default-image

শ্রমজীবী ক্যানটিন। সাধারণভাবে এই শব্দ দুটির কোনো মানে নেই। কিন্তু এই শব্দ দুটি হঠাৎই পশ্চিমবঙ্গের ঝিমিয়ে পড়া সিপিআই–এম পার্টিতে একটা আলোড়নের নাম। এই ক্যানটিন আসলে এক রান্নাঘর ও দুপুরের খাবার বণ্টনের জায়গা। কোভিড–১৯ ছড়িয়ে পড়ার পরবর্তী পর্যায়ে মানুষের হাতে টাকা কমতে থাকে। খাবারদাবার পাওয়াও একটা সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। এ সময়ে সিপিআই–এম দল ঠিক করে ক্যানটিন শুরু করবে ২০ টাকার বিনিময়ে দুপুরের খাবার মানুষের কাছে পৌঁছাতে।

দক্ষিণ কলকাতার যাদবপুরের গড়ফার ক্যানটিন, পার্টি অফিসকেই খাবার বণ্টনের জায়গা হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে, এখানে খাবার তৈরি করে পৌঁছানোও হচ্ছে চারটি জায়গায়। সেই ক্যানটিনটির সঙ্গে যুক্ত সুগত পাল বললেন, একসময় সারা রাজ্যে হাজার দেড়েক ক্যানটিন চলেছে এবং এখনো চলছে অনেকগুলো।

বিজ্ঞাপন

‘যত মানুষের হাতে টাকাপয়সা কমবে, যত দুরবস্থা বাড়বে, ততই মানুষ আসবেন এই ধরনের ক্যানটিনে, আসছেনও। রোজই আমাদের খাবারের প্যাকেটের সংখ্যা বাড়াতে হচ্ছে।’ মানুষের কাছ থেকে অভূতপূর্ব সাড়া পেয়েছেন, সুগত বললেন। যাদবপুরের রান্নাঘর ও ক্যানটিনগুলো চালাচ্ছেন কয়েক শ পার্টি কর্মী ও সাধারণ মানুষ। বস্তুত, গোটা রাজ্যে বেশ কিছু শ্রমজীবী ক্যানটিন চালাচ্ছেন সিপিআই–এমের সঙ্গে যুক্ত মানুষজন। অনেকে আছেন, যাঁরা সিপিআই–এমের সঙ্গে যুক্ত নন।

সিপিআই–এমের দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলা কমিটির সম্পাদক ও রাজ্য সম্পাদক শমীক লাহিড়ির বক্তব্য, করোনা শুরু হওয়ার পর থেকে গোটা রাজ্যের মানুষ এগিয়ে এসেছেন বলেই ৪০টির বেশি শ্রমজীবী ক্যানটিন এখনো চালানো সম্ভব হচ্ছে। ‘এপ্রিল থেকে পরের কয়েক মাসে আমরা ৫ কোটি ৩৭ লাখ টাকা তুলতে পেরেছি শুধু দক্ষিণ চব্বিশ পরগনায়। মানুষ এগিয়ে এসেছেন, সাহায্য করেছেন বলেই এই ক্যানটিন চালানো সম্ভব হয়েছে।’

বিজ্ঞাপন

তবে শুধু ত্রাণ দেওয়া নয়, গোটা পশ্চিমবঙ্গের দিকে তাকালে সিপিআই–এমের উপস্থিতি চোখে পড়বে। তাদের মিছিলেও মানুষজন আসছেন, পার্টি অফিসও তাঁরা খুলতে পারছেন এবং সবচেয়ে বড় কথা—তরুণদের তৃণমূল স্তরে কাজকর্ম করতে দেখা যাচ্ছে। সিপিআই–এমের ছাত্রসংগঠন স্টুডেন্টস ফেডারেশন অব ইন্ডিয়ার (এসএফআই) রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য শুভ্রালোক দাস দিন কয়েক আগে উত্তরবঙ্গে একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে গন্ডগোলের জেরে মিছিলের ডাক দেন।

‘মাত্র ১২ ঘণ্টা সময় পেয়েছিলাম মিছিল রাস্তায় নামানোর জন্য। পাঁচ শ লোক হয়েছিল। কিছু বছর আগে হলে এটা হতো না। হয়তো মাস কয়েক আগে হলেও পাঁচ শ লোক জড়ো করতে পারতাম না।’ বললেন দাস। অর্থাৎ ধীরে ধীরে মানুষ সিপিআই–এমের পাশেফিরছেন, তারা ক্ষমতা থেকে সরে যাওয়ার প্রায় ১০ বছর পরে। কিন্তু এই পাশে ফিরে আসা কি ভোটে রূপান্তরিত হচ্ছে, গণতন্ত্রে যা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন? বা আগামী দিনে হতে পারে, তেমন সম্ভাবনাও কি আছে? শমীক লাহিড়ি বললেন, এ মুহূর্তে এ প্রশ্নের উত্তর তাঁদের কাছে নেই। গত লোকসভা নির্বাচনে বামফ্রন্টের ভোট সাড়ে ৭ শতাংশে নেমে এসেছে। ২০১৪ সালে এ হার ছিল প্রায় ৩০ শতাংশ।

বিজ্ঞাপন

মিছিলে লোক হচ্ছে, হইহই করে ক্যানটিন চলছে, মানুষ সিপিআই–এম নেতাদের বলছেন তাঁরা তৃণমূল ও বিজেপি দুই দলকে নিয়েই বীতশ্রদ্ধ—কিন্তু প্রশ্ন হলো তারপরও সিপিআই–এমের ভোট কমছে কেন? দক্ষিণ কলকাতার এক সাধারণ সিপিআই–এম কর্মী বললেন, ‘আমার ব্যাখ্যা হচ্ছে মিটিং–মিছিলে লোক হচ্ছে তার কারণ, বিভিন্ন অঞ্চল কমিটি থেকে লোক আসছেন। কিন্তু বিভিন্ন অঞ্চলের লোক হওয়ার ফলে তাঁরা বিভিন্ন বিধানসভায় ভোট দিচ্ছেন। ভোটটা ভেঙে যাচ্ছে।’

সিপিআই–এমের ভোট শুধু ভাগ হচ্ছে না, সাংঘাতিক রকম কমেও যাচ্ছে। ২০১৬ সালে প্রায় ২৬ শতাংশ ভোট পাওয়ার পরে, ২০১৯ সালে বামফ্রন্ট পেল সাড়ে ৭ শতাংশ। আর এ সময়কালে ২০১৪ থেকে ২০১৯ সালের ভেতরে বিজেপির পশ্চিমবঙ্গে ভোট ১৭ শতাংশ থেকে বেড়ে হলো ৪০ শতাংশ। অর্থাৎ যে পরিমাণে বামফ্রন্ট ও সিপিআই–এমের ভোট কমেছে, ঠিক সেই পরিমাণে বিজেপির ভোট পশ্চিমবঙ্গে বেড়েছে। অর্থাৎ সিপিআই–এমের ভোটই গেছে বিজেপিতে। সিপিআই–এমের ভোট যদি ২০২১ সালের রাজ্যের নির্বাচনেও কমে, তবে বামফ্রন্টের থেকে বড় বিপদে পড়ার আশঙ্কা রাজ্য ক্ষমতাসীন তৃণমূলের। ২০১৯ সালে তৃণমূল ও বিজেপির ভোট কাছাকাছি চলে এসেছে। বিজেপি ৪২টি লোকসভা আসনের মধ্যে পেয়েছে ১৮টি, তৃণমূল ২২টি।

আরও একটা প্রবণতা হলো সিপিআই–এমের ভোট যখন ভাঙছে, তখন তার মুসলিম অংশটা যাচ্ছে তৃণমূলে, হিন্দু অংশটা বিজেপিতে। এটা হচ্ছে তীব্র মেরুকরণের রাজনীতির ফলে। এ মেরুকরণের রাজনীতি বিজেপিকে অনেক রাজ্যেই ক্ষমতায় এনেছে। পশ্চিমবঙ্গেও শক্তিশালী করছে। এতে অ–বিজেপি সব দলই কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ও হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

তবে এর ব্যতিক্রমও রয়েছে। যেমন উত্তর চব্বিশ পরগনার ছোট জাগুলিয়া পঞ্চায়েতের ইউনুস আলী। তিনি দীর্ঘ সময় বামফ্রন্টের শরিক দল ফরোয়ার্ড ব্লকের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরের ওই এলাকায় নির্বাচন করিয়ে ফরোয়ার্ড ব্লককে জিতিয়ে আনায় তাঁর বরাবরই বড় ভূমিকা ছিল। কিন্তু ২০১১ সালে তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পর ধারাবাহিকভাবে অত্যাচার চালানো হয় ইউনুস আলীর ওপর, তাঁর পরিবারের ওপর। সিপিআই–এমের লোকাল কমিটির সদস্য ইউনুস আলীর দাদাকে মিথ্যা মামলা দিয়ে জেলে ঢোকানো হয়। এসবের জেরে আলী ২০১৪ সালে বিজেপিতে যোগ দেন। এখন কাজ করেন বিজেপির হয়ে। সিপিআই–এমের দাবি, ২০০৯ সালের ১৬ মে থেকে ২০১৯ সালের ২৯ অক্টোবর—এই ১০ বছরে পার্টির ৬৬৬ কর্মী, সমর্থক, নেতাকে খুন করা হয়েছে। এর ফলে অনেক বামফ্রন্ট কর্মী বিজেপিতে যেতে বাধ্য হয়েছেন।

তৃণমূল কংগ্রেস, কয়েক বছর ধরে অবশ্য এটা বুঝেছে যে দিনের পর দিন মূল বিরোধী জোট বামফ্রন্টের কর্মীদের আক্রমণ করার ফলে তাঁরা বিজেপিতে চলে গেছেন। ফলে বামফ্রন্টের জায়গা নিয়েছে বিজেপি—তারাই হয়ে উঠেছে মূল বিরোধী শক্তি। তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, বামফ্রন্টের কর্মী–সমর্থকদের ওপর হামলা বন্ধ করতে হবে। তাতে হয়তো কিছুটা কাজ হয়েছে। পার্টির কর্মী–সমর্থকেরা মিটিং–মিছিলে আসতে পারছেন, পার্টি অফিস খুলতে পারছেন। কিন্তু ইতিমধ্যে ক্ষতি যা হওয়ার হয়ে গেছে। বামফ্রন্টের ভোট ডান দিকে অর্থাৎ বিজেপিতে চলে গেছে। আর এর জন্য সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে তৃণমূলেরই। তৃণমূলের নেতারা ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় স্বীকার করেন, এটা তঁাদের বড় ভুল।

শুভজিৎ বাগচী: ভারতের সাংবাদিক

মন্তব্য পড়ুন 0