বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আফগানিস্তানে ঢোকার পর ন্যাটোর বিশেষজ্ঞরা দেশটির খনিজ সম্পদ সম্পর্কে ১৯৭০-৮০ সালের দিকে রুশদের করা অনুসন্ধানী প্রতিবেদনগুলো হাত করে নিয়েছিলেন। তার সঙ্গে মিলিয়ে পেন্টাগনের উচ্চ প্রযুক্তিভিত্তিক অনুসন্ধান শেষে গজনিতে লিথিয়ামের বিপুল মজুতের খবর বের হয়।

লিথিয়াম মূলত খুদে কম্পিউটারের ব্যাটারি থেকে বিবিধ সামরিক যন্ত্রে কাজে লাগে। বৈদ্যুতিক গাড়ির আসন্ন বিপ্লবের জন্যও এটা জরুরি। বিশ্বজুড়ে এটা কৌশলগত এক খনিজ এখন। বিবিসি এক প্রতিবেদনে লিথিয়ামের কারণে আফগানিস্তানকে ‘ভবিষ্যতের সৌদি আরব’ বলেও প্রচার করেছিল। একই রকম বড় লিথিয়াম মজুত নিয়ে তীব্র ঝামেলা পোহাচ্ছে বলিভিয়ার রাজনীতি। সেখানে ক্ষমতাচ্যুত ইভো মোরলেস তাঁর বিরুদ্ধে সংঘটিত অভ্যুত্থানে যুক্তরাষ্ট্রের মদদের জন্য লিথিয়ামের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাকে কারণ হিসেবে দাবি করেছিলেন। লিথিয়ামের আফগান মজুত প্রায় বলিভিয়ার সমান। আসন্ন দিনগুলোতে গজনির নিয়ন্ত্রণ তাই অনেকের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

যুক্তরাষ্ট্রের সাহায্য কমে যাওয়ামাত্র আফগানদের দরকার হবে রাশিয়া, চীন, পাকিস্তান ও ইরানকে। এসব দেশ এখন তালেবানদের সঙ্গে একটা ‘উইন-উইন’ সম্পর্ক গড়তে তৎপর।

আফগানিস্তানে লিথিয়াম, কপার প্রভৃতি খনিজের বাইরেও আছে গ্রেড-৪ মানের হেরোইনের উপাদান হিসেবে আফিম উৎপাদনের কারবার। দেশটিতে প্রযুক্তিনির্ভর মেথামফেটামিননির্ভর মাদকের উৎপাদনও বাড়ছে এখন। এ বিষয়ে সাম্প্রতিক সব রিপোর্ট বলছে দেশটির মাদক-অর্থনীতির আয়তন এখন ২০ বছর আগের অবস্থার চেয়েও বড়। ভবিষ্যতে এসব বিষয়েও তালেবানদের সঙ্গে বাইরের শক্তিগুলোর নানা ফয়সালা হবে। আফগান মাদক-পণ্যের দুই প্রবেশদ্বার ইরান ও পাকিস্তানের অনেক অদৃশ্য শক্তি এসব বোঝাপড়ায় এগিয়ে থাকবে। অবরোধে ইরানের মুদ্রার মান পড়ে যাওয়ায় আফগান মাদক উৎপাদকেরা পাকিস্তানমুখী নতুন রুটে চলছে। এটা একই সঙ্গে পাকিস্তানিদের মাঝে মাদকের বিস্তারও বাড়াবে হয়তো।

সোভিয়েতবিরোধী যুদ্ধের সময় আফগান গেরিলাদের অর্থ সংস্থানে সিআইএ হেরোইন বাজারজাত করার কাজে পাক-আফগান সীমান্তে স্থানীয়দের যেসব সহায়তা দিয়েছিল—তালেবান কর্তৃত্বের সময় সেই ব্যবস্থাপনা কী আকার নেয়, সেটাও দেখার বিষয়।

মাইনিং শিল্পের সুদিন
আফগানিস্তানের খনিজের বৃত্তান্ত লিখতে বসলেই জালমে খলিলজাদের কথা চলে আসে। তালেবানদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের শান্তিচুক্তিতে তিনিই দেশের পক্ষে স্বাক্ষর শেষোক্ত করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের এই কূটনীতিক দীর্ঘ সময় যুক্ত ছিলেন তেল কোম্পানি ইউনিকলে। মাত্র ১৯৮৪ সাল থেকে তিনি ‍যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক।

পশতু বংশজাত হওয়ার কারণে তালেবানদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগের বয়স প্রায় ২৫ বছর। ২০০১ সালে তালেবানরা ক্ষমতা থেকে উৎখাতের আগে তাদের মন্ত্রীদের টেক্সাসে ইউনিকল অফিসে নিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। তখনো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তালেবান সরকারের কূটনীতিক সম্পর্কও ছিল না। মূলত ইউনিকলের হয়ে আফগানিস্তানের ওপর দিয়ে ৮২০ মাইল লম্বা পাকিস্তান-তুর্কমিনিস্তান গ্যাস পাইপলাইন বসানোর কাজটি (‘সেন্ট-গ্যাস’ প্রকল্প নামে পরিচিত) এগিয়ে দেওয়া ছিল খলিলজাদের দায়িত্ব। সে সময় বছরে ৫০ থেকে ১০০ মিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে এ রকম একটা অনুমোদন দিতে রাজি ছিল তালেবান। পরবর্তী যুদ্ধ-দামামার মাঝে প্রকল্পটা এগোয়নি। তাতে খলিলজাদের ওপর যুক্তরাষ্ট্র বা তালেবান, কারোরই আস্থা কমেনি। ২০১০-এ তিনি আরব আমিরাতভিত্তিক আরেক তেল কোম্পানি আরএকের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য হন। একই খাতে কাজ করা নরওয়ের কোম্পানি ডিএনওর পরিচালক সদস্য ছিলেন তিনি। ইরাকের কুর্দি এলাকায় ডিএনও ২০০৪ সালে কাজ পেয়েছিল। খলিলজাদ ২০০৫-০৭ সময়ে ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতও ছিলেন। যুদ্ধ, আগ্রাসন ও জ্বালানি ব্যবসা সব সময় তাঁর জীবনবৃত্তান্তের সঙ্গে লেগে আছে। চলতি ‘শান্তিচুক্তি’ সফল হলে তাঁকে আফগানিস্তানে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় দেখা যেতে পারে। কিংবা তাঁর পুত্রকে।

খলিলজাদের ছেলে আলেক্সান্ডার বেনার্ড পিতার আনুকূল্যে মধ্য এশিয়ায় খনি ব্যবসায়ীদের পক্ষে কনসালটেন্সি করে থাকেন। পিতার গড়া প্রতিষ্ঠান গ্রাইফোন পার্টনারের এমডি এখন বেনার্ডই। মাইনিং করপোরেটদের জন্য আসন্ন আফগানিস্তান একটা ভালো সম্ভাবনা। বেনার্ডের কদর বাড়তে পারে এ সময়। একই সঙ্গে দেশটির বায়ু, পানি ও ভূমির দূষণও বাড়াবে এ সময়।

কপার মজুত তালেবানকে চীনের মিত্র করে তুলবে
যুক্তরাষ্ট্রের সাহায্য কমে যাওয়ামাত্র আফগানদের দরকার হবে রাশিয়া, চীন, পাকিস্তান ও ইরানকে। এসব দেশ এখন তালেবানদের সঙ্গে একটা ‘উইন-উইন’ সম্পর্ক গড়তে তৎপর।

রাষ্ট্রপরিচালকদের হাত করে কীভাবে বড় বড় প্রকল্প নিতে হয়, তৃতীয় বিশ্বে সে বিষয়ে চীনের দক্ষতাই বেশি। আফগানিস্তানে গত ২০ বছর ন্যাটোর শাসন চললেও, মেস এয়াংকের সবচেয়ে বড় কপার মজুত চীনের রাষ্ট্রীয় সংস্থা এমসিসি (মেটালুরজিক্যাল করপোরেশন অব চায়না) ৩ বিলিয়ন ডলারের চুক্তিতে লিজ নিতে পেরেছিল ২০১৭ সালে। সে সময় সংবাদ বেরিয়ে ছিল খনিজবিষয়ক মন্ত্রী মোহাম্মদ ইব্রাহিম আদেলকে এমসিসি ৩০ মিলিয়ন ডলার দিয়েছিল এ ‘চুক্তি’তে। দুবাইয়ে ওই লেনদেন সম্পন্ন হয়েছিল। ঘটনা জানাজানি হয়ে যাওয়ার পর ইব্রাহিম আদেল পদচ্যুত হন পরে।
তাতে দুর্নীতি থেমে নেই সেখানে। বর্তমান প্রেসিডেন্ট আশরাফ ঘানির বিরুদ্ধেও এসওএস ইন্টারন্যাশনাল নামে যুক্তরাষ্ট্রের একটা কোম্পানিকে দুর্নীতির মাধ্যমে কুনার প্রদেশে খনিজ সম্পদে নিয়ন্ত্রণ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ আছে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের দুর্নীতির সূচকে গত বছর আফগানিস্তান যে তলানিতে (১৬৫/১৮০) ছিল তাতে খনিজ খাতের বড় অবদান আছে। গত ২০ বছর যুদ্ধের মাঝেই খনিজ উত্তোলনের বিভিন্ন কাজ থেকে তালেবানরাও স্থানীয়ভাবে বছরে গড়ে আড়াই থেকে ১০ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত চাঁদা নিয়েছে। এভাবে খনিজ খাতের অধিকাংশ কাজে এখানে এত দিন সরকারের আমলা-মন্ত্রী এবং স্থানীয় সশস্ত্র গেরিলাদের অর্থ দিয়ে ব্যবসা করেছে করপোরেটরা।

কাবুলের ২৫ মাইল দক্ষিণে লগার প্রদেশের বহুল আলোচিত মেস এয়াংক খনিতে প্রায় ৬০ মিলিয়ন মেট্রিক টন কপার মজুত আছে বলে অনুমান করা হয়। তাড়াহুড়ো করে লিজ নিলেও চীন এখানে উত্তোলন শুরু করতে পারেনি সময়মতো। নিরাপত্তা পরিস্থিতি সুবিধার ছিল না। তা ছাড়া যে বিপুল জনগোষ্ঠী খনি এলাকায় বাড়িঘর হারাবে, তাদের পুনর্বাসন করার বিকল্প কিছু এখনো গড়ে তোলা হয়নি। তবে চীন এই মজুত কোনোভাবে হাতছাড়া করবে না। বৈশ্বিক কপার চাহিদার অর্ধেক এখন তাদের। তালেবান যে তাই চীনের বন্ধু হয়ে উঠবে, সেটা অস্বাভাবিক নয় মোটেই।

মেস এয়াংকের কপার মজুতে চীনের আগ্রহের মতোই অনেক দেশের আগ্রহের আরেক জায়গা দেশটির হাজিজাক খনি। এখানে রয়েছে বিশাল লৌহ আকরিকের মজুত। এই এলাকাটি বামিয়ানে পড়েছে, যা কাবুল থেকে ১৩০ কিলোমিটার পশ্চিমে। ২ দশমিক ২ বিলিয়ন টন লৌহ আকরিক আছে এখানে। ২০১১ সালে ভারতের কয়েকটি কোম্পানি এই ক্ষেত্রটি ১০ বিলিয়ন ডলার দামে বরাদ্দ পায়। চীনের মতো তারাও কাজে নামতে পারেনি। হয়তো আর পারবেও না।

আয়রোজগারের জন্য খনিজ সম্পদ আর পর্যটন ছাড়া তালেবানরা তেমন কিছু পাবে না। আন্তর্জাতিক শক্তিগুলো আফগানিস্তানের এই দুর্বলতার সুযোগ নিতে উদ্‌গ্রীব। তালেবানদের বিনিয়োগ দরকার মানবসম্পদ তৈরি ও অবকাঠামো খাতে। আর বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ থাকবে সস্তায় খনিজ পেতে।

মেস এয়াংকের কপার বা তামা দ্রুত সরাতেই চীন আফগানিস্তানে বারবার রেলে বিনিয়োগের লোভ দেখাচ্ছে। পাকিস্তান আর রাশিয়ারও কিছু প্রিয় অর্থনৈতিক প্রকল্প আছে আফগানিস্তানে। তালেবানদের নিয়ে টানাটানিতে লিপ্ত তারাও!

৪৭ ভাগ আফগান দরিদ্র, কাজে লাগাতে হবে সম্পদ
খনিজ সম্পদে উর্বর হলেও আফগানিস্তান বিশ্বের অন্যতম দরিদ্র দেশ। প্রায় পৌনে চার কোটি মানুষের এই দেশে এখনো ৪৭ ভাগ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে পড়ে আছে, দিনে যাদের আয় ১ দশমিক ৯ ডলারের কম। ৩০ লাখ আফগান শরণার্থী হয়ে আশপাশের দেশে আছে। যুদ্ধ শেষ হলে এরা বিধ্বস্ত জনপদগুলোতে ফিরবে। জন্ম হার এবং বেকারত্বেও দেশটি বেশ এগিয়ে। এ রকম সবার জন্য খাদ্য, বাসস্থান ও কাজের ব্যবস্থা করতে হবে ভবিষ্যতের আফগানিস্তানকে। আয়তনে বাংলাদেশের চার গুণের বড় এই দেশটি যুদ্ধে-যুদ্ধে একটা বিধ্বস্ত জনপদ ছাড়া এখন আর কিছুই নয়। অবকাঠামো বলতে যা বোঝায় তার কিছু গোলার হাত থেকে রক্ষা পায়নি। পাশাপাশি, ৮০-৯০ ভাগ নাগরিক শিক্ষার সুযোগবঞ্চিত। বন্দুক চালানো ছাড়া সংখ্যাগরিষ্ঠ তরুণ আর কিছুতে প্রশিক্ষণ পায়নি। একটি জনগোষ্ঠীকে বন্দুক সংস্কৃতি থেকে কাগজ ও কলমের সংস্কৃতিতে টেনে আনার জন্য প্রয়োজন মনস্তাত্ত্বিক এক বিপ্লব। এ কাজের জন্য সম্পদ দরকার।

নতুন যুদ্ধে কাবুল ভরকেন্দ্র নয়
আয়রোজগারের জন্য খনিজ সম্পদ আর পর্যটন ছাড়া তালেবানরা তেমন কিছু পাবে না। আন্তর্জাতিক শক্তিগুলো আফগানিস্তানের এই দুর্বলতার সুযোগ নিতে উদ্‌গ্রীব। তালেবানদের বিনিয়োগ দরকার মানবসম্পদ তৈরি ও অবকাঠামো খাতে। আর বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ থাকবে সস্তায় খনিজ পেতে। প্রয়োজনে চরম দুর্নীতিগ্রস্ত উপায়ে হলেও। ‘সেন্ট-গ্যাস’ প্রকল্পের আলাপও হয়তো শিগগিরই শুরু হবে। এই দ্বিমুখী চাওয়া-পাওয়ার সমন্বয় ঘটানোই তালেবান নেতৃত্বের জন্য আসন্ন চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে আঞ্চলিক ট্রাইবাল-নেতাদের নিজস্ব সশস্ত্র বাহিনীগুলোর সঙ্গে তালেবানদের স্থানীয় খনিজ-অর্থনীতি নিয়ে বোঝাপড়ায় আসতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের সৈনিকেরা বাড়ি ফেরার উদ্যোগ নেওয়ামাত্র দেশটির কিছু কিছু জেলায় সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার বড় কারণ আসন্ন খনিজ-দখল-যুদ্ধের একটা আগাম সূচনা এটা। পূর্ব-অভিজ্ঞতা থেকে তালেবান জানে পরের যুদ্ধ কেবল কাবুল নিয়ে হবে না। খনিজ সমৃদ্ধ জেলাগুলো হবে তার ভরকেন্দ্র।

আলতাফ পারভেজ দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস বিষয়ে গবেষক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন