিক একে একে তুলে ধরছি।

এক. আমাদের তৈরি পোশাকশিল্প যেমন স্বল্প ব্যয়ে ভালো মানের পণ্য তৈরি করে, ঠিক তেমন একটা ধারণা। আমেরিকায় শুধু শিক্ষার্থীপ্রতি টিউশন ফি প্রতিবছর ৫০ হাজার ডলার, অস্ট্রেলিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ৩০ হাজার ডলারের বেশি। বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্ষেত্রে এর পরিমাণ বছরে মাত্র ১৫০ ডলার এবং প্রাইভেটে শিক্ষার্থীপ্রতি সম্ভবত বছরে ১ হাজার ৫০০ ডলার। দেশীয় শিক্ষার্থীদের জন্য কোনো অতিরিক্ত ফি আরোপ না করে শুধু বিদেশি শিক্ষার্থী, যারা অনলাইন বা প্রচলিত পদ্ধতিতে পড়বে, তাদের কাছ থেকে বছরে ৫-১০ হাজার ডলার পর্যন্ত টিউশন ফি নেওয়া যেতে পারে।

বাংলাদেশ ডিজিটালি অনেক ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করলেও অনলাইন ডিজিটাল শিক্ষা খাতের উন্নতি তেমন আশানুরূপ নয়।

দুই. আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বর্তমান অবকাঠামোর মধ্যে ২ থেকে ৫ গুণ শিক্ষার্থী বাড়ানো যেতে পারে। যেমন অনেক আমেরিকান ও অস্ট্রেলিয়ান ইউনিভার্সিটিতে ৯০ থেকে ১০০ জন শিক্ষার্থী সরাসরি ক্লাসে অংশগ্রহণ করে এবং একই সঙ্গে প্রায় ৫০০ শিক্ষার্থী পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গা থেকে অনলাইনে ওই ক্লাসে অংশগ্রহণ করে। সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার এবং সবার জন্য মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে আমাদের এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। যেমন আমাদের রেমিট্যান্স-যোদ্ধারা দূর পরবাসে থেকেও স্বল্প মূল্যে ভাষা ও দক্ষতাভিত্তিক সার্টিফিকেট বা ডিগ্রি সম্পাদন করে নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে আরও বেশি সুযোগ-সুবিধা পেতে পারে।

তিন. কারিগরি উপাদানসহ কর্মদক্ষতামূলক কারিকুলাম তৈরি করতে হবে। প্রত্যেক স্নাতক শিক্ষার্থীর একটি টেকনিক্যাল এবং ভোকেশনাল দক্ষতা থাকতে হবে, যেমন অটোমোবাইল, ইলেকট্রিক্যাল ওয়্যারিং, গ্রাফিকস, ভিডিও এডিটিং, অ্যানিমেশন ইত্যাদি যেন তারা ভবিষ্যতের জন্য তৈরি হতে পারে। তখন তারা চাকরির জন্য অপেক্ষা না করে বরং অন্যদের চাকরি দেয়।

চার. শিক্ষকেরা প্রথাগত ক্লাসরুমে ৫০-১০০ জন শিক্ষার্থীকে শিক্ষা দেবেন এবং টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্ট বা লার্নিং অ্যাডভাইজাররা ৫০০ শিক্ষার্থীকে অনলাইনে শিক্ষা অর্জনে সাহায্য করবেন। ৫০০ শিক্ষার্থীর জন্য ২০ জন টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্ট যথেষ্ট এবং এতে শিক্ষার্থীদের শেখাটা ভালো হবে। এ ছাড়া অনেক লার্নিং ডিজাইনার ও টেকনোলজিস্টের কাজের সুযোগ তৈরি করবে এই পদ্ধতি।

পাঁচ. করদাতা অভিভাবকের আয় ও শিক্ষা প্রোগ্রামের প্রয়োজনীয়তার ওপর ভিত্তি করে শিক্ষার্থীদের ঋণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। উচ্চশিক্ষা ঋণ কর্মসূচি অনেক রকমের হতে পারে, যেমন সম্পূর্ণ বিনা খরচে, আংশিক সরকারি অনুদানে এবং সম্পূর্ণ খরচসহ। গ্র্যাজুয়েশনের পর যখন কোনো শিক্ষার্থী চাকরি পাবে বা স্বনির্ভর হবে এবং তার উপার্জনক্ষমতা প্রতি মাসে ন্যূনতম একটি অবস্থানে আসবে, তখন সে শিক্ষাঋণ পরিশোধ করতে শুরু করবে।

ছয়. সন্তানসন্ততিদের সুন্দর ভবিষ্যতের আশায় নাগরিকেরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে এবং ডিজিটাল পদ্ধতিতে ট্যাক্স দিতে আগ্রহী হবে। উচ্চশিক্ষা ঋণ পেতে শিক্ষার্থীর মা-বাবা অথবা অভিভাবককে অবশ্যই আয়কর রিটার্ন জমা দিতে হবে। অন্যথায় তারা উচ্চশিক্ষায় ঋণসুবিধা থেকে বঞ্চিত হবে।

সাত. আমাদের স্নাতক শিক্ষার গুণগত মান এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত তুলনামূলকভাবে ভালো হলেও বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা কম হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আন্তর্জাতিক র‍্যাঙ্কিংয়ে পিছিয়ে পড়ছে। ২০২১ সালের টাইমস হায়ার এডুকেশন র‍্যাঙ্কিংয়ে কেবল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং বুয়েট বিশ্বের ১০০১ প্লাস বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে অবস্থান করে নিতে পেরেছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই শীর্ষ দুটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদেশি শিক্ষার্থীর পরিমাণ শতকরা ৩ ভাগ এবং বুয়েটে শূন্য। অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এর পরিমাণ ৪০ ভাগের কাছাকাছি। ফলে তারা এই বিদেশি শিক্ষার্থী থেকে বছরে যেমন বিলিয়ন ডলার আয় করছে, তেমনি ব্যাটিংয়েও ভালো করছে।

আট. যখন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিদেশি শিক্ষার্থী ও আন্তর্জাতিক গবেষণা তহবিল থেকে আয় করতে পারবে, তখন তারা বিদেশ থেকে ভিজিটিং প্রফেসর এবং স্কলার, বিশেষ করে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত যারা টিচিং এবং রিসার্চ উভয় ক্ষেত্রে সমানভাবে দক্ষ, তাদের নিয়ে আসতে সক্ষম হবে। ফলে আমাদের স্নাতকোত্তর পর্যায়ে শিক্ষা-গবেষণা ও প্রকাশনা আরও উন্নত হবে, গবেষণায় আন্তর্জাতিক অর্থায়ন এবং আন্তর্জাতিক পরিচিতি বাড়বে।

নয়. শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয়ের জন্য একটি প্রতিযোগিতামূলক কিন্তু অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত হবে। সব বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য কোর্স এবং প্রোগ্রাম অফার করা উচিত হবে না। টাইমস হায়ার এডুকেশনের মতো আমাদের জাতীয় পর্যায়েও একটি র‍্যাঙ্কিং ব্যবস্থা থাকা উচিত।

এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে আমাদের নীতিনির্ধারকদের উচিত অবিলম্বে অনলাইন ডিজিটাল শিক্ষানীতি নিয়ে নতুন করে চিন্তাভাবনা শুরু করা। দেশের সম্ভাবনাময় প্রতিষ্ঠানগুলো যাতে নিজস্ব চাহিদা মিটিয়ে বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে একটি ব্র্যান্ডে পরিণত করতে পারে, তার জন্য যথোপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

ড. মো. আকতারুজ্জামান ডিজিটাল শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ব্লেন্ডেড লার্নিং সেন্টারের পরিচালক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন