বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

চাষবাস আর বাড়িতে গরু পালন করে কোনোমতে টিকে থাকা কৃষক রিপন মিয়া বুঝতে পারেন কান্নাকাটি, দেনদরবার করে এই দয়াহীন-মায়াহীন সংসারে পাখিদের আর তাদের আবাসস্থল তালগাছ বাঁচানো যাবে না। অনেক কষ্টে জোগাড় করা টাকা নিয়ে তিনি দেখা করেন তালগাছের নতুন মালিক করাতে ধার দিতে থাকা ব্যাপারীদের সঙ্গে। কেনা দামে তাঁরা কেন ছেড়ে দেবেন তালগাছটা এই পাগল কৃষকের কাছে? চড়া দাম হাঁকে ব্যাপারীর দল। আগপিছ না ভেবে রিপনের মধ্যে ঘুমিয়ে থাকা শক্ত নির্ভীক মানুষটা ‘কাল কী হবে’ না ভেবেই রাজি হয়ে যান ব্যাপারীদের হাঁকা দামে। গাছটা এখন কৃষক রিপন মিয়ার। পাখিরা এবারের মতো বেঁচে যায়। বেঁচে গেছে তালগাছটি।

‘হাসপাতালের কনসেপ্টের’ সঙ্গে ‘গাছ-পাখি’ যায় না?

আচ্ছা, রিপন মিয়া যদি ম্যালা লেখাপড়া করে অনেক পাস দিয়ে এপাশ-ওপাশ করে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হর্তাকর্তা হতেন, তাহলে কি সেখানকার গাছে আশ্রয় নেওয়া দুর্লভ শামুকখোল পাখিগুলোকে বাঁচাতে এমন আকুলি-বিকুলি করতেন? নাকি হাসপাতালের বর্তমান কর্তাদের মতো করাতিদের হাতে পাখিদের ভাগ্য ছেড়ে দিয়ে বলতেন, ‘হাসপাতালের কনসেপ্টের সঙ্গে এসব যায় না।’ কী যায় হাসপাতালের ধারণার সঙ্গে? গাছ থাকবে, না পাখি থাকবে, না শুধু তেনারা আর তেনাদের কেনাকাটা থাকবে? মানুষের করের পয়সায় কেনা অবহেলায় পড়ে থাকা মেশিনপত্র, রোগী নিগ্রহ, কথায় কথায় কর্মবিরতি আর ঠাটবাট কি হাসপাতালের কথিত কনসেপ্টের সঙ্গে যায়?

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এলাকার ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার মেডিসিন অ্যান্ড অ্যালায়েড সায়েন্সের সামনের গাছগুলোতে বিভিন্ন প্রজাতির পাখি বাস করত আজকের হর্তাকর্তাদের চেয়ারে বসার অনেক আগে থেকে। পাশের সড়ক বিভাজকের গাছগুলোতেও বাসা ছিল তাদের। শামুকখোল নেই নেই করে রাজশাহী অঞ্চলেই এখনো টিকে আছে। সাদা রঙের এই পাখির পিঠ ও ডানার অংশ কালো। ভারত, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কাসহ দক্ষিণ এশিয়ার অধিকাংশ অঞ্চল এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার স্থায়ী পাখি। এশীয় শামুকখোলের বৈজ্ঞানিক নাম অ্যানা অ্যানাস্টোমো ওসিটান্স অর্থ হাই তোলা মুখের পাখি। অদ্ভুত ঠোঁটের জন্য খুব সহজে অন্যান্য পাখি থেকে একে আলাদা করা যায়। ঠোঁটের নিচের অংশের সঙ্গে ওপরের অংশের বেশ বড় ফাঁক থাকে। পাখিটি বাংলাদেশ, ভারত ছাড়াও দক্ষিণ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে দেখা যায়। যদিও আইইউসিএন প্রজাতিটিকে এখনো কম বিপদাপন্ন বলছে, তবু কয়েক দশক ধরে এদের সংখ্যা ক্রমেই কমছে। উপযুক্ত আবহাওয়া, পরিমিত খাবারের জোগান আর নিরাপত্তা থাকলে এরা সাধারণত কোনো এক জায়গা থেকে নড়ে না।

গত আম মৌসুমের শুরুতে রাজশাহীর বাঘা উপজেলার খোর্দ্দ বাউসা গ্রামের আমবাগানে শামুকখোল পাখির বাসা ভাড়া বাবদ পাঁচ বাগানমালিককে ৩ লাখ ১৩ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয় সরকার। আমচাষিদের ক্ষতিপূরণ হিসেবে এ বরাদ্দ দেওয়া হয়। বেশ কয়েক বছর ধরে বর্ষাকালের শেষে বাচ্চা ফোটানোর আগে খোর্দ্দ বাউসার এই আমবাগানে বাসা বাঁধে শামুকখোল পাখি। ২০২০ সালে বাগানমালিকেরা বাগান পরিচর্যার নামে পাখিদের উচ্ছেদের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তখন সেখানকার ‘রিপন মিয়ারা’ বাধা দেন। স্থানীয়রা আদালতের দরজায় কড়া নাড়ান। আদালত সাড়া দেন। ‘কেন ওই এলাকাকে পাখির অভয়ারণ্য ঘোষণা করা হবে না,’ জানতে চেয়ে রুল জারি করেন উচ্চ আদালত। আদালতের নির্দেশেই ক্ষতিপূরণ পান বাগানমালিকেরা।

রাজশাহী মেডিকেলে কেন পাখি থাকতে পছন্দ করে

১৯৫৮ সালে সিপাইপাড়া আর লক্ষ্মীপুর মৌজার ৯০ একর জমি নিয়ে প্রখ্যাত অ্যানাটমি শিক্ষক লে. কর্নেল গিয়াস উদ্দিনের নেতৃত্বে এ দেশের দ্বিতীয় মেডিকেল কলেজ হিসেবে রাজশাহী মেডিকেল কলেজের যাত্রা শুরু। গিয়াসউদ্দিন সাহেব রাজশাহী মেডিকেল কলেজের পুরো ক্যাম্পাসকে একটা নান্দনিক রূপ দিতে চেয়েছিলেন। ঠিকাদারদের জানিয়ে দিয়েছিলেন, শুধু ইটপাথরের দালান ইমারত নয়, গাছ লাগাতে হবে। ছায়াঘন রাখতে হবে ক্যাম্পাস। বড় কোনো গাছ কাটা চলবে না। লক্ষ্মীপুর মৌজার বড় বড় কড়ইগাছে তখন থেকেই পানকৌড়ি ও নিশিবকের আস্তানা ছিল। মেডিকেল কলেজের গোড়াপত্তনের সঙ্গে সঙ্গে ওই অঞ্চলের পাখিদের তাড়াতে চাননি প্রথম অধ্যক্ষ লে. কর্নেল গিয়াস উদ্দিন। সেই থেকে মেডিকেলের গাছগুলো ছিল পাখিদের ভরসার জায়গা। তাই ২০১৫-১৬ সালের দিকে রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারের আশপাশের বড় গাছগুলো কেটে নির্মাণকাজ শুরু হলে সেখানকার শত শত শামুকখোল পাখি বাসস্থান হারায়। এসব উদ্বাস্তু পাখি রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আশপাশের গাছে গাছে আশ্রয় নেয়।

অন্যায়ের বিচার হোক
পাখিদের এই আবাসে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ প্রথম করাত চালায় ২০২০ সালে, করোনাকালে। পাখিদের তাড়াতে হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনের কয়েকটি বড় কড়ইগাছের ডালপালা ছেঁটে দেওয়ার কাজ হাতে নেয় কর্তৃপক্ষ। কোনো কর্মকর্তার গায়ে নাকি পাখির বিষ্ঠা পড়েছিল, তাতেই তেতে ওঠেন তাঁরা। সেবার কড়ইর ডালপালা ছাঁটা শুরু হলে পাখিপ্রেমী মানুষ ও গণমাধ্যমকর্মীরা ঘটনাস্থলে ছুটে গিয়ে বাধা দেন। পাখিপ্রেমীদের হাসপাতাল চত্বর থেকে বের করে দেওয়ার চেষ্টা করেন নিরাপত্তাকর্মীরা। এ নিয়ে বাগ্‌বিতণ্ডাও হয়। সাধারণ মানুষও প্রতিবাদ করেন। অবস্থা বেগতিক দেখে গাছগুলোর সব ডালপালা না কেটেই ফিরে যান কর্মীরা। গাছ বাঁচলেও পাখিদের নীড়গুলো বাঁচে না।

কড়ইগাছ কেটে হাত পাকানো কর্মকর্তারা গত ৪ সেপ্টেম্বর হাসপাতালের প্রশাসনিক ভবনের সামনের অর্জুনগাছগুলো কেটে ফেলার সিদ্ধান্ত দেন। গাছ কাটা হলে উড়তে না শেখা শত শত শিশু পাখি মাটিতে পড়ে যায়। এতে কিছু পাখি সঙ্গে সঙ্গে মারা যায়। আর কিছু পাখির বাচ্চা জবাই করে নিয়ে যান শ্রমিক ও রোগীর স্বজনেরা। এর প্রতিবাদ জানিয়ে রাজশাহী, নাটোর ও নওগাঁয় পরিবেশবাদী বিভিন্ন সংগঠন মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছে।

পাখি শেষ। এখন মানববন্ধন, মোমবাতি মিছিল—কিছুতেই আর পাখিদের ফেরত পাওয়া যাবে না। রোখাও যাবে না পাখিবিদ্বেষী কর্তাদের। বন্য পাখি হত্যা করা, মাংস, দেহের অংশ সংগ্রহ করা, শিকার এবং এ-জাতীয় অপরাধ সংঘটনের সহায়তা করা, প্ররোচনা প্রদান ইত্যাদি বন্য প্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইন, ২০১২) অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পাখির বাসস্থান ধ্বংস ও পাখির ছানা হত্যা করে প্রচলিত ওই আইন অনুসারে অপরাধ করেছে। পাশাপাশি অন্যদের এই অপরাধ করতে উৎসাহিত করেছে। প্রতিষ্ঠানটি ওই আইনের ৬, ৩৮(১), (২) ও ৪১ লঙ্ঘন করে শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছে। আইনের ভাষায় আইন অমান্যকারীদের জবাব দিতে হবে।

আশার কথা, ন্যায়বিচারের স্বার্থে বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের রাজশাহীর বন্য প্রাণী পরিদর্শক বাদী হয়ে শেষ পর্যন্ত রাজশাহী চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে এ মামলা দায়ের করেছেন। আদালতই এখন আমাদের শেষ ভরসা।

গওহার নঈম ওয়ারা লেখক ও গবেষক। [email protected]

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন