বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

এ সম্মেলনে অস্ট্রেলিয়াকে পরমাণু শক্তিসম্পন্ন সাবমেরিন দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এসব সাবমেরিনে পরমাণু বোমা বানানো সম্ভব এমন মাত্রার ইউরেনিয়াম রয়েছে। অস্ট্রেলিয়াকে এ ধরনের সাবমেরিন দেওয়া আন্তর্জাতিক পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি (নন প্রলিফারেশন ট্রিটি, সংক্ষেপে এনপিটি) এবং আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) বিধির পরিপন্থী হবে বলে বোঝা যাচ্ছে। যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে ৩.৬৭ শতাংশের বেশি ইউরেনিয়ামসমৃদ্ধ করতে দিতে রাজি নয়, সেখানে অস্ট্রেলিয়াকে এই মাত্রার পরমাণু শক্তিসম্পন্ন ডুবোজাহাজ দেওয়া আইনগত ও নৈতিকভাবে কতটুকু ন্যায্য হবে, তা এক বিরাট প্রশ্ন।

২০০৭ সালে জাপানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে নিরাপত্তা সংলাপ হিসেবে কোয়াড গঠনের ধারণাটি প্রথম দেন। ২০২১ সালের ১২ মার্চ কোয়াডভুক্ত দেশগুলোর আনুষ্ঠানিক বৈঠকের পর যে বিবৃতি প্রকাশ করা হয়, তাতে ‘নিরাপত্তা’ শব্দটি কৌশলগত নিরাপত্তা অর্থে ব্যবহৃত হয়। সর্বশেষ কোয়াড বৈঠকের আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত—উভয় দেশই জানায়, এটি কোনো সামরিক জোট নয়। যদিও কোয়াডভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে কয়েকটি সামরিক চুক্তি হয়েছে এবং সম্মিলিতভাবে তারা সামরিক মহড়াও দিয়েছে। গত ২৪ সেপ্টেম্বর কোয়াডের যৌথ বিবৃতিতে ‘নিরাপত্তা’ ইস্যুর চেয়ে স্বাস্থ্য, সরবরাহ ব্যবস্থাপনা ও সাইবার নিরাপত্তা তাদের আলোচনায় প্রাধান্য পায়।

ভারত-প্রশান্ত মহাসাগর আদতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের ভূকৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্র। এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা মূলত নৌ এলাকাভিত্তিক। যেহেতু ভারতের সামরিক শক্তি নৌভিত্তিক নয়, সেহেতু কোয়াডে ভারতের উপস্থিতি নৌশক্তিতে বলীয়ান যুক্তরাষ্ট্রের জন্য খুব একটা উপকারে আসবে না।

ভারতের সঙ্গে উত্তরাঞ্চলীয় সীমান্ত নিয়ে চীনের উত্তেজনা যখন চলছে, তখন ‘এশিয়ার ন্যাটো’ হিসেবে পরিচিতি পাওয়া কোয়াড যদি তার নিরাপত্তা ইস্যু থেকে সরে যায়, তাহলে সেই জোটে থেকে ভারতের লাভ কতটুকু? যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য অস্ট্রেলিয়াকে আটটি পারমাণবিক শক্তিসম্পন্ন সাবমেরিন দিতে যে চুক্তিটি করে, তার নাম অকাস চুক্তি। চুক্তি অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে সাবমেরিনগুলো যুক্তরাজ্যের কাছে হস্তান্তর করেছে। সেখান থেকে অস্ট্রেলিয়া সেগুলো বুঝে নেবে। পারমাণবিক সাবমেরিন সাধারণ ডিজেলচালিত সাবমেরিনের মতো নয়। এটি বহুদূর থেকে লক্ষ্যস্থলে নির্ভুলভাবে আঘাত হানতে সক্ষম।

অকাস চুক্তির মানে হলো অস্ট্রেলিয়া এর আগে ফ্রান্সের কাছ থেকে ডিজেলচালিত যে ১২টি সাবমেরিন কিনতে চুক্তি করেছিল, তা বাতিল করা। এতে ফ্রান্সের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার দূরত্ব এবং যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়বে। বলা যায়, এর মাধ্যমে অস্ট্রেলিয়া ভারত–প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক জোটে যোগ দিয়েছে। তার মানে চীনকে চাপে রাখতে কিছুদিন আগেও যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হচ্ছিল, সে জায়গাটি এখন আর থাকছে না। চীনকে চাপে রাখার জন্য যুক্তরাষ্ট্র এত দিন যেভাবে কোয়াডের সদস্য হিসেবে ভারতকে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে আসছে, সেই জায়গাটি এখন নড়বড়ে হয়ে গেছে।

অস্ট্রেলিয়ার সাম্প্রতিক কাজকারবারে মনে হচ্ছে, দেশটি তার প্রতিবেশীদের শক্তিমত্তা দেখাতে চায় এবং সে জন্য দেশটি যুক্তরাষ্ট্রকে ‘বড় ভাই’ হিসেবে মেনে নিয়েছে। ভারত-প্রশান্ত মহাসাগর আদতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের ভূকৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্র। এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা মূলত নৌ এলাকাভিত্তিক। যেহেতু ভারতের সামরিক শক্তি নৌভিত্তিক নয়, সেহেতু কোয়াডে ভারতের উপস্থিতি নৌশক্তিতে বলীয়ান যুক্তরাষ্ট্রের জন্য খুব একটা উপকারে আসবে না। আবার ভারতের সঙ্গে চীনের উত্তেজনা চলে মূলত স্থলসীমানায়। অরুণাচল প্রদেশের মতো পার্বত্য এলাকায় কোয়াডের অন্য মিত্ররা ভারতকে কোনো সহায়তাই করতে পারবে না।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন ভারত সরকার মনে হচ্ছে কোয়াড ইস্যুতে ভুল করেছে। ভারত নিজেকে চীনের হাত থেকে বাঁচাতে কোয়াডের কাছে যতটা সহযোগিতা আশা করেছিল, সে আশা ক্রমে ফিকে হয়ে আসছে। অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের এ পারমাণবিক সাবমেরিন আদান–প্রদান বিষয়টিকে আরও প্রকাশ্যে এনেছে।

এশিয়া টাইমস থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত

প্রবীর পুরকায়স্থ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম নিউজ ক্লিক ডট ইন-এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন