default-image

পেট্রলবোমার সহযাত্রী
সাবধানেই যাচ্ছি। দেশশুদ্ধ সবাই সাবধান। বাসযাত্রীরা আরও বেশি সাবধান। গোটা বাসে একটি জানালাও খোলা নেই। খোলা জানালা মানেই পেট্রলবোমার আতঙ্ক। তাই সবাই জানালা এঁটে টাইট হয়ে বসে আছে। যাচ্ছি ‘খুনের শহর’ নরসিংদী। খুনের শহরের রাস্তায়ও তো ভয়ের আবহ থাকার কথা। উঠে গিয়ে কন্ডাক্টরের সঙ্গে গল্প জুড়ে দিই: ‘এই পথে গাড়ি পুড়েছে কোনো?’
আল আমিন নামের তরুণটি বলে, ‘পুড়ছে না আবার? অবরোধের পর্-থন তো পুড়ছে কয়েকটা।’
এই বাস যায় ভৈরবে। বোমা হামলা সব ওদিকেই ঘটেছে। জিজ্ঞেস করি, ‘এই এক মাসে কিছু ঘটছে?’
‘আমাগো কোম্পানিরই বাস পুড়ছে তিনটা।’
হঠাৎ চোখ চলে গেল বাসের নামের দিকে: চলনবিল এক্সপ্রেস। এই রাস্তায়ই এ কোম্পানির এ ধরনের বাস পুড়েছে, মানুষ পুড়েছে। এক চিলতে ভয় উঁকি দিল; তবে কি বাসশুদ্ধ আমরাও সম্ভাব্য নাশকতার দিকে ছুটে চলেছি?
চালকের সামনের কাচে লেখা অভয়বাণী: ‘আল্লা ভরসা’!
ছেলেটিকে বললাম, ‘ভয় করে না?’
‘ভয় করলে তো প্যাট ভরব না।’
মহাখালী থেকে টঙ্গী হয়ে গাজীপুর পেরোচ্ছি তখন। সড়কে কি লোকালয়ে উপেক্ষিত হরতালে বেরিয়েছে মানুষ। জীবন থমকায়, কিন্তু থেমে থাকে না।

গোপন নেতার খামারে
তাঁর নামে ১৭টি মামলা। তাঁর সামনে পাঁচটি মুঠোফোন। দুই দিন পরপর নম্বর বদলান। যেভাবে গ্রামের খামারবাড়িতে গোপনে বৈঠক করছেন, ষাটের দশকে সেভাবে কাজ করতেন বামপন্থী নেতারা। তিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির শিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক এবং দলের নরসিংদী শাখার সভাপতি। তাঁর স্ত্রীও ঘরছাড়া। তিনি জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক শিরিন সুলতানা—গুলশানের িবএনপি কার্যালয়ে খালেদা জিয়ার সহচরী। আর ইনি একসময়ের ডাকসাইটে ছাত্রনেতা ডাকসুর সাবেক জিএস খায়রুল কবির খোকন।
শুনছিলাম তাঁর ‘হাইডিং অ্যান্ড ফাইটিং’-এর গল্প। কেমন সেটা? দু-এক দিন পরপর শহরের ভেতরের কোনো রাস্তায় চার-পাঁচ শ লোক নিয়ে মিছিল করেন—মতান্তরে সংখ্যাটা দেড় থেকে দুই শ। একেক দিন একেক জায়গায় ঘুমান। কর্মীরা গোপন নেটওয়ার্কে খবর পান।
পুলিশ বা আওয়ামী লীগের লোকজন বাধা দেয় না?
‘আমরা তো নিষিদ্ধ দল না। তবে ঝটিকা মিছিল করি, জমায়েতের মধ্যে হাজির হয়ে আবার গা-ঢাকা দিই। সহিংসতা তো করছি না। আমি ৩ জানুয়ারি থেকে ঘরছাড়া। আমার স্ত্রী দেশনেত্রীর সাথে অবরুদ্ধ।’
সুনাম বলি আর দুর্নাম বলি, নরসিংদীর মানুষ মারাত্মক আত্মমর্যাদাবান। সামান্য অপমান থেকে খুনোখুনি হয়ে যেতে পারে। ব্যবসা নিয়ে, প্রেম-পিরিতি নিয়ে, জমিজমা নিয়ে নিত্য খুন-খারাবি হয়। অথচ গত বছরের ৫ জানুয়ারি থেকে এ বছরের ১৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত নরসিংদীতে কোনো রাজনৈতিক সহিংসতা হয়নি। জেলার মধ্যে যে বাসটি পুড়েছে, সেটিও অন্য জেলার, আহত ব্যক্তিরাও অন্য জেলার এবং ধৃত বোমাবাজও অন্যখানের।
খোকন বলছিলেন, ‘পরশুদিনও হিরু ভাইয়ের বাড়ির এলাকায় মিছিল করেছি। কেউ বাধা দেয় নাই। এখানে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সাথেও ব্যক্তিগত সম্পর্ক আছে।’ পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী লে. কর্নেল (অব.) নজরুল ইসলাম িহরু (বীর প্রতীক) নরসিংদী জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি। বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা খোকন তাঁকে সম্মান দিয়ে বললেন, ‘হিরু সাহেব প্রতিহিংসাপরায়ণ মানুষ না। আমাদের একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ আছে। তবে দুই জাতীয় নেত্রীর মধ্যে এমন সম্পর্ক না থাকা দুঃখজনক। এর খেসারত দিচ্ছে সমগ্র দেশ। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় মনে হতো আমরা একই দল করি।’
তাহলে কেন এমন হলো?
‘ক্ষমতার মোহ, বিরোধীদের নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার মানসিকতা ঢুকে গেছে সরকারি দলের মধ্যে। তারা চাইছে জঙ্গি সংগঠন প্রমাণ করে বিএনপিকে ধ্বংস করতে। পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি বাহিনীর সাথে যদি সমঝোতা করতে পারে, বিডিআর বিদ্রোহীদের সাথে যদি সমঝোতা করতে পারে, সাতই মার্চের পরেও যদি শেখ মুজিব পাকিস্তানিদের সাথে বসতে পারেন, তাহলে আমাদের সাথে বসতে অসুবিধা কোথায়?’
তাঁরা তো বলছেন, আপনারা নাশকতাকারী, তাই আলোচনার সুযোগ নেই।
‘সমঝোতা হলে এক দিনেই এসব থেমে যেত। দুই দলের কোন্দলের সুযোগ নিচ্ছে “তৃতীয় শক্তি”। তারা দুই দলকেই খাদের কিনারে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে। কেউই জনগণের কথা ভাবছি না। নিরীহ জনগণ ক্রসফায়ার হচ্ছে, অগ্নিদগ্ধ হচ্ছে, ব্যবসা–বাণিজ্য বন্ধ।’
আপনারা ক্রসফায়ারের বিরুদ্ধে যত সোচ্চার, পেট্রলবোমার বিরুদ্ধে তো তত স্পষ্ট ভাষায় বলছেন না!
‘জি, পেট্রলবোমারুদের বিরুদ্ধে বিএনপির আরও সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি থাকা দরকার। কিন্তু আমাদের তো ম্যাডামের সাথে দেখাই করতে দিচ্ছে না, রাস্তায় আসতে দিচ্ছে না। তবে পেট্রলবোমা ও জামায়াত বিষয়ে স্পষ্ট সিদ্ধান্ত আমিও চাই। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আমি শতভাগ সমর্থক। আমরা দাবি জানিয়েছি যাতে বিচার স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ হয়; প্রতিপক্ষকে দমনের রাজনৈতিক হাতিয়ার করা না হয়। এটুকু বলা যাবে না? আমি শেখ মুজিবকে হেয় করা সমর্থন যেমন করি না, তেমনি শহীদ জিয়ার অপমানও মানব না।’
চলে আসার আগে জানতে চাই, আন্দোলনে জয়ের আশা কতটা করছেন, িকসের ভিত্তিতে করছেন।
‘যেহেতু দেড় মাস প্রতিরোধ জারি রেখেছি এবং যেহেতু মানুষ সরকারের গোঁ পছন্দ করেনি, সেহেতু আমরা আশাবাদী। সরকারকে বুঝতে হবে, রশি বেশি টানলে ছিঁড়ে যাবে। তৃতীয় শক্তি চলে আসবে। আমি অগণতান্ত্রিকভাবে কারও ক্ষমতা দখল চাই না। চাই না বলেই তো অগণতান্ত্রিক উপায়ে ক্ষমতা আঁকড়ে রাখার বিরুদ্ধে আন্দোলন করছি। ইতিমধ্যে রাজনীতি রাজনীতিবিদদের হাতের বাইরে চলে গেছে।’
আত্মবিশ্বাসী স্বর কিন্তু চোখেমুখে অনিশ্চয়তা নিয়ে তিনি সাদা গাড়িতে করে চললেন অন্য কোনো আস্তানায়। আমি চললাম কর্মচঞ্চল শহরের দিকে।
ওরা বিলীন হয়ে যাবে
‘না, কোনো অবস্থাতেই মীমাংসা হবে না। তারা স্বাধীনতাবিরোধী, তাদের সাথে আপস না।’ দীর্ঘদিনের পোড় খাওয়া রাজনীতিবিদ। ‘হাইব্রিড’ নেতাদের িভড়ে তাঁকে আলাদা করে চেনা যাবে। তিনি নরসিংদী আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল মতিন ভূঁইয়া। শহরের টিনপট্টিতে তাঁর গদিঘরে কথা হয়। চোখে ছানির অপারেশন বিধায় কালো চশমা পরায় তঁাকে রহস্যময় লাগছিল। কথার পেছনে যুক্তি জোগাতে বললেন, ‘তাদের জঙ্গিবাদী দল তো আগে বলা হয় নাই। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির পর তাদের কার্যকলাপের জন্য বলা হইছে। জনগণও তাদের বিরুদ্ধে কথা বলতেছে।’
আপনারাও তো ধরপাকড়–নির্যাতন করছেন, ক্রসফায়ার চলছেই। তাদের রাস্তায় নামতে দিচ্ছেন না।
‘যখন পরিস্থিতি ধৈর্যের বাইরে চলে যায়, তখন অনেক ক্ষেত্রে অনেক কিছুই হয়—করতে হয়। তারা অস্থিতিশীল করে তুলতেছে দেশ। যারা গণতন্ত্রে বিশ্বাসী, তারা চাইবে না অস্থিতিশীলতা হোক।’
সংলাপে অসুবিধা কী? দেশের তো ক্ষতি হচ্ছে, তাই না?
‘সংলাপের পথ তো উনিই বন্ধ করেছেন। একবার প্রধানমন্ত্রীর টেলিফোনের জবাবে রাগ দেখালেন, আরেকবার দরজা খুললেন না। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে আসলেন না!’
শহরের দেয়ালে খুন-ডাকাতির বিরুদ্ধে পোস্টার। দেয়ালে বিএনপি-আওয়ামী লীগের পোস্টারের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান। আগুনে মরুভূমিতে এই শান্তির মরূদ্যানের রহস্য জানতে চাইলাম।
‘এটা নরসিংদীর ঐতিহ্য এবং এই ঐতিহ্য বজায় থাকবে। তাদের হরতালে আমরাও একসময় দোকান বন্ধ রাখছি। আমাদের হরতালে তারাও বন্ধ রাখছে। আমাদের কোন্দল নিজ দলের মধ্যে, প্রতিপক্ষের সাথে আমরা মারামারি করি না (মনে পড়ল মেয়র লোকমান হত্যার কথা)। রাজনীতি তো এখানে আত্মীয়স্বজনের মধ্যেই হয়। দুই দলের নেতাদের পরিবারের মধ্যে বিয়েশাদিও চলে।’
রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়ে আবদুল মতিন ভূঁইয়া আরও বললেন, ‘ব্যবসা করে খাই, রাজনীতিকে প্রতিহিংসায় নিই না। বিএনপির নেতারাও নেন নাই। ঢাকার রাজনীতি থেকে আমাদের রাজনীতি আলাদা। রাজনীতি যত মফস্বলে যাবে, তত ধীর হতে থাকবে। বিএনপি এখানে ঘোষণা দিয়ে সভা করুক না, সমস্যা হবে না। উনি পাঁচ-ছয় মিনিটের জন্য আন্দোলনে নামেন যাতে পরে, মনোনয়নের সুবিধা হয়।’
বললাম, বেগম জিয়াকে আপনার কেমন মনে হয়?
কালো চশমা এবার সোজা আমার দিকে, বললেন ‘বেগম জিয়ার হিংসা-বিদ্বেষের পেছনে তাদের নেতাদের ভূমিকা থাকতে পারে।’
চোখ ঢাকা বলে চোখের ভাষা আর পড়া হলো না। জিজ্ঞাসা করি, ‘৬৫ বছরের গণতান্ত্রিক ঐতিহ্যবাহী দলের সরকারে যদি ১৫৪ জন সাংসদই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন, সেটা কি আপনাকে সুখী করে?’
‘বুঝেন না? প্রতিযোগিতাহীন অবস্থায় ক্ষমতায় কিছু ঘাটতি থাকেই।’

তুমি কার লাশ?
আবার বাসের জন্য দাঁড়িয়েছি মহাসড়কের ধারে। রাত সাড়ে আটটা বাজে। এক পুলিশ হাতের ইশারায় ডাকল। আমিও ইশারায় ডাকলাম। পরে দুজনই আপসে কিছুটা এগিয়ে মুখোমুখি হই। সওয়াল-জবাবের পর জানতে চাই, ‘কেমন চলছে ডিউটি?’
বললেন, ‘কিছু বলার নাই, চেহারা দেখে বুঝে নেন।’ তরুণ ছেলেটির শুকনা মুখ আর মনমরা ভাব দেখে মায়াই লাগল। এমন মানুষেরা কীভাবে করে ক্রসফায়ার-এনকাউন্টার?
দিনের চেয়ে রাতের বাস খুবই কম। অনেকক্ষণ অপেক্ষার পর একটি বাস পাওয়া গেল। দরজায় প্রহরী নিয়ে বন্ধ
জানালার বাসটি অন্ধকারে ছুটতে শুরু করল। গন্তব্য যাত্রাবাড়ী; যেখানে এ রকমই রাতে এ রকমই নিম্নবিত্ত যাত্রীদের ২৪ জন দগ্ধ হয়েছিলেন, মারা গিয়েছিলেন একজন। সহযাত্রীদের মুখগুলোতে চোখ বোলালাম, আজ যদি কিছু ঘটে, তাহলে কে মরবে কে বাঁচবে? হঠাৎ দরদে মনটা ভরে গেল। বিপদের দিনে পাশের লোকটিই জনগণ, আর জনগণের তো কেবল জনগণই আছে।
ফারুক ওয়াসিফ: সাংবাদিক ও লেখক।
[email protected]

বিজ্ঞাপন
কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন