কৃষক ক্ষতি পুষিয়ে উঠে দাঁড়াবেন কীভাবে

বিজ্ঞাপন
default-image

চলতি মৌসুমের বোরো ধান এখন কৃষকের ঘরে। কৃষক প্রায় পুরো ফসল ঘরে তুলেছেন। দেশের খাদ্যনিরাপত্তার বড় ভরসা বোরো। করোনার শুরু থেকে চারদিকে খাবার নিয়ে দুশ্চিন্তা ছিল। বোরো চাষিদের অর্জন দেশের জন্য বড় স্বস্তির। অভিনন্দন পেতে পারেন তাঁরা। তবে কৃষিসমাজের জন্য শুধু অভিনন্দনই যথেষ্ট নয়। দরকার বেশি কিছু।

সরকারের দিকে তাকিয়ে

এলাকাভেদে গড়ে ৯০০ টাকা দরে নতুন ধান বিক্রি হচ্ছে। এতে কৃষকের সামান্যই লাভ থাকবে। গ্রামে সবাই ধানচাষি নন। ধান ওঠার পরই অনেক জেলায় মানুষ বেকার হয়ে আছেন। কাজ নেই। আম্পানে ঢুকে পড়া পানিতে উপকূলীয় বহু অঞ্চল ডুবে আছে। ফল ও সবজির বাগান, পানের বরজ লন্ডভন্ড। এ রকম সব কৃষিজীবী সরকারের দিকে তাকিয়ে আছেন সহায়তার জন্য।

তাঁদের সহায়তা দরকার জাতীয় স্বার্থে। শিল্পের দুর্দশা দীর্ঘস্থায়ী হবে। দেশকে এই মুহূর্তে মদদ দিতে পারে কৃষি। কিন্তু কৃষককে নতুন করে আরও বেশি বেশি জমিতে আবাদের আহ্বান জানালেই হবে না। তাঁর অবস্থাটাও বোঝা দরকার। 

কৃষকের কাছে বেশি আবাদ মানে বেশি বিপন্নতা। প্রায় মৌসুমে সব পণ্যেই এটা ঘটছে। আমদানি-রপ্তানির মারপ্যাঁচের মধ্যে কোন পণ্য কতটুকু উৎপাদন করলে লাভসহ বিক্রি করা যাবে, সে তথ্য কৃষক পর্যায়ে নেই। নীতিনির্ধারকদের খেয়ালখুশি আর নিয়তির ওপর নির্ভরশীল থাকতে হচ্ছে আবাদিকে। এ অবস্থা না বদলালে জাতীয় অর্থনীতির পাটাতন হিসেবে কৃষিসমাজের বড় অংশ এ কাজ ছেড়ে দেবে নীরবে। কমবেশি সেই আলামত আছে।

ঋণ নয়, ফসল বিক্রিতে সহায়তা

বাজেট নিয়ে কৃষকদের আশার অধ্যায় পার হয়েছে। কৃষিতে বরাদ্দ এবারও আগের মতোই আছে। ভর্তুকি কিছু বেড়েছে, কৃষি যন্ত্রাংশ কিছু বাড়তি শুল্কসুবিধা পেয়েছে। সামগ্রিকভাবে কৃষির জন্য কাঠামোগত সংস্কারের প্রস্তাব নেই। সেই অনুযায়ী বরাদ্দও নেই। করোনা কৃষিকে ঘিরে নতুন তৎপরতার বাস্তব তাগিদ তৈরি করেছে। ঐতিহাসিক সেই ক্ষণকে ধরা জরুরি।

মহামারি শুরুর পর সরকার কৃষকদের জন্য পাঁচ হাজার কোটি টাকা ঋণের ‘প্যাকেজ’ ঘোষণা করেছিল। কৃষকের জন্য ঋণ ছাড়া আর কিছু ভাবতে না পারা আমাদের এক জাতীয় সংকট। দেশে কয়েক শ বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কৃষিসমাজে ক্ষুদ্রঋণের ব্যবসা করে যাচ্ছে; আছে অনেক ব্যাংক। বছরে এ রকম ঋণ বিতরণ হয় প্রায় ১৪-১৫ হাজার কোটি টাকা। তবে ঋণ এখন কৃষিসমাজের মূল সংকট নয়। বরং তাঁরা এখন ঋণমুক্তি চাইছেন। তা ছাড়া যারা জমিকে জামিন হিসেবে দেখাতে পারে, তারাই ব্যাংক থেকে সহজে ঋণ পায়। অথচ এ রকম মানুষেরা এখন আবাদই করেন কম।

বর্তমানে কৃষির প্রধান ধারা ভাড়াটে কৃষকের কৃষি। আবাদিদের সংখ্যাগরিষ্ঠই বর্গাচাষি বা নিজের অল্প জমিতে চাষ করা প্রান্তিক কৃষক। যেকোনো ঋণ প্যাকেজে এই খুদে চাষিদের সুবিধা সামান্যই। বরং এঁদের জন্য চিন্তাটা হওয়া উচিত তঁাদের হাতে বর্গাজমিটা প্রতিবছর রাখা যায় কীভাবে, সময়মতো ন্যায্যমূল্যে বীজ, সার ও কীটনাশক দেওয়া যায় কি না এবং কীভাবে উৎপাদিত ফসল বেচতে সহায়তা দেওয়া যায়। এসব নিয়েই কৃষকের অবস্থা চরম নাজুক। এসব দূর করতে নীতিনির্ধারকদের কৃষি চিন্তায় আমূল পরিবর্তন দরকার। গতানুগতিক কৃষি প্রশাসন এবং গতানুগতিক ধারার বাজেট বরাদ্দ কৃষিকে রক্ষা করতে পারবে না আর।

লোকসানের চক্র থেকে মুক্তি 

কৃষির বাস্তব সমস্যাগুলো জাতীয় ভাবনায় আজও জায়গা পায়নি। এই লেখা তৈরির সময় পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে খবর আসছিল শত শত টন আম, লিচু, কাঁঠাল সেখানে সস্তায় বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন জুমচাষিরা। হাজার হাজার কোটি টাকার ‘উন্নয়ন’ হয়েছে এই তিন জেলায় গত ৫০ বছরে। অথচ কয়েকটা হিমাগার করা গেল না। এটা জাতীয় দুর্ভাগ্যই বলতে হবে। প্রতিটি জেলায় এ রকম স্থানীয় দুর্ভাগ্য অনেক।

উত্তরের কৃষকদের ধান ও ভুট্টা শুকানোর সংকট; পণ্য রাখার জায়গা নেই। ফলে দ্রুত বিক্রি করে দিতে হয় সব পণ্য। ভালো দামের আশায় ফসল ধরে রাখার অবস্থায় নেই কৃষক। কোনো কৃষিপণ্যের দাম নিয়ে কৃষক দর-কষাকষির অবস্থায় নেই। সেই কাজটি করছে ফড়িয়ারা। কৃষক জানেন না আগামী মৌসুমে তিনি তাঁর ফসলের কী দাম পাবেন। ফড়িয়ারা যে দাম দেবে, কৃষক সেটাই পাবেন। কৃষি ছাড়া আর কোন খাতে এমন নৈরাজ্যকর অবস্থা নেই। কৃষিই একমাত্র খাত, যেখানে উৎপাদকদের কোনো সংঘ বা সমিতি নেই। ফলে সারা দেশের জন্য সারা বছর খাদ্য ফলিয়ে কৃষক শুধু মধ্যস্বত্বভোগীদের পকেট ভারী করেন। অনেক কৃষকই ধানের লোকসান সামলান সবজি আবাদ করে। সবজিখেতের ছত্রাক তাড়ান গাছের আম-জাম বিক্রি করে। লোকসানের এই চক্র কোনো মৌসুমে সামলাতে না পারলে বাড়ির একটা গাছ বিক্রি করে দেন। যঁাদের সে রকম কিছু থাকে না, তঁারা কামলা খাটেন। নিজেদের কোনো সংঘ ও সলাপরামর্শের পরিসর না থাকায় আবাদে কৃষকেরা বৈচিত্র্যও আনতে পারছেন না। অনেক কৃষক একই সঙ্গে একই পণ্য ফলিয়ে দামে মার খাচ্ছেন। এ ক্ষেত্রে নতুন ধারার কৃষি প্রশাসনের অনেক কিছু করার আছে। 

জমির ‘লিজ মার্কেট’ সংস্কার জরুরি

এখন কৃষির আলোচনায় যন্ত্রপাতির কথা বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক এবং বর্গাচাষির মূল সমস্যা যন্ত্র নয়। গ্রামে বড় জোতের মালিক এখন আর কৃষিকাজ করে না। আর খুদে-প্রান্তিক চাষির কাছে জরুরি বিষয় তাঁর ফসলের দাম, যন্ত্রপাতি নয়। িতনি চাইছেন কৃষিপণ্য বিক্রি করে টিকে থাকতে। ফসল ফলিয়ে টিকে থাকার জন্য তাঁকে যেন আবার গায়ের শ্রমও বিক্রি করতে
না হয়। করোনাকালে দুধ, আম ইত্যাদি নানা কৃষিপণ্য সময়মতো বিক্রি করতে না পেরে অনেক কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। সবজি উৎপাদকেরা সারা বছরই এ সমস্যা মোকাবিলা করছেন। এ অবস্থার দীর্ঘস্থায়ী কাঠামোগত সমাধান দরকার। উপকরণ কেনায় ও পণ্যের বিক্রিতে কৃষককে সমর্থন দেওয়া দরকার সরাসরি মাঠপর্যায়ে। কৃষি উপকরণ বিতরণ ও কৃষিপণ্য বিপণনকাঠামো পাল্টে ফেলা সময়ের বড় দাবি এখন।

এ ছাড়া বর্গা জমির ভাড়ায় রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ দরকার। ৭০-৮০ ভাগ কৃষিজীবী এখন বর্গাচাষি। জমির মালিকেরা ভাড়া এমনভাবে বাড়িয়ে চলেছেন, তাতে কৃষি আর লাভজনক থাকছে না। এ অবস্থায় কৃষক বেশি দিন আবাদে থাকবেন না। সুতরাং কৃষিসমাজকে আবাদে ধরে রাখতে সরকারের হস্তক্ষেপ ছাড়া উপায় নেই। জমির লিজ মার্কেটের যুগোপযোগী সংস্কার জরুরি।

এ বিষয়গুলো জাতীয় অ্যাজেন্ডায় নেই। জাতীয় অর্থনৈতিক ভাবনা দখল করে আছে প্রবাসীদের আয় ও পোশাক খাতের আয়। দশকের পর দশক পোশাক খাত নিয়ে ভেবেছি আমরা। সেখানে অনেক প্রণোদনা ও নীতিসহায়তা দেওয়া হয়েছে। এবার কি আমরা কৃষি নিয়ে একটু গুরুত্ব দিয়ে ভাবব?

করোনার প্রথম ধাক্কায় দেড় মাসে পোশাক খাতের ৩৮ হাজার কোটি টাকার ‘অর্ডার’ হারানোর কথা শুনেছি আমরা। কিন্তু একই সময়ে কৃষি খাতের লোকসান হয়েছে ব্র্যাকের গবেষণামতে ৫৬ হাজার কোটি টাকা। এই ক্ষতির বিপরীতে কৃষিজীবীরা কী পেলেন? কীভাবে আবার তাঁরা উঠে দাঁড়াবেন?

আলতাফ পারভেজ গবেষক

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন