default-image

১৫ মার্চ প্রথম আলোয় ‘কূটনীতিতে সাফল্যের সঙ্গে আছে হতাশাও’ শিরোনামের প্রকাশিত লেখাটি আমি আগ্রহের সঙ্গে পড়েছি। আমাদের সাবেক এক পররাষ্ট্রসচিব মো. তৌহিদ হোসেন স্বল্প পরিসরে বাংলাদেশের কূটনীতির সাফল্য ও ব্যর্থতা মোটামুটি সঠিকভাবেই তুলে ধরেছেন। এ জন্য তাঁকে আমি ধন্যবাদ ও অভিনন্দন জানাই। তবে তাঁর এই লেখার মোট সাত পর্বের প্রথম পর্বে ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য কিছুটা উপেক্ষিত হয়েছে বলে মনে হওয়ায় তাঁর ব্যাখ্যায় আমার এই চিঠি।

একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধকালে কলকাতায় পাকিস্তান ডেপুটি হাইকমিশনে কর্মরত বাঙালি কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা, সংখ্যায় মোট কর্মকর্তা–কর্মচারীদের ১০৫ জনের মধ্যে ৬৫ জন, ১৯৭১ সালের ১৮ এপ্রিল বাঙালি ডেপুটি হাইকমিশনার হোসেন আলীর নেতৃত্বে মুজিবনগর সরকারের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করার যে দৃঢ়সংকল্প ব্যক্ত করেন, তা অবশ্যই আমাদের মুক্তিযুদ্ধের একটি মাইলফলক। কিন্তু এ প্রসঙ্গে সমান গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনা ছিল ১৯৭১ সালের ৬ এপ্রিল নয়াদিল্লিতে পাকিস্তান হাইকমিশনে কর্মরত দুই তরুণ বাঙালি কূটনীতিবিদ সেকেন্ড সেক্রেটারি কে এম শিহাবুদ্দীন ও অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রেস অ্যাটাচি আমজাদুল হকের বাংলাদেশে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর গণহত্যার প্রতিবাদে এবং নিন্দায় মুক্তিযুদ্ধের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা। লক্ষ করার বিষয়, মুজিবনগর সরকার তখনো গঠিত হয়নি, এই সরকার গঠিত হয় ১০ এপ্রিল এবং প্রকাশ্যে শপথ নেয় মেহেরপুরের আম্রকাননে, ১৭ এপ্রিল।

বিজ্ঞাপন

দিল্লিতে এই দুই তরুণ কূটনীতিবিদ ৬ এপ্রিল যে ইতিহাস সৃষ্টি করলেন, এর আগে এমনটি আর কোথাও ঘটেনি। বরং আমার মনে হয়, কলকাতাসহ আরও ১৯টি পাকিস্তান দূতাবাসে যে ১১৫ জন বাঙালি অফিসার এবং স্টাফ মুক্তিযুদ্ধ ও মুজিবনগর সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেছিলেন, তাঁদের প্রায় সবাই নয়াদিল্লির এই দুই বাঙালি কূটনীতিবিদের উদাহরণে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। পরে মুক্তিযুদ্ধের এই কূটনৈতিক ফ্রন্টে আমরা তিনজন বাঙালি রাষ্ট্রদূতকেও পেয়েছিলাম—(১) ইরাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত আবুল ফতেহ, (২) আর্জেন্টিনায় আবদুল মোমেন এবং (৩) ফিলিপাইনে কে কে পন্নী।

মুক্তিযুদ্ধের কূটনৈতিক ফ্রন্টে বাঙালি কূটনীতিবিদের স্বীকৃতিতে ছয়জন ক্যারিয়ার বাঙালি অফিসার দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার স্বাধীনতা পদকেও ভূষিত হয়েছেন—ওয়াশিংটনে পাকিস্তান দূতাবাসের ডেপুটি চিফ অব মিশন এবং পরে পররাষ্ট্রসচিব এনায়েত করিম, (১৯৭৭) কলকাতায় ৭১-এ ডেপুটি হাইকমিশনার হোসেন আলী (১৯৮৭), পররাষ্ট্রসচিব এবং পরে অর্থমন্ত্রী শাহ কিবরিয়া (২০১৫), কে এম শিহাবুদ্দীন (২০১৬), পররাষ্ট্রসচিব এবং পরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী (২০১৮) এবং আমজাদুল হক (২০১৮)। পররাষ্ট্র দপ্তরের বাইরে মুক্তিযুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবদানের জন্য স্বাধীনতা পুরস্কার পেয়েছেন এম এ মুহিত (২০১৬) এবং যুক্তরাজ্যে এ কে এম আবদুর রউফ (২০১৬)।

কে এম শিহাবুদ্দীনের লেখা দেয়ার অ্যান্ড ব্যাক অ্যাকুইন (প্রকাশক: ইউপিএল) বইটির শেষ দিকে এই ১১৫ জন বাঙালি কূটনীতিবিদ ও কর্মীর তালিকা পাবেন। এই তালিকায় মুক্তিযুদ্ধের কূটনীতি ফ্রন্টের এই ১১৫ জনের কে কোন পাকিস্তান দূতাবাস থেকে কোন তারিখে তাঁদের আনুগত্য প্রকাশ করেছিলেন, তারও উল্লেখ আছে।

মো. তৌহিদ হোসেন বিদেশে কর্মরত আমাদের কূটনীতিবিদের ওপর আরোপিত কিছু দুঃসাধ্য, অকূটনৈতিক কাজের উল্লেখ করেছেন। এর একটি হচ্ছে অবৈধ, অগণতান্ত্রিক, আধা গণতান্ত্রিক, হাইব্রিড গণতান্ত্রিক এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী সরকারগুলোর প্রধানদের জন্য বৈধতা বা গ্রহণযোগ্যতা জোগাড় করা। গণতান্ত্রিক ও অগণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে বাংলাদেশ দখলকারী এই সরকারগুলোর নেতা-মন্ত্রীরা বুঝতে চান না যে ওই সব দেশের রাষ্ট্রদূত এবং দূতাবাসও তো ঢাকা শহরে আছে। তারা ডেইলি স্টার, প্রথম আলোও পড়ে। আর আছে বিদেশি সংবাদমাধ্যম ও আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর বাংলাদেশ প্রতিনিধিরা। দেশের মহা উন্নয়নের এক প্রতীক ওভারপাসের গার্ডার যদি দিনদুপুরে প্রকাশ্যে বিকট শব্দে ভেঙে পড়ে, বিদেশে কর্মরত কোনো বাংলাদেশি রাষ্ট্রদূত তা চাপা দিতে পারবেন?

মহিউদ্দিন আহমদ সাবেক সচিব

বিজ্ঞাপন
কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন