বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

২০০৯-২০২১ এ ইতিহাসের এক যুগ শেষ হয়েছে, কিন্তু ইতিহাসের অবসান হয়নি, ইতিহাস চলমান। সেই ইতিহাস এখন রাজনীতিতে নতুন মুখ খুঁজছে। নতুন একটা শ্রেণিও তার জন্যই যেন মাঠে হাজির। এরা উঠতি মধ্যবিত্ত শ্রেণি। শিক্ষা, প্রযুক্তি ও ব্যবসার নতুন পথ ধরে গত এক যুগে কয়েক কোটি মানুষ কোনোমতে নিম্ন থেকে নিম্নমধ্যবিত্তে উঠে বসেছে। প্রবাসীদের অর্থে, কৃষকের উদ্বৃত্তে এবং টুকিটাকি অর্থনীতির (ইনফরমাল) বদৌলতে গ্রাম হয়েছে শহর, আর শহরে হয়েছে মফস্বলের উপনিবেশ। পুরোনো মধ্যবিত্তের আশা-আকাঙ্ক্ষা, রুচি ও স্বার্থ ছিল গোষ্ঠীকেন্দ্রিক। সারা দেশে কয়েক লাখ মধ্যবিত্ত পরিবার বড় পুঁজি ও বড় রাজনৈতিক শক্তির আনুগত্য করে ভালোই ছিল। রাজধানী ও পাবলিক পরিসরকে তারা আপন আদলে সাজিয়ে নিয়েছিল। উঠতি মধ্যবিত্ত সেই সাজানো জগৎকে বদলে দিয়েছে। দেশের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত বলে পুরোনোরা যেখানে ইউরো-মার্কিনমুখী, সেখানে নতুনেরা দেশটাকেই আঁকড়ে ধরতে চাইছে। রাজনৈতিক বৈরাগীদের আলোকিত ও সুশীল সমাজ তৈরির প্রকল্পও ব্যর্থ হয়েছে।

দুর্বৃত্তায়িত অর্থনীতির পক্ষে জনতুষ্টিবাদী রাজনীতির দাপটের যুগে ভদ্রলোক মধ্যবিত্তের আর দরকার পড়ছে না। এত দিন শাসক ও শাসিতদের মধ্যে মধ্যস্থতার সুবাদে মধ্যবিত্ত নিজেকে প্রাসঙ্গিক রেখেছিল। এখন অর্ধশিক্ষিত, অর্ধবেকার ও বখাটে তরুণদের একটি দল এই দুর্বৃত্তায়িত রাজনীতির উমেদারি করে তাদের হটিয়ে দিয়েছে। পুরোনো মধ্যবিত্তের সাংস্কৃতিক কর্তারা জনতামুখী না হয়ে ক্ষমতামুখী হয়েছে। এ রকম সময়ই মানুষ নতুন নেতা চায়, নতুন রাজনীতি চায়। পুরোনো মধ্যবিত্তের প্রায় অবান্তর হয়ে যাওয়ায় যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা পূরণে ইচ্ছুক গ্রাম-মফস্বল থেকে আসা নতুন মধ্যবিত্তের প্রতিনিধিরা। তাদের একটা অংশ রাষ্ট্রের পদ ও সম্পদে হিস্যার দাবি নিয়ে কোটা সংস্কার আন্দোলন করেছে, সড়কে নিরাপত্তা আন্দোলনে রাষ্ট্র মেরামতের ডাক দিয়েছে। তাদের প্রতিনিধিরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ডাকসুর সর্বশেষ নির্বাচনে জয়ীও হয়েছে।

উঠতি মধ্যবিত্তের এই হাজিরানা আমাদের সময়ের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও সামাজিক ঘটনা। কোটা সংস্কার আন্দোলনের অন্যতম নেতা ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হক নতুন সামাজিক শক্তির মুখপাত্র হতে চাইছেন। সহযোদ্ধাদের নিয়ে নতুন রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ গণ অধিকার পরিষদ গঠনও করেছেন। এই দলের অধিকাংশ নেতা-কর্মী উঠতি মধ্যবিত্ত থেকে আসা। তাঁদের ভাব, ভাষা ও কর্মসূচি দেখে মনে হয়, উঠতি মধ্যবিত্ত ঘরানাই তাঁদের পাওয়ার হাউস।

পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে বনেদি/আশরাফ খাজা-গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে উঠতি মধ্যবিত্ত ভাসানী-মুজিবের দলে শামিল হয়েছিল। উঠতি মধ্যবিত্ত এভাবে বারবার জাতির সামনের কাতারে চলে এসেছিল, জাতীয় ঐক্যের বর্শার ফলামুখ হয়ে উঠেছিল। কিন্তু একুশ শতকে দেশি-বিদেশি স্বার্থান্বেষী মহলের নানামুখী চাপে গণ অধিকার পরিষদ জনগণের প্রতি কতটা বিশ্বস্ত থাকতে পারবে, সেটা এক বড় প্রশ্ন।

সরকারি নিপীড়নে প্রধান বিরোধী দল বিএনপির ছত্রখান অবস্থা নতুন দলের জন্য সুযোগ এনেছে। গত শতকের তিরিশের দশকে শেরেবাংলার কৃষক-প্রজা পার্টি ছিল বনেদি বাবুশ্রেণির বিপরীতে বঞ্চিত উঠতি মধ্যবিত্তের দল। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে বনেদি/আশরাফ খাজা-গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে উঠতি মধ্যবিত্ত ভাসানী-মুজিবের দলে শামিল হয়েছিল। উঠতি মধ্যবিত্ত এভাবে বারবার জাতির সামনের কাতারে চলে এসেছিল, জাতীয় ঐক্যের বর্শার ফলামুখ হয়ে উঠেছিল। কিন্তু একুশ শতকে দেশি-বিদেশি স্বার্থান্বেষী মহলের নানামুখী চাপে গণ অধিকার পরিষদ জনগণের প্রতি কতটা বিশ্বস্ত থাকতে পারবে, সেটা এক বড় প্রশ্ন।

লক্ষণ বিচারে তারা মাছকে মাছের জাত মনে হলেও তা মাছ নয়। গুণবিচারে দেখা যায়, এটির মেরুদণ্ড নেই, তাই এটি মাছ নয়। নুরুলদের প্রতিবাদ যেমন সত্য, তেমনি সরকারি ছায়াতলে থাকাটাও সত্য। নুরুলের দল উঠতি মধ্যবিত্তের হলেও দেশের অপরাপর শ্রেণি, বিশেষ করে শিক্ষিত মধ্যবিত্তের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ ক্ষীণ। গণ-অভ্যুত্থান কিংবা গণনির্বাচন করতে গেলে কেবল নিম্নবিত্তের ভালোবাসায় কুলাবে না, ক্ষমতার বিভিন্ন খুঁটিকে হয় নিজের পক্ষে, নয়তো নিরপেক্ষ রাখতে হবে। তার জন্য বর্তমানে মধ্যপন্থাই উপযুক্ত, যেহেতু ক্ষমতাশালীরাই চরমপন্থী ও মেরুকরণপ্রিয়। মেরুকরণ হতে পারে দেশদরদি ও দেশবিরোধী হিসেবে, বাংলাদেশপন্থী বনাম বাংলাদেশবিরোধী হিসেবে। একাত্তরের পরাজিতদের ধর্মঘেঁষা মেরুকরণ ও জয়ীদের জাতীয়তাবাদী মেরুকরণ ভয় পায় মানুষ। জাতীয়তাবাদ, পরিচয়বাদ, সম্প্রদায়বাদের আগুনে পোড়া বাংলাদেশের এখন সমন্বয়বাদের শুশ্রূষা দরকার। জাতীয় ঐক্য ছাড়া সেটা হবে না।

সেখানেই বিএনপির প্রশ্নটা জেগে আছে। বিএনপিকে ছাড়া অর্থবহ বিরোধী জোট আসলে কতটা বাস্তবসম্মত? বিএনপিও তা মানবে না। বিএনপির জীবনে যেখানে সর্বনাশ, সেখানে নুরুলদের বসন্তকাল দেখে অনেকের মনেই সন্দেহ। তারা কি আরেকটা জাতীয় পার্টি হতে যাচ্ছে? ডাকসুর নির্বাচনে নুরুলদের জয়ী হতে দেওয়া বা নির্বিঘ্নে দল গঠন করায় এই সন্দেহ আরও জোরদার হয়। আগামী নির্বাচনে বিএনপি অংশ না নিলে গণ অধিকার পরিষদ, গণসংহতি আন্দোলনসহ বিরোধী ডান-বাম দলগুলো কী করবে? বিএনপিকে ছাড়া ভোটে যাওয়াকে সরকারের পক্ষে কাজ করা হিসেবেই সাধারণ মানুষের কাছে বিবেচিত হবে। নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ না হলেও তখন সরকার বলতে পারবে, বহুদলীয় নির্বাচনই হয়েছে। বিএনপিহীন সংসদে যত উচ্চবাচ্যই করা হোক না কেন, তা উদারতার বিজ্ঞাপন হবে। তারা বলতে পারবে, দেখো, গণতন্ত্র ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার কী সুন্দর নমুনা! সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন না হওয়ার আশঙ্কা যতটা বাড়বে, সরকারের কাছে ছোট দলগুলোর প্রাসঙ্গিকতাও ততটাই বাড়বে।

গণ অধিকার পরিষদের মতো নবীন ও ছোট দলগুলো কি বিরোধী জমায়েতকে বিভক্ত করে সরকারের খেলার পুতুল হবে, নাকি ক্ষমতাসীনদের জন্য সত্যিকার চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবে, তা সামনের দিনেই পরিষ্কার হয়ে যাবে। উঠতি মধ্যবিত্তের তরুণেরা কিন্তু নতুন রাজনীতির জন্য প্রস্তুত।

ফারুক ওয়াসিফ লেখক ও সাংবাদিক
[email protected]

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন