বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

ডিজেলের দাম হঠাৎ আকাশচুম্বী হওয়ায় কৃষক যখন চোখে শর্ষে ফুল দেখছেন, তখন খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার বলে বেড়াচ্ছেন, ‘কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে, আর দেশ বাঁচলে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে বিশ্বের অন্যতম উন্নত দেশের কাতারে দাঁড়াবে।’ কৃষককে নিয়ে এর চেয়ে বড় তামাশা-মশকরা আর কী হতে পারে? ভিড়ের মধ্যে বসে থাকা কোনো চিন্তাক্লিষ্ট মুখ মন্ত্রীর নজরে হয়তো পড়ে থাকবে, তাই বুঝি তিনি তেলের দাম বাড়ানোর যুক্তি দেন সঙ্গে সঙ্গে ‘আমাদের দেশে তেলের দাম কম থাকায় পাচার হয়ে যেত। আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় রেখে দেশে ডিজেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। এতে কৃষক কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন; তবে কৃষকবান্ধব সরকার কৃষককে প্রণোদনার মাধ্যমে সে ক্ষতি পুষিয়ে নিতে সাহায্য করবে।’এটি আরেকটি মশকরা।

ভাগ্যিস ভাসানীর মতো সাহসী কোনো চাষি সেখানে উপস্থিত ছিলেন না, তাহলে হয়তো জানতে চাইতেন, ‘কেন আমাদের খাজনার টাকায় এত বাজনা বাজিয়ে সীমান্তরক্ষী রাখা।’ কিংবা ‘চোরের ভয়ে আমরা কত দিন আর মাটিতে ভাত খাব।’ এখন বিশ্ববাজারের দোহাই দিয়ে দাম বাড়ানোকে ‘হালাল’ করা হচ্ছে। কিন্তু গত সাত-আট বছর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কম থাকলেও তখন দেশে জ্বালানির দাম কি আমরা সেভাবে তাল রেখে কমিয়েছিলাম? এত বছরের হাজার হাজার কোটি টাকা মুনাফা কি হালাল ছিল? সেই লাভের টাকা কোথায় গেল? সেটা দিয়ে কি তেলের দাম কৃষকের সাধ্যের মধ্যে রাখা যেত না।

আমাদের সবচেয়ে নিশ্চিত কৃষি মৌসুম সেচনির্ভর। ইরি-বোরোর এ মৌসুমের শুরুতে ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি আমাদের খাদ্যনিরাপত্তার সংগ্রামকে আরও কঠিন করে তুলবে। প্রান্তিক ভূমিহীন বর্গা কৃষক যে দামে জমিজমা নিয়ে ইরির নিয়ত করেছিলেন, তা পূরণ করা তাঁর জন্য এবার কঠিন হবে। ২৩ শতাংশ বেশি খরচের পুঁজি কোথায় তাঁর? তাঁকে আবার ঋণের জন্য হাত পাততে হবে।

কী প্রণোদনার ব্যবস্থাপত্র দেবেন মন্ত্রীরা? উপযুক্ত দাম দিলে প্রণোদনার দয়া-দাক্ষিণ্যের প্রয়োজন পড়ে? তেলের দাম বাড়ানোর আগের সপ্তাহে খাদ্যমন্ত্রীসহ ছয় মন্ত্রী (কৃষিমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী, বাণিজ্যমন্ত্রী, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী আর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী) শলাপরামর্শ করে ধানের দাম কেজিতে মাত্র এক টাকা বাড়িয়ে দেন। তেলের দাম যে দিন কয়েকের মধ্যে হু হু করে বাড়িয়ে দেওয়া হবে, তা জানা সত্ত্বেও তাঁদের এই ‘কঞ্জুসি’ সিদ্ধান্ত কৃষককে মর্মাহত করেছে। এখন আমন ধান ঘরে তোলার সময় (এখন ডিজেলচালিত পাওয়ার টিলার দিয়ে মাড়াই হয় ধান)। সবচেয়ে নিশ্চিত ফসল ইরি-বোরোর মৌসুম শুরু হচ্ছে। আমন ও বোরো দিয়ে কৃষক যখন মূলধন জোগাড়ের চিন্তায় অস্থির, তখন এক লাফে ডিজেলের দাম লিটারে ১৫ টাকা বাড়িয়ে দিলে তাঁদের যে দম থাকবে না, তা আঁচ করতে না পারাটা হয় মূর্খতা, না হয় ধূর্ততা।

আমাদের সবচেয়ে নিশ্চিত কৃষি মৌসুম সেচনির্ভর। ইরি-বোরোর এ মৌসুমের শুরুতে ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি আমাদের খাদ্যনিরাপত্তার সংগ্রামকে আরও কঠিন করে তুলবে। প্রান্তিক ভূমিহীন বর্গা কৃষক যে দামে জমিজমা নিয়ে ইরির নিয়ত করেছিলেন, তা পূরণ করা তাঁর জন্য এবার কঠিন হবে। ২৩ শতাংশ বেশি খরচের পুঁজি কোথায় তাঁর? তাঁকে আবার ঋণের জন্য হাত পাততে হবে। কৃষকের এই ত্রিশঙ্কু অবস্থার কথা আমরা না বুঝলেও পাশের দেশের (ভারত) সরকারের তা বুঝতে সময় লাগেনি। ৪ নভেম্বর প্রতিবেশী দেশের কেন্দ্রীয় সরকারের এক ঘোষণায় বলা হয়, আসন্ন রবিশস্যের মৌসুমে কৃষকেরা যাতে উপকৃত হন, সে জন্য জ্বালানি তেলের দাম কমানো হচ্ছে। ভোক্তাদের সুবিধার্থে রাজ্য সরকারগুলোকে জ্বালানি তেলের ওপর ভ্যাট কমানোর অনুরোধও করেছে সে দেশের কেন্দ্রীয় সরকার।

আমাদের কৃষকদের কথা ভেবে এখানেও সরকার আমদানি শুল্ক ও ভ্যাট কমিয়ে জ্বালানির দাম কিছুটা সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসতে পারত। আমাদের দেশের বেশির ভাগ কৃষক শুষ্ক মৌসুমে ফসল ফলাতে সেচের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) হিসাব বলছে, দেশের ১৩ লাখ ৭৯ হাজার সেচপাম্পের ৮৬ শতাংশ অর্থাৎ ১১ লাখ ৯২ হাজার ডিজেলচালিত। বোরো মৌসুমে দেশে ১৬ লাখ টন ডিজেলের ব্যবহার হয় সেচে। ফলে ডিজেল ও কেরোসিনের মূল্যবৃদ্ধির ফলে তাঁদের উৎপাদন খরচ এতটাই বেড়ে যাবে যে কৃষক আর কৃষিতে মন বসাতে পারবেন না। নতুন পেশা বা ধানের বদলে অন্য কোনো ফসল চাষের কথা ভাবতে বাধ্য হবেন।

কোনো উপায় আছে কি?
কৃষকেরা নানা উপায় খুঁজছেন। মেহেরপুরের কৃষক আমিনুর রসুল জানান, তিনি এবার ‘দুটি পানি অফ’ করে দেবেন। মানে সচরাচর তাঁর জমিতে ইরি-বোরো ধানের চাষ করতে পাঁচ-ছয়টা সেচ লাগে। এবার তিনি তিনটির বেশি সেচের টাকা কুলিয়ে উঠতে পারবেন না। এতে ধানের ফলন কমবে। বিক্রির মতো উদ্বৃত্ত না থাকলে আমাদের খাদ্যনিরাপত্তার কী হবে? দেশের কৃষির অনেকটা এখন ভূমিহীনদের রক্ত পানি করা শ্রমে চলে। ৪০ লাখ ২৪ হাজার ভূমিহীন পরিবার কোনোমতে কৃষিকে টিকিয়ে রেখেছে। জমির মালিক আগাম টাকা নিয়ে নেন তাঁদের চাষের অধিকার দিয়ে। চাষের কোনো খরচ তিনি দেন না। আগাম টাকা দেওয়া-নেওয়ার আগে তেলের দাম বাড়ানোর খবর রাষ্ট্র হলে চাষিরা মালিকদের সঙ্গে কথা বলতে পারতেন। এখন আর সে সুযোগ নেই। লেনদেন হয়ে গেছে।

উৎপাদন খরচ আগের মৌসুমের কাছাকাছি রাখতে গেলেও অন্যের জমি চাষ করে খাওয়া এসব মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে। বাড়তি খরচের সহায়ক কোনো পদক্ষেপ নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। প্রণোদনা এমনিতেই যাঁর দরকার, তাঁর কাছে সময়মতো পৌঁছানো অনেক কঠিন। কৃষির প্রণোদনা কৃষকের কাছ থেকে আগাম টাকা নিয়ে জীবন উদ্‌যাপনকারী জমির মালিকদের হাতেই পৌঁছে যায়। আসল চাষি আঙুল চোষেন। প্রতিটি ইউনিয়নে কর্মরত কৃষি বিভাগের কর্মীরা (আগের ব্লক সুপারভাইজার এখন সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট অ্যাগ্রিকালচার অফিসার) এই ‘বেইনসাফি’ দূর করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারেন। তাঁরা জানেন, কোন চাষি কোন জমি চাষ করছেন আর কী দামে পানি (সেচ) কিনছেন। স্থানীয় চাষি সমিতি আর ওয়ার্ড মেম্বারের সঙ্গে বসে একটি স্বচ্ছ তালিকা তাঁরা তৈরি করতে পারেন। সেই তালিকা অনুযায়ী ইলেকট্রনিক মানি ট্রান্সফারের প্রক্রিয়াটি জটিল হবে না। প্রকৃত চাষিকে না বাঁচালে আমরা কেউ বাঁচব না।

গওহার নঈম ওয়ারা লেখক ও গবেষক
[email protected]

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন