বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
আমরা কি দেড়-দুই বছর পর সেই আগের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেই ফিরে যেতে চাই, নাকি এই সাময়িক বিরতিতে নতুন উপলব্ধি, নতুন মননে, নতুন করে সব শুরু করতে চাই।

নতুন করে শুরু করার প্রসঙ্গ এলে প্রশ্ন আসবে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রধান সমস্যাগুলো কী কী? এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলে একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের মান নির্ণয়ের প্রধান উপাদানগুলোর দিকে নজর দিতে হবে। এই উপাদানগুলোর মধ্যে অবশ্যম্ভাবীভাবেই আছে শিক্ষা আর গবেষণা। এই দুই ক্ষেত্রেই আমরা অনেক পিছিয়ে আছি, কোনো সন্দেহ নেই। বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এই দুটি বিষয়ে মানের ক্রমনিম্নগতি নিয়ে অনেক কথা হয়েছে, তাই এ নিয়ে নতুন কিছু বলার নেই।

কিন্তু যে বিষয়টিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রসঙ্গে তেমন কোনো কথাবার্তা হয় না, সেটি হলো, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসা হাজার হাজার ছাত্রছাত্রীর মানবাধিকার লঙ্ঘন। এসব বৈষম্যের শিকার ছাত্রছাত্রীর মধ্যে বেশির ভাগই, যারা ঢাকার বাইরের মফস্বল বা গ্রাম থেকে আসে, ঢাকায় থাকার সুব্যবস্থা করা যাদের জন্য অনেক কঠিন হয়ে দাঁড়ায়, তাদের জন্য আবাসিক হলগুলোতে থাকার সুযোগ পাওয়াটা লটারিতে কোটি টাকা পাওয়ার মতো। সবচেয়ে দুঃখজনক ব্যাপার হচ্ছে, ছাত্রছাত্রীদের এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে তারা বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে সবচেয়ে বেশি নিগৃহীত ও শোষিত হয়।

বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্রছাত্রীদের আবাসন প্রক্রিয়ার একটা হাইব্রিড সিস্টেম চালু আছে, যেটি, আমার ধারণা, পৃথিবীতে আর কোথাও নেই। এই হাইব্রিড সিস্টেমে কিছুসংখ্যক ছাত্র তাদের যোগ্যতা আর প্রয়োজনের ভিত্তিতে আবাসিক হলগুলোতে জায়গা পায়। কিন্তু একটি বিপুলসংখ্যক ছাত্রছাত্রীকে হলে ঢোকানো হয় পেছনের দরজা দিয়ে। প্রক্রিয়াটি সাধারণত পরিচালিত হয় ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের ছাত্রসংগঠন দ্বারা। এটি একটি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক প্রক্রিয়া। এর সঙ্গে ছাত্রদের কল্যাণের কোনো সম্পর্ক নেই।

এই বিপুলসংখ্যক ছাত্রছাত্রীকে পেছনের দরজা দিয়ে ঢোকানোর প্রক্রিয়াটি করা হয় আবাসনসংকটকে কেন্দ্র করে। এই সংকট কিছুটা সত্যি সত্যিই রয়েছে, আর অনেকটাই কৃত্রিমভাবে তৈরি করা হয়েছে। এই সংকটের মূল রয়েছে বেশ গভীরে, আর সেটি এই দেশের অসুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে।

যুগ যুগ ধরে স্বাধীন বাংলাদেশে এই দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মনে করে না। তাঁদের কাছে এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মূলত রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ধরা হয় রাজনীতির সূতিকাগার। দেশের সব বড় রাজনৈতিক আন্দোলন এখান থেকেই শুরু হয়েছিল। তাই শাসকগোষ্ঠীর শ্যেন নজর থাকে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের ওপর। যেকোনো মূল্যে তাঁরা তাঁদের প্রাধান্য নিশ্চিত করতে চান বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে।

এই প্রাধান্য নিশ্চিত করার জন্য একটি অনুগত ক্যাডার বাহিনী থাকা খুব জরুরি হয়ে যায়। এই আনুগত্য আদায় করার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো মূলত ঢাকার বাইরে থেকে আসা ছাত্রছাত্রীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যেটি, সেটির ওপর দখল নেওয়া। ঢাকা শহরে গ্রাম বা মফস্বল থেকে আসা শিক্ষার্থীর জন্য আবাসন ব্যয় হচ্ছে অসম্ভব বেশি। তাই আবাসিক হলগুলোতে থাকার জন্য এসব ছাত্রছাত্রী একরকম মরিয়া থাকে। এ সুযোগটাই নেয় রাজনৈতিক নেতৃত্বে থাকা ছাত্রসংগঠন। সেই সঙ্গে থাকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের আশীর্বাদ। আর অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে, এই পুরো প্রক্রিয়াটি সংঘটিত হয় আমাদের কিছু সহকর্মী শিক্ষকদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সহযোগিতায় এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ উদাসীনতায়।

বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে উঠে আসা দরিদ্র পরিবারের একজন মেধাবী ছাত্র, হয়তো সে জীবনে প্রথমবার বা দ্বিতীয়বারের মতো ঢাকায় এসেছে, সে হয়তো অনেক আশা, উত্তেজনা ও রোমাঞ্চ নিয়ে একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসে। কিন্তু যখন সে এসে হলে ক্যাডারদের খপ্পরে পড়ে হলের গণরুমে গিয়ে ঢোকে, তখন সেই আশা মিইয়ে যেতে বেশি সময় লাগে না। শোনা যায়, এই সহজ-সরল ছাত্রদের দয়ামায়াহীন রুক্ষ এবং কর্কশ ক্যাডার বানানোর একটি ম্যানুয়াল পর্যন্ত আছে। এর মধ্যে অন্যতম একটা উপাদান হলো প্রায়শই তাদের রাতে ঘুমাতে দেওয়া হয় না। উঠিয়ে নিয়ে মিছিল করানো হয়। অথবা বলা হয়, রাতের ক্যাম্পাস ঘুরে ঘুরে দেখো। পরদিন সকালে ক্লাস আছে নাকি পরীক্ষা, সেটি কোনো বিবেচ্য বিষয় নয়। ‘দেশমাতৃকার সেবায়’ রাজনৈতিক ক্যাডার তৈরির প্রক্রিয়ায় পড়াশোনার মতো ‘তুচ্ছ’ বিষয়কে গুরুত্ব দিলে চলে না।

এ ছাড়া যখন-তখন রাজনৈতিক কর্মসূচি, মিছিল-মিটিংয়ে যোগদান বাধ্যতামূলক। নেতৃস্থানীয় ছাত্রছাত্রীরা সব সময় ঈগলচক্ষুর মতো ক্ষুরধার নজর রাখেন কেউ অনুপস্থিত কি না। ক্লাস বা পরীক্ষার দোহাই দিয়ে পার পাওয়া এসব ক্ষেত্রে মোটামুটি অসম্ভব। তারপরও কোনো ছাত্র যদি কাজটি করে ফেলে, তাহলে তার ধরা পড়া মোটামুটি সুনিশ্চিত। এর পরিণতিতে অনেক সময় তার ওপর নেমে আসে অবর্ণনীয় অত্যাচার। গেস্টরুমে বিচার বসবে, কান ধরে ওঠবস, মারধর ইত্যাদি চলবে।

এভাবে এসব ছাত্র বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে চরম মানসিক আর শারীরিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যায়। যারা প্রাণে বেঁচে যায়, তাদের কথা আমাদের কানে আসে না। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের হাফিজুর মোল্লার কথা আমরা জানতে পারি। কারণ, সে তার জীবন দিয়ে আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো আসলে ছাত্রদের জন্য নিরাপদ কোনো আবাসন নয়, বরং কার্যত টর্চার চেম্বারের মতো। নিউমোনিয়া ও টাইফয়েডে আক্রান্ত হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্র হাফিজুর ২০১৬ সালের ২ ফেব্রুয়ারি মারা যায়। সে সলিমুল্লাহ মুসলিম (এসএম) হলের বারান্দায় থাকত। পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, শীতের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এসএম হলের বারান্দায় থাকা এবং রাতে ছাত্রলীগের কর্মসূচিতে যাওয়ার কারণে হাফিজুর ঠান্ডায় আক্রান্ত হয়।

আমরা আরও জানি এই এসএম হলের আবাসিক ছাত্র এহসানের কথা। ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সামান্য ক্যালকুলেটর ফেরত চাওয়ায় দুর্যোগবিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের ছাত্র ক্লাসের প্রথম স্থান অধিকারী এহসান রফিককে পিটিয়ে আধমরা করে ছাত্রলীগের ছাত্র নামধারী কর্মীরা। পৈশাচিক পিটুনিতে তার বাঁ চোখের কর্নিয়া পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ রকম অসংখ্য নির্মমতা আর পাশবিক ঘটনার সাক্ষী বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো, যার বেশির ভাগ লোকচক্ষুর অন্তরালেই রয়ে গেছে।

এই অমানবিক প্রক্রিয়ার মধ্য থেকে কিছু কিছু ছাত্র ধীরে ধীরে মানবিকতা হারিয়ে ফেলতে থাকে। শুধু তা-ই নয়, একসময় সে অন্যায় ক্ষমতার একটা বিকৃত আনন্দও পেতে থাকে। সে মনে করে সে অসহায়, তাঁর পাশে কেউ নেই। তাই প্রতিবাদ করে তো লাভ নেই। তাই এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়ে যতটুকু লাভ নেওয়া যায়, তা-ই ভালো। তখন ধীরে ধীরে তার মধ্যে একটা মানসিক পরিবর্তন আসতে থাকে। একসময় সে এই ক্যাডার বাহিনীর অন্যতম সদস্য হয়ে ওঠে। ক্যানটিনে গিয়ে খেয়ে পয়সা না দিয়ে চলে আসে। ম্যানেজার টাকা চাইলে চড়-থাপ্পড় মারে। অন্য ছাত্ররা একটা ভয়মিশ্রিত সমীহ নিয়ে চলে।

সে অনুভব করে, সে গ্রাম থেকে উঠে আসা ভীতসন্ত্রস্ত ছেলেটি আর নেই। সে পরিণত হয়েছে একজন উল্টো ভীতিকর ক্ষমতাশালী মানুষে। এটি তাকে একধরনের বিকৃত আনন্দ আর পরিতৃপ্তি দেয়। সে নিজেই তখন হয়ে ওঠে একজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি। কিছুদিন পর হয়তো তাকেই দেখা যায় গ্রামের একদল নিরীহ ছেলেকে তার মতো কর্কশ, গুন্ডায় পরিণত করার প্রক্রিয়াতে যুক্ত। অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সর্বোচ্চ পদে থাকা উপাচার্য থেকে শুরু করে হলের প্রভোস্ট, হাউস টিউটর, সেই ছাত্র যে বিভাগে অধ্যয়ন করে, সেই বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের সবারই বিষয়গুলো জানা। অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ কীভাবে আমরা, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকারা এই অমানবিক প্রক্রিয়াটির নীরব দর্শক হয়ে কাটিয়ে দিচ্ছি।

বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রশাসনের সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়োজিত পদধারী ব্যক্তিরা সাধারণত রাজনৈতিকভাবে মনোনীত হয়ে থাকেন। সেই মনোনয়নের প্রধান উপাদান হচ্ছে রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি শর্তহীন আনুগত্য। এর ফলে কাগজে-কলমে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো স্বায়ত্তশাসিত হলেও এটি পরিচালিত হয় পুরোপুরি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে। একাডেমিক কোনো উদ্দেশ্য বা পরিবেশ এর মধ্যে নেই।

এই নিষ্ঠুর আর চরম অন্যায় প্রক্রিয়ার মধ্যে আরেকটি অদ্ভুত বিষয় হলো, যারা এই পুরো প্রক্রিয়ার শিকার, তাদের নীরবতা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৭ হাজারের মতো ছাত্রছাত্রী রয়েছে। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ এসব আবাসিক হলে আছে। এদের একটা ক্ষুদ্র অংশও যদি প্রতিবাদ করে, তাহলেও কিন্তু একটা বিশাল প্রতিক্রিয়া হয়।
তবে এটা সত্যি, দিন শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ের এসব অনাচার, অবিচার আর অন্যায়ের শাস্তি আর শৃঙ্খলাসংক্রান্ত বিষয়ের দেখভালের দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের।

কাগজে-কলমে বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রশাসনের সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়োজিত পদধারী ব্যক্তিরা সাধারণত রাজনৈতিকভাবে মনোনীত হয়ে থাকেন। সেই মনোনয়নের প্রধান উপাদান হচ্ছে রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি শর্তহীন আনুগত্য। এর ফলে কাগজে-কলমে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো স্বায়ত্তশাসিত হলেও এটি পরিচালিত হয় পুরোপুরি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে। একাডেমিক কোনো উদ্দেশ্য বা পরিবেশ এর মধ্যে নেই।

আর সাধারণ শিক্ষক বা ছাত্রছাত্রীদের কল্যাণের বিষয়গুলো এর মধ্যে কোনো ভাবেই নেই। সাধারণ শিক্ষক এবং ছাত্রছাত্রীদের তাই এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে তারা কি সেই আগের ক্যাম্পাসেই ফিরে যাবে, নাকি একটি মানবিক ক্যাম্পাস গড়ে তোলার প্রত্যয় নিয়ে সবকিছু আবার শুরু করবে। কারণ, সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের অধিকার তাদের নিজেদেরই আদায় করতে হবে। এটা তাদের এত দিনে বুঝে যাওয়ার কথা। সেই অধিকার আদায়ের পথ খুঁজে পাওয়াটাই হবে অতিমারি-পরবর্তী ক্যাম্পাসে ফিরে গিয়ে প্রথম কাজ।

আর আমাদের শিক্ষকদের দায়িত্ব হবে এই ছাত্রছাত্রীদের প্রকৃত অভিভাবকের মতো তাদের সার্বিক নিরাপত্তা এবং কল্যাণ নিশ্চিত করার জন্য সর্বোচ্চ সহযোগিতা করা। আর সেটা না করতে পারলে এই শিক্ষকতা পেশায় নামকাওয়াস্তে থাকার কোনো অর্থ নেই।

ড. রুশাদ ফরিদী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক
[email protected]com

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন