কেতাদুরস্ত পোশাকের আড়ালে তিনি ছিলেন মহা দুর্বৃত্ত

ডোনাল্ড রামসফেল্ড

‘কেতাদুরস্ত স্যুট-টাই পরা গতানুগতিক আমলাধর্মী চেহারার আড়ালে ডোনাল্ড রামসফেল্ড ছিলেন একজন নির্জলা দুর্বৃত্ত’—তাঁর মৃত্যুর খবর শোনার পরপর তাঁর কবরের এপিটাফে ঠিক এই কথাগুলো লেখা উচিত বলে আমার মনে হচ্ছিল।

রামসফেল্ডের প্রত্যক্ষ নির্দেশে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া ভিটেবাড়িতে এখনো স্বজন হারানো যে লাখ লাখ মানুষ অপরিসীম দুর্দশা নিয়ে বাস করছে, আমার মনে হয় তাদের মনেও ঠিক এ ধরনের ভাবনা এসে থাকতে পারে। আমি বিশ্বাস করি, সত্য বলে যদি আজও কিছু থেকে থাকে, তাহলে কিছু সংবাদমাধ্যমে যেভাবে তাঁকে মহীয়ান করে মিথ্যা প্রচার করা হচ্ছে, তা কেউ অন্ধবিশ্বাসে মেনে নেবে না।

ইরাক যুদ্ধের রূপকারদের একেবারে শীর্ষে থাকা সাবেক মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ডোনাল্ড রামসফেল্ডকে বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) ‘সুদক্ষ আমলা ও আধুনিক মার্কিন সামরিক বাহিনীর দূরদর্শী নেতা’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। গণমাধ্যমের এ ধরনের ভাষ্যে তাঁর কৃতকর্মগুলো ঢেকে দেওয়ার প্রচ্ছন্ন চেষ্টা আছে।

ইরাক যুদ্ধের সময় পেন্টাগনের নিরাপদ অফিস থেকে রামসফেল্ড মার্কিন বাহিনীকে হত্যা করার নির্দেশ দিতেন। সেই নির্দেশের কারণে পরে হত্যাকারীদের যে জবাবদিহির মুখে পড়তে হতো, তার দায় তাঁর ওপর সরাসরি পড়ত না। এ কারণে কেউ তাঁকে ‘খুনি’ বলতে পারেনি। এপি তাঁকে ‘দূরদর্শী’ বলেছে। নাইন–ইলেভেনের সন্ত্রাসী হামলাকে কাজে লাগিয়ে রামসফেল্ড যেভাবে মহাবিপর্যয়কর সাম্রাজ্যবাদী নীলনকশা তৈরি করেছিলেন, সে দিক বিবেচনা করলে তাঁকে দূরদর্শী সমরনায়ক বলা যেতেই পারে।

টুইন টাওয়ার হামলাকে কাজে লাগিয়ে তৎকালীন বুশ প্রশাসন আফগানিস্তানে প্রথম যে অভিযান চালায়, যার আদ্যোপান্ত দেখভাল করছিলেন রামসফেল্ড। পরিকল্পিতভাবে মার্কিন বাহিনী তালেবান সরকারের পতন ঘটিয়েছিল। সে দিক থেকে তাঁকে সফল সামরিক অধিনায়ক বলা যেতে পারে। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, তাঁর নেতৃত্বে চালানো আফগানিস্তান অভিযানে নিষ্পাপ শিশু, নারীসহ অগণিত আফগান নাগরিকের মৃত্যু ও হাজার হাজার মার্কিন সেনার হতাহতের ঘটনার দুই দশক পর সেই আফগানিস্তানে আবারও তালেবানের প্রত্যাবর্তনের পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে।

আজ যেসব প্রতিষ্ঠিত সংবাদমাধ্যম সযত্নে লালিত মিথ্যার আবরণে রামসফেল্ডের নিষ্ঠুরতাকে আড়াল করছে, সেই একই গণমাধ্যম সে সময় রামসফেল্ডের সরবরাহ করা মিথ্যা তথ্য দিয়ে সাদ্দাম হোসেনের কাছে ব্যাপক বিধ্বংসী অস্ত্র আছে বলে প্রচার চালিয়েছিল।

এই রামসফেল্ড ও তাঁর অতি আত্মবিশ্বাসী সাথিরা বিশ্বকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন, ইরাক যুদ্ধ দ্রুততম সময়ে শেষ হবে, সাদ্দামের ব্যাপক বিধ্বংসী অস্ত্র নিষ্ক্রিয় করা হবে এবং দ্রুত ইরাকে শান্তি ফিরিয়ে আনা হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখা গেছে, ইরাকে ব্যাপক বিধ্বংসী অস্ত্র বলে কিছু নেই, ইরাকেও মার্কিন বাহিনীকে লম্বা সময় যুদ্ধ করতে হয়েছে এবং ইরাক ও তার আশপাশে দীর্ঘ সময় তীব্র অশান্তির সৃষ্টি হয়েছে।

রামসফেল্ডের একগুঁয়েমি ও নিষ্ঠুরতার মূল্য দিতে গিয়ে আজও শারীরিকভাবে, মানসিকভাবে ও চেতনাগত দিক থেকে আজও ইরাকিদের সেই বিভীষিকা বহন করতে হচ্ছে।

জর্জ বুশ ও ডিক চেনি আফগানিস্তান ও ইরাকে যে আইনের শাসনবিহীন বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টির নির্দেশ দিয়েছিলেন, তা রামসফেল্ড শুধু বাস্তবায়ন করেননি, যুক্তরাষ্ট্রের যেসব আলোকিত মানুষ এ অন্যায় যুদ্ধের বিরোধিতা করেছিলেন, তাঁদের ভাষ্যকেও তিনি চরম অবহেলায় উপেক্ষা করেছিলেন।

ইরাকে মার্কিন বাহিনীর বন্দী নির্যাতনের নৃশংস কায়দাকে রামসফেল্ড ঠান্ডা মাথায় অনুমোদন দিয়েছিলেন। আজও সেখানে ‘আমেরিকার শত্রু’ হিসেবে কাউকে সন্দেহ করা হলে তাঁর ওপর যে অমানুষিক নির্যাতন চালানো হয়, তা রামসফেল্ডের রেখে যাওয়া পৈশাচিকতারই রেশ।

আন্তর্জাতিক আইন ও বিধি মেনে চলার ক্ষেত্রে মার্কিন বাহিনীর যে পেশাগত বাধ্যবাধকতা আছে, তা থেকেও রামসফেল্ড তাদের দূরে সরিয়ে দিয়েছিলেন। মালপত্রের মতো বাক্সে পুরে মানুষকে নির্যাতন কুঠরিতে ছুড়ে ফেলে দেওয়া এবং চিরদিনের জন্য সন্দেহভাজন ব্যক্তি ও বন্দীদের ওপর নির্যাতনকে তিনি অলিখিতভাবে অনুমোদন দিয়েছিলেন।

অসংখ্য জায়গার অগণিত মানুষের নিরন্তর যন্ত্রণার প্রধান কারণ হয়েও সেসব গণদুর্দশার দায় থেকে তিনি রেহাই পেয়ে গেছেন। সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, নিজের বাড়িতে তাঁর স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে এবং মৃত্যুর সময় তাঁর পরিবারের সদস্যরা তাঁর পাশে ছিলেন। রামসফেল্ডের জন্য এটি সৌভাগ্যের বিষয়। কিন্তু তাঁর বিগত জীবনের অপরাধ বিবেচনায় নিলে বলা যায় এ শান্তিপূর্ণ মৃত্যুর যোগ্য মানুষ আদৌ তিনি ছিলেন না।

আল–জাজিরা থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত

অ্যান্ড্রু মিত্রোভিকা আল–জাজিরার টরন্টোভিত্তিক কলামিস্ট