default-image

সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া জেলে ধুঁকছেন। বার্ধক্য, অসুস্থতার কারণে খালেদা জিয়ার অবস্থা খুবই শোচনীয়, এমনটাই খালেদা জিয়ার পরিবার ও দলের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে। আর ওদিকে খালেদা জিয়াকে জেলে রেখেই একের পর বিভিন্ন নির্বাচনে যাচ্ছে বিএনপি। সংসদেও গিয়েছে। সবকিছুই খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য করা হচ্ছে বলে বিএনপির নেতাদের পক্ষ থেকে যুক্তি দেওয়া হচ্ছে। এসব করতে করতে এখন খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য সরকারের অনুকম্পা প্রার্থনার জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে দলটি। বোঝা যায় দলটির শক্তি-সামর্থ্য এখন কোন পর্যায়ে এসে ঠেকেছে।

বিএনপির মহাসচিব গতকাল শনিবার এক বিক্ষোভ সমাবেশে বলেছেন, খালেদা জিয়ার মুক্তি চেয়ে সরকারের কোনো সাড়া পায়নি বিএনপি। খালেদা জিয়াকে সরকার মুক্তি দিতে পারে না। পারেন একমাত্র আদালত। এটা হচ্ছে আইনের কথা। কিন্তু বাস্তবতা আমরা সবাই জানি ও বুঝি। খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য বিএনপির লোকজন দৌড়ঝাঁপ করছেন তাহলে কিসের আশায়? পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে রাজনৈতিক কৌশল গ্রহণের ক্ষেত্রে বিএনপি যে ধারাবাহিকভাবে ব্যর্থ হচ্ছে তা পরিষ্কার। বলা যায়, আদালতের লড়াই, বুদ্ধিবৃত্তিক দক্ষতা ও মাঠের আন্দোলন—সব ক্ষেত্রেই বিএনপি বিফল হয়েছে।

অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, খালেদা জিয়াকে বিএনপির নেতারাই জেলে রেখে দিচ্ছেন। বুঝেই হোক আর না বুঝেই হোক খালেদা জিয়ার জেলজীবনের জন্য বিএনপির বর্তমান নেতৃবৃন্দরও দায় আছে। দলীয় প্রধানকে জেলে রেখে অন্য কোনো দল, বিশেষ করে আওয়ামী লীগ কোনো ধরনের নির্বাচনে অংশ নিত বলে মনে হয় না। সংসদেও যেত না। কিন্তু বিএনপির নেতারা হাসিমুখেই সংসদে যাচ্ছেন। শুধু তা-ই না, সম্প্রতি বিএনপির মহাসচিব বলেছেন, আগের দুটি নির্বাচনে অংশ না নেওয়া নাকি বিএনপির জন্য ভুল ছিল। সেই ভুল শোধরাতে বিএনপি এখন নির্বাচনে শুধু অংশই নিচ্ছে না, বরং এমন ভাব করছে, নির্বাচনে তারাই জয়লাভ করবে। এতগুলো নির্বাচনে অংশ নিয়েও বিএনপির কোনো বোধোদয় হয়নি; বরং বিএনপির নির্বাচনে অংশগ্রহণ ও সংসদে গমন সরকারকে একধরনের বৈধতাও দান করছে। দেশে অন্যতম বড় রাজনৈতিক দল নির্বাচনেও আছে, সংসদেও আছে। এই মুহূর্তে এটা সরকারের জন্য বড়ই স্বস্তির বিষয়। সরকার প্রমাণ করতে চাইবে, দেশে অংশগ্রহণমূলক রাজনীতি বিরাজ করছে। আর নির্বাচন নিয়ে সব দেশেই কমবেশি পরাজিতপক্ষের অভিযোগ থাকে। বিএনপিও তেমন অভিযোগ করছে।

খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়ে বিএনপির আচরণ হচ্ছে দুর্বলের কাতর মিনতি। ব্যাপারটা অনেকটাই এমন, যা হওয়ার হয়েছে, এবার মাফ করে দাও। একে আর যাই হোক রাজনৈতিক আচরণ বলা যাবে না। তৃণমূলে বিএনপির সমর্থন আছে। কিন্তু এই সমর্থনকে কোনোভাবেই বিএনপি ব্যবহার করতে পারেনি। কোনো রাজনৈতিক দলই অন্য দলকে জায়গা দিতে চাইবে না। জায়গাটা নিজেদের বের করে নিতে হবে। রাজনীতিতে প্রতিপক্ষ থেকে একটি দল ততটুকুই সুবিধা পাবে, যতটুকু চাপ প্রতিপক্ষকে ওই দল দিতে পারবে। বিএনপি এখানে পুরোপুরি ব্যর্থ। খালেদার মুক্তির জন্য সরকারকে চাপ দেবে কী, উল্টো নিজেরাই অসম্ভব চাপের মুখে আছে।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এম হাফিজুদ্দিন খান গতকাল ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, শিগগির সুষ্ঠু নির্বাচনের কোনো সম্ভাবনা তিনি দেখেন না। তিনি মনে করেন, আন্দোলন করে সুষ্ঠু নির্বাচন আদায় করতে হবে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই আন্দোলন করবে কারা। বিএনপি এই আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে পারত বড় দল হিসেবে। কিন্তু বিএনপি পারছে না। আন্দোলন করার মতো দক্ষ ও যোগ্য নেতৃত্ব বিএনপির নেই। খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে হলে, আন্দোলন জমাতে হলে সবার আগে দলের প্রতি নিবেদিতপ্রাণ কর্মীদের নেতৃত্বে আনতে হবে। আন্দোলন মানেই জ্বালাও-পোড়াও কর্মসূচি না। শান্তিপূর্ণভাবেও আন্দোলন করে দাবি আদায় করা যায়। পদপদবির জন্য বিএনপির তো নেতা-কর্মীর অভাব নেই। কিছুদিন আগেও ছাত্রদলের কমিটি গঠন নিয়ে বিক্ষুব্ধরা বিএনপির অফিসে ভাঙচুর করেছে।

বিএনপির সেই লাখ লাখ কর্মীরা কোথায় যারা খালেদা জিয়ার জন্য পথে নামবেন, যারা তাঁর মুক্তি ছাড়া ঘরে ফিরবেন না। বিএনপির মতো দলে নিশ্চিতভাবেই এমন কর্মী আছে। কিন্তু বিএনপি সেই লাখো কর্মী-সমর্থককে মাঠে নামাতে পারছে না। কারণ, নেতৃত্ব ও কর্মীদের মধ্যে কোথায় যেন একধরনের খামতি থেকে যাচ্ছে। নেতা ও কর্মীদের রসায়নটা ঠিকমতো জমছে না। যেমন জমছে না লন্ডনের সঙ্গে ঢাকার। কমবেশি সবাই জানি, লন্ডন থেকেই বিএনপিকে পরিচালনা করা হয়। দেশের পরিস্থিতির আলোকে বাস্তবতার ভিত্তিতে কৌশলের সমন্বয় করতে হবে। কেন্দ্রীভূত ক্ষমতাকে নেতা ও কর্মীদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে হবে। স্থায়ী কমিটিকে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দিতে হবে। বিএনপিকে ছিনিয়ে নেওয়া বা দখল করার সুযোগ আছে বলে মনে হয় না। কারণ জিয়া পরিবার যদি স্বেচ্ছায় নেতৃত্ব থেকে চলে না যায় তবে দলটির নেতৃত্ব সেই পরিবারের হাতেই থাকবে। তাই বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বকে যেকোনো ধরনের আশঙ্কা ও ভয়কে এক পাশে সরিয়ে রেখে নেতা-কর্মীদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ দিতে হবে।

গ্রহণযোগ্যভাবে দলকে উপস্থাপনের ওপরই রাজনৈতিক সফলতা নির্ভর করে। বুদ্ধিবৃত্তিক জায়গায় বড় ব্যর্থতা হচ্ছে, নিজস্ব রাজনীতির স্বতন্ত্র বয়ান বিএনপি দাঁড় করাতে পারেনি। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা বিএনপিকে যতভাবে সম্ভব নেতিবাচকভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা করে যাচ্ছে, বিএনপি ক্রমেই যেন একটি নিষিদ্ধ সংগঠনে পরিণত হচ্ছে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা এমন করতেই চাইবে এবং বিএনপি অবশ্যই দোষত্রুটির ঊর্ধ্বে না। দুর্নীতি, অনিয়ম, জঙ্গিবাদকে মদদ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে বিএনপির বিরুদ্ধে। কিন্তু এই প্রচারণাকে সামাল দেওয়ার মতো দক্ষ ও শক্তিশালী জনবল বিএনপির নেই।

সবদিক থেকেই বিএনপি বেশ বেকায়দায় আছে। সাংগঠনিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক দেউলিয়াত্বের কারণেই বিএনপিকে এখন খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয়। খালেদা জিয়া কোনোভাবেই এরশাদের কাছে অনুকম্পা প্রার্থনা করেননি। অনেকের কাছে তিনি আপসহীন নেত্রীর মর্যাদা পেয়েছেন এ কারণেই। খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে কিন্তু নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে নিজের অবস্থানে অটল ছিলেন। এর প্রতিদানও তিনি পেয়েছিলেন ১৯৯১ সালের নির্বাচনে জয়লাভ করে।

খালেদা জিয়া একাই দলকে টেনে নিয়ে গিয়েছিলেন সেবার। বিরোধী নেত্রী হিসেবে, ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দুর্গম পথ তাঁকে অনেকটা একাই পাড়ি দিতে হয়েছে। জেলে এবং জেলের বাইরে, উভয় পরিস্থিতিতেও তিনি একাই রইলেন। খালেদা জিয়ার দুর্ভাগ্য, নেতারা তাঁর অনুপস্থিতিতে আর টানতে পারছেন না দলকে। শক্তি সঞ্চয় করে সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগ করাই বিএনপির অন্যতম কৌশল হতে পারে খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে। এ ক্ষেত্রে যাবতীয় জেল, জুলুম, অত্যাচার মোকাবিলা করতে হবে। কিন্তু বিএনপির নেতারা এখন অনেকটাই আপসকামী। এই আপসকামী নেতাদের কারণেই খালেদা জিয়ার জীবন জেলেই কাটবে কি না, সেই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

ড. মারুফ মল্লিক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0